Alexa তেতুলিয়ায় দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা

ঢাকা, শুক্রবার   ২২ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৭ ১৪২৬,   ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

তেতুলিয়ায় দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা

সজল জাহিদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০৫ ২১ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৪:০৫ ২১ অক্টোবর ২০১৯

তেতুলিয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা

তেতুলিয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা

১৪ অক্টোবর। সকালেও জানতাম না যে আমি রাতে কোথায় থাকবো! মাত্র এক ঘণ্টার নোটিশে অফিস থেকে মৌখিক ছুটি নিয়েই ট্রেন টিকেট করে ফেললাম পঞ্চগড় যাবো। উল্লেখ্য আমার লক্ষ্য সিকিম যাওয়া। অফিস থেকে ঠিক সময়ে গাড়িতে উঠেও বাসায় পৌঁছাতে ৬টা ৩০ মিনিটে গেল। আমার ট্রেন এয়ারপোর্ট থেকে রাত ৮টা ৩০ মিনিটে। ঢাকা শহরের জন্য যেটা আদর্শ সময় নয় আদৌ। ব্যাগ সব সময় গোছানো থাকে বলেই রক্ষা!

একটা বাইক নিয়ে যথা সময়ে পৌঁছে গেলাম বিমানবন্দর স্টেশনে। দ্রুতযান এক্সপ্রেসও একদম সঠিক সময়ে চলে এলো। এসি কামরার টিকেট করা আছে বলে তেমন ঝামেলা ছাড়াই ট্রেনে উঠে পড়লাম। কিন্তু একটু পরেই ট্রেনের এসিতে বেশ শীত শীত অনুভূতি হলো‍। ভাগ্যিস ব্যাগে একটা সোয়েটার রাখা ছিল; যে কারণে শীতের কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।

ঘুম ভাঙলো পার্বতীপুর রেলওয়ে স্টেশন পৌঁছানোর পর। এরপর থেকেই শুরু হল ট্রেনের চলার চেয়ে বেশি সময় ধরে থেমে থাকা। যদিও দুই পাশের নিখাদ প্রকৃতি ছিল দারুণ উপভোগ্য। রেল লাইনের দু’পাশেই সবুজের দোলা দিয়ে যাওয়া ধানক্ষেত, যে সবুজের উপরে হালকা করে জড়িয়ে আছে আলতো কুয়াশার কোমল চাদর, ধান গাছের ডগায় ডগায় শীতের আগমনী শিশিরের কণা, দূরের পূব আকাশে আকাশে রক্তিম একটা আভা জানান দিচ্ছিলো সূর্যি মামার আগমনী মুহূর্ত। দারুণ, মুগ্ধ কিছু প্রকৃতির স্বাদ উপভোগ করছিলাম দিনাজপুর আসার পূর্ব পর্যন্ত।

তেতুলিয়ার সকাল। ছবি: লেখক

এরপরই সূর্য উঠে যাওয়ায় সকালের সেই কোমলতা দূরে সরে গিয়েছিল ধীরে ধীরে। আর সেই কোমলতার জায়গা দখল করে চলছিল নানা রকমের বিরক্তিকর ব্যাপার। ট্রেনের অযথা অনন্ত সময়ের জন্য থেমে থাকা, নিজের সিটে আর ভালো না লাগায় ট্রেনের নিচে নেমে গিয়ে, বাইরে দাঁড়িয়ে রোদের মধ্যে বেশ গরম অনুভূত হওয়া, অযথা হকারের উৎপাত সহ্য করে যাওয়া। একটা সময় রাইট টাইমের ট্রেন ঠিক দুই ঘণ্টা একদম অযথা লেট করে ঠিক দশটায় ধুলোর নগরী পঞ্চগড়ে নামিয়ে দিল। ইস কি যে অসহ্য ধুলোবালি! মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, এই শহরের দেখাশোনার জন্য কি কেউ নেই নাকি? তবুও নিরুপায় হয়েই রিকশা নিয়ে, বাস স্ট্যান্ডে চলে গেলাম।

পঞ্চগড় থেকে তেতুলিয়া গিয়ে দশ মিনিটের বিরতি নিলো বাস। মেজাজ ততক্ষণে আরও খারাপ হয়ে গেল। তখন বেলা ১১টা ৩০ মিনিট। মনে মনে ধরেই নিলাম, আজকে আর সিকিম যাওয়া সম্ভব না। শিলিগুড়িতেই থেকে যেতে হবে। ঠিক ১০ মিনিট পরে বাস ছেড়ে দিল বাংলাবান্ধার উদ্যেশ্যে। বেশ ভালো, দারুণ বিরক্তি নিয়ে বসে আছি। বাস ঝোঁপঝাড় জংগল, গাছপালা আর গ্রামের পথ পেরিয়ে সোজা পথে চলতে শুরু করলো। বেশ ফুরফুরে একটা শীতের হাওয়া গায়ে এসে লাগতে লাগলো। কেন যেন জানালা দিয়ে একটু বাইরের দিকে তাকালাম। বাইরের ঝলমলে রোদ আর ঝকঝকে নীল আকাশে দুই এক টুকরো সাদা মেঘের ওড়াউড়ি।

আরেকটু ওপরে তাকাতে মনে হল যেন দূরে একটা কালো মেঘের রেখা আকাশে অনেকটা সীমানা দখল করে আছে। যে কালো মেঘেদের ঠিক উপরেই নানা আকারের উঁচু-নিচু সাদা মেঘের বিসৃত একটা রেখা। কিন্তু একই সমান্তরালে নয়, কোথাও উঁচু, কোথাও একটু নিচু, কোথাও একটু আঁকা-বাঁকা। হ্যাঁ, অনেকটা মেঘের মতোই। কিন্তু তবুও কেন যেন মনের মধ্যে একটু খটকা লাগলো, এত উঁচুতে এতটা আকাশজুড়ে অমন কালো মেঘের রেখা একটু অস্বাভাবিক মনে হলো। আর সেই সঙ্গে ঠিক কালো রেখার ওপরেই এমন সাদা মেঘেদের বিস্তার তো থাকার কথা নয়।

বরফে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা! ছবি: লেখক

হুট করেই মনে হল, ওগুলোই দার্জিলিং এর পাহাড় সারি! আর কালো পাহাড়ের ওপরের যে সাদা রেখা দেখা যাচ্ছে সেগুলো আবার বরফে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা! আরে নাহ, ধুর তাই হয় নাকি? এই সময়ে, এতো দূর থেকে এমন স্পষ্ট করে দার্জিলিং এর পাহাড় আর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু না, বাস আর একটু সামনে এগিয়ে যেতেই ঠিক বুঝতে পারলাম ওগুলো সত্যি সত্যি-ই দার্জিলিং এর পাহাড়! ওই পাহাড়গুলোর ওপরের সাদা ওগুলো মেঘ নয় ওগুলো হিমালয় পর্বতমালা। মুহূর্তেই শিহরিত হয়ে গেলাম। বাস যতই সামনে এগিয়ে যায় পাহাড় আর হিমালয় চূড়াগুলো ততই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়! কি যে একটা অদ্ভুত আনন্দে একা একাই ভেসে যাচ্ছিলাম বোঝানো যাবেনা।

বাস থেমে গেলে, রিকশা না নিয়ে হেঁটে হেঁটে জিরো পয়েন্টের দিকে যেতে শুরু করলাম। আর আমার ক্যামেরা দিয়েই কিছুটা জুম করে এই ছবিগুলো তুলেছিলাম। একবার তো ভেবেছিলাম ধুর কি আর হবে দার্জিলিং বা সিকিম গিয়ে? এই এখানে আমার প্রিয় তেতুলিয়ায় বসেই তো দিব্যি দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে, ঝলমলে, চকচকে হাসিতে অবিরত হেসে থাকা অপার্থিব হিমালয় পর্বতমালা, কাঞ্চনজঙ্ঘাসহ বরফে বরফে মুড়ে থাকা নাম না জানা কত গুলো পর্বত চূড়া।

কিন্তু না, হিমালয় যেন একটা নেশা! যত দেখা যায় ততই দেখতে ইচ্ছে করে, যতই কাছে পাই আরো কাছে পেতে চাই। যতই দেখি না কেন তাকে দেখার কোনো আঁশ যেন কখনো না মেটে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে