তিন শ্রেণির লোকের দোয়া কখনো ব্যর্থ হয় না

ঢাকা, শনিবার   ২৮ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৫ ১৪২৭,   ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

তিন শ্রেণির লোকের দোয়া কখনো ব্যর্থ হয় না

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৫৮ ৪ মার্চ ২০২০   আপডেট: ২০:০২ ৪ মার্চ ২০২০

মুসলমান যখন অনুপস্থিত অন্য মুসলমান ভায়ের কল্যাণের জন্য দোয়া করেন আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করেন-ফাইল ফটো

মুসলমান যখন অনুপস্থিত অন্য মুসলমান ভায়ের কল্যাণের জন্য দোয়া করেন আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করেন-ফাইল ফটো

ইবাদতের মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে দোয়া। হাদিসে দোয়াকে অনেক উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। যেমন হজরত নুমান ইবনে বাশির (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, ‘দোয়াই ইবাদত’। (মুসনাদে আহমদ-৭১৫২)।

রাসূল (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়ার মাধ্যমে কোনো কিছু চায় না আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি রাগ করেন।’ (আল আদাবুল মুফরাদ-৫৫৮)।

সুনানে তিরমিজিতে বলা হয়েছে, ‘দোয়া ইবাদতের মগজ।’ (হাদিস নম্বর-৩৩৭১)। তাই নিজে দোয়া করা। প্রয়োজনে মুরব্বি ও বুযূর্গদের কাছ থেকে দোয়া নেয়া। অন্যের অনুপস্থিতে তার নিরাপত্তা ও সার্বিক কল্যাণের জন্য দোয়া করাও অনেক ফজিলতের বিষয়।

বারবার দোয়া করার পরও প্রত্যাশিত বিষয় না পেলে অনেকে দোয়া করা ছেড়ে দেন। হতাশ হয়ে যান। অধৈর্য হয়ে পড়েন। তাদের জানা থাকা দরকার যে, দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তিনটি বিষয়ের কোনো একটি দিয়ে থাকেন। এক. হয়তো প্রত্যাশিত বিষয়টি দিয়ে দেন। দুই. দোয়ার বদৌলতে আল্লাহ তায়ালা তার ওপর থেকে সমপর্যায়ের বিপদ দূর করেন। তিন. দোয়ার সওয়াব আল্লাহ তায়ালা আখেরাতে তাকে দান করবেন। তাই দোয়ার পর প্রত্যাশার বিপরীত কোনো কিছু ঘটলেও ধৈর্য ধরা।  অধৈর্য না হওয়া।

এ ক্ষেত্রে অনেকে আল্লাহর ফয়সালার ওপর নারাজি প্রকাশ করেন। এতে দু’দিক থেকেই ক্ষতি। আখেরাতের সওয়াব বাতিল হয়ে যাবে এবং দুনিয়াতেও অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সূরা: জুমার, আয়াত: ৫৩)।

যে তিন শ্রেণির লোকের দোয়া কখনো ব্যর্থ হয় না

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) আল্লাহর নবীর খুবই মহব্বতের একজন সাহাবি। তিরমিজি শরিফে তার সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তিন শ্রেণির লোকের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেয়া হয় না। এক. রোজাদার ব্যক্তি ইফতারের সময় দোয়া করলে। দুই. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া। তিন. মজলুমের দোয়া।

মজলুমের দোয়াকে আল্লাহ তায়ালা আকাশে উঠিয়ে নেন। ওই দোয়ার উসিলায় আকাশের দরজাগুলোকে খুলে দেয়া হয়। আর মজলুমের দোয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা বলতে থাকেন, আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব, যদিও সামান্য বিলম্বে হয়।’ (তিরমিজি-৬২৫)।

নবী করিম (সা.) কখনো দাওয়াতের উদ্দেশে লোক পাঠালে তাদের উপদেশ দিয়ে বিদায় দিতেন। উপদেশের বিষয় হতো দ্বীনি দাওয়াতের পদ্ধতি, দাওয়াত কবুলের পর তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষার গুরুত্ব ও শিক্ষা। তাদের মাঝে দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালনার কথাও রাসূল (সা.) বলতেন। দ্বীনি কাজের একটি ছিল জাকাত আদায় করা। জাকাত আদায়ের প্রসঙ্গ এলে রাসূল (সা.) সাহাবাদেরকে বিশেষ সতর্ক করতেন যে, জাকাত আদায়ে মানুষের ওপর কোনো জুলুম করা যাবে না। কারণ, মাজলুমের দোয়া এবং আল্লাহ তায়ালার মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।

হাদিসের প্রথম বিষয় ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া কবুল হওয়া। কারণ, ইফতারের হালত ইবাদতের হালত। আর ইবাদতে থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তা কবুল হয়। তাছাড়া ইফতারের সময় বান্দা আল্লাহর সামনে নিজকে সম্পূর্ণরূপে সপে দেয়। নিজের ক্ষুদ্রতা আর আল্লাহ তায়ালার বড়ত্বকে মেনে নিয়ে আল্লাহর সব নিষেধ থেকে বিরত থাকে। অথচ নিষিদ্ধ বিষয়গুলো করা অসম্ভব নয় বরং বান্দা চাইলেই করতে সক্ষম। এতে আল্লাহ তায়ালার রহমত বান্দার ওপর নাজিল হতে থাকে। তখন দোয়া করলেই আল্লাহ তায়ালা দোয়া কবুল করেন।

শাসক ন্যায়পরায়ণ হলে তার দোয়াও আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে শুধু শাসকের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নয় বরং এর দ্বারা শাসকের ওপর অনেক বড় দায়িত্বও বর্তায়। একজন আদর্শবান শাসকের কাজ শুধু শাসন করা নয়। বরং নাগরিকের কল্যাণ ও সার্বিক নিরাপত্তার জন্য দোয়া করাও তার দায়িত্ব। যে শাসক ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে এবং শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় আল্লাহর সাহায্য চেয়ে নিবে তার জন্য রয়েছে সুসংবাদ!

রাসূল (সা.) বলেছেন, হাশরের ময়দানে আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণির মানুষকে আরশের নিচে স্থান দিবেন। এর প্রথম শ্রেণি হচ্ছেন ন্যায়পরায়ণ শাসক। বর্তমানে অনেক বিষয়ে আমরা দায়িত্বশীল হয়ে থাকি। ফয়সালার ক্ষেত্রে ইনসাফ করা আমাদের দ্বারা হয়ে ওঠে না। আমরা সমস্যা সমাধানে বস্তুর অনেক সহযোগিতা নেই। কিন্তু যেখান থেকে মূল ফয়সালা আসে সে দরবারে আমরা চাই না। বর্তমানের শাসক আর পূর্বের শাসকদের মাঝে পার্থক্য এখানেই। কথায় আছে ‘নাগরিকরা তাদের শাসকের রীতি-নীতি অনুযায়ী চলে।’ অর্থাৎ শাসক যদি সৎ ও ইনসাফগার হয় তাহলে নাগরিক সমাজেও এর প্রভাব পড়ে। তারাও পরস্পর ইনসাফ করতে শিখে। আর শাসকদের মাঝে নেতিবাচক কোনো বিষয় থাকলে এর চিহ্নও নাগরিক সমাজে দেখা যায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ন্যায়পরায়ণ শাসক হওয়ার তৌফিক দান করুন।

যে তিনটি দোয়া কবুল হওয়া নিশ্চিত

এ বিষয়ের হাদিস ইমাম তিরমিজি, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহসহ আরো অনেকে বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি ইবনে আব্বাস (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম (সা.) বলেন, তিনটি দোয়া কবুলযোগ্য, যেগুলো কবুল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এক. পিতামাতা সন্তানের জন্য দোয়া। দুই. মুসাফির সফরে থাকাবস্থার দোয়া। তিন. মাজলুমের দোয়া।’ পূর্বোক্ত হাদিস আর এই হাদিসের মাঝে একটি পার্থক্য রয়েছে। পূর্বোক্ত হাদিসের বক্তব্যের খোলাসা ছিল দোয়া কবুল হওয়া বান্দার আমলের কারণে। অর্থাৎ রোজাদারের দোয়া কবুল হওয়ার কারণ হলো রোজা

এরকমভাবে শাসকের দোয়া কবুলের কারণ হলো তার ইনসাফ। এই হাদিসের খোলাসা হলো উপরোক্ত ব্যক্তিদের দোয়া কবুলের জন্য তাদের বিশেষ কোনো দোয়ার প্রয়োজন নেই। পিতা-মাতা হওয়াই একটি গুণ, যার ওসিলায় আল্লাহ তায়ালা বান্দার দোয়া কবুল করেন। পিতা-মাতা কোনো ধর্মের অনুসারী সে বিষয়ও ধর্তব্য নয়। যে কোনো ধর্মের অনুসারী পিতা-মাতা সন্তানের জন্য দোয়া করলেই দোয়া কবুল হয়। তেমনি মুসাফিরের দোয়া কবুলের কারণ তার সফর।

সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া কবুলের কারণ হচ্ছে, সন্তানের প্রতি মহব্বত। মহব্বতের কারণে সন্তানের জন্য দোয়া মানুষের দিল থেকে আসে। তেমনিভাবে মুসাফির ব্যস্ততায় থেকেও যখন দোয়ার জন্য হাত ওঠায় এর অর্থ দাঁড়ায় দোয়ার প্রতি তার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। গুরুত্বের কারণে দোয়া মন থেকে আসে। আর বান্দা মন থেকে দোয়া করলে আল্লাহ তায়ালা সেই দোয়া কবুল করেন। নির্যাতিত মানুষ কতটুকু আন্তরিকতা থেকে হাত ওঠায় তা বলে বুঝানো নিষ্প্রয়োজন।

পিতা-মাতা সন্তানের ওপর বদদোয়া দেয়ায় সচেতন থাকা

সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার মহব্বত ভালোবাসার পরিমাণ পরিমাপ করা সম্ভব নয়। অনেকে সন্তানের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেন। কিন্তু অনেক সময় নিজেদের অজান্তেই আমরা সন্তানের বিশাল ক্ষতি করে ফেলি। আবেগের বশীভূত হয়ে সন্তানকে অভিশাপ দিয়ে ফেলি এবং এটাকে তেমন কিছু মনে করি না। বদদোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে সন্তানের ওপর নেমে আসে আল্লাহর আজাব। তাই নবী করিম (সা.) উম্মতকে সর্তক করে বলেন, ‘তোমরা নিজেদের জন্য, সন্তানাদি ও সম্পদের জন্য বদদোয়া করো না। কারণ, হতে পারে তোমরা বিশেষ কোনো মুহূর্তে ছিলে যখন আল্লাহ তায়ালা দোয়া কবুল করার ইচ্ছা করছেন (আর ওই মুহূর্তে বদদোয়া করেছ আর আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করে নিলেন)।

হাদিসটি হজরত জাবের (রা.) এর সূত্রে সহিহ মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে। আমি নিজেও এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এক মা সন্তানের প্রতি নারাজ হয়ে বলে ফেলেন ‘তুই মরছ না কেন’। ছেলেটি তখন লাকড়ি সংগ্রহ করার জন্য গাছে ওঠে। উদ্দেশ্য, বিক্রয়লব্ধ টাকা দিয়ে ঢাকায় চলে আসবে। আল্লাহর ইচ্ছায় ছেলেটি গাছ থেকে পড়ে সেখানেই মারা যায়। তাই পিতা-মাতার কর্তব্য এ সব বিষয়ে সাবধান থাকা।

ভ্রমণে দোয়া ও জিকির-আজকারেও মনোযোগী হওয়া

যে তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল হওয়ার আলোচনা পূর্বোক্ত হাদিসে এসেছে তাদের একজন হলেন মুসাফির ব্যক্তি। শরীয়তের পরিভাষায় যে লোক ৭৮ কিলোমিটার দূরে যায় তাকেই মুসাফির বলে।

মুসাফিরের ক্ষেত্রে অনেক ছাড় আছে। যেমন চার রাকাত নামাজের দু’রাকাত আদায় করলেই হবে। সফর দ্বীনী কোনো কাজের কারণে হোক বা জাগতিক ব্যবসা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ছাড় সবার জন্যই রয়েছে। সফরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দোয়া কবুল হওয়া। আল্লাহ তায়ালা সফররত ব্যক্তির দোয়াকে কবুল করেন।

অন্য যাদের দোয়া কবুল হওয়া নিশ্চিত

হজরত আবু দারদা (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, মুসলমান যখন অনুপস্থিত অন্য মুসলমান ভায়ের কল্যাণের জন্য দোয়া করেন আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করেন। দোয়াকারীর পেছনে আল্লাহ তায়ালা একজন ফেরেস্তা নিয়োগ করে রাখেন। যখন মুসলমান অন্যের জন্য দোয়া করে ওই ফেরেস্তা তার সঙ্গে সঙ্গে আমিন বলেন এবং সুসংবাদ দিতে থাকেন তোমার জন্যও তার সমপরিমাণ কল্যাণ রয়েছে। (সহিহ মুসলিম)। 

অনুপস্থিত ব্যক্তির জন্য দোয়া করলে কবুল হওয়ার কারণ হলো ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাত। কারণ কাউকে সামনে রেখে দোয়া করলে অনেক সময়েই লৌকিকতা থাকে। অনুপস্থিতিতে দোয়া মনের টান না থাকলে হয় না। মন থেকে দোয়া আসার কারণে আল্লাহ তায়ালা এই দোয়াকে কবুল করেন । ইমাম বাইহাকি (রাহ.) আরো কয়েক শ্রেণি লোকের কথা উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা যাদের দোয়া কবুল করে নেন। তাদের মাঝে আছেন অসুস্থ ব্যক্তি। আল্লাহ তায়ালা তার দোয়াকে কবুল করেন। তেমনিভাবে হাজি ও মুজাহিদের দোয়াকেও আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে