তিনটিতে নিশ্চিত নৌকা, একটিতে হাড্ডাহাড্ডি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৭ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১৩ ১৪২৬,   ২২ শাওয়াল ১৪৪০

তিনটিতে নিশ্চিত নৌকা, একটিতে হাড্ডাহাড্ডি

জাকারিয়া চৌধুরী, হবিগঞ্জ

 প্রকাশিত: ১৯:১৪ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ২০:৩০ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

হাওর বাওর আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি হবিগঞ্জ জেলা।

একদিকে যেমন রয়েছে পাহাড় বেষ্টিত চা বাগান; অন্যদিকে রয়েছে অথৈ জলরাশি।  এছাড়া রয়েছে শিল্পাঅঞ্চল। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস ফিল্ড বিবিয়ানার অবস্থানও এ জেলায়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হবিগঞ্জে এখন বিরাজ করছে ভোট উৎসব। প্রতিটি গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজারে চলছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। পোস্টার ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে সর্বত্র।

হবিগঞ্জে ৪টি সংসদীয় আসন আছে। এর ৩টিতে প্রায় নিশ্চিত মহাজোটের প্রার্থীরা। তবে একটি মহাজোট প্রার্থীর সঙ্গে ঐক্যফন্ট প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

জানা যায়, হবিগঞ্জের ৪টি আসনে ২৩ প্রার্থী নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এরমধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের (মহাজোট) একক প্রার্থী রয়েছে প্রত্যেক আসনে।

হবিগঞ্জ-৪ আসন ছাড়া বাকি ৩টি আসনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। এ প্রার্থীরা উন্মোক্তভাবে নির্বাচন করবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে হবিগঞ্জ-৩ ছাড়া অন্যকোনো আসনে দলীয় প্রার্থী দিতে পারেনি বিএনপি। তবে শরীকদের জন্য বাকি ৩টি আসন ছেড়ে দিয়েছে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা এ দলটি। এ ৩ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী না থাকায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ।

হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল)

এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর ছেলে শাহ নেওয়াজ মিলাদ গাজী।

পাশাপাশি এ আসন থেকে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া।

ফরিদ গাজী যেমন ছিলেন বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগার। ঠিক তেমনি এএমএস কিবরিয়া ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী।

ফলে দুই প্রার্থীরই রয়েছে নিজস্ব ভোট ব্যাংক। ফলে এ আসনটিতে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উন্নয়নের জোয়ারে নৌকার জয়ের সম্ভবনাই বেশি।

এছাড়াও এ আসন থেকে লড়ছেন, মোহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিক (লাঙ্গল), চৌধুরী ফয়সল শোয়েব (মই), মো. নূরুল হক (গামছা), জুবায়ের আহমেদ (মোমবাতি), আবু হানিফা আহম্মদ হোসেন (হাত পাখা)।

নৌকার প্রার্থী শাহ নেওয়াজ মিলাদ গাজী বলেন, হবিগঞ্জ-১ আসনে নৌকার বিজয় নিশ্চিত। এখন ‘মুখের কথায় নয়’ মানুষ কাজে বিশ্বাস করে।

গত ১০ বছরে নবীগঞ্জ-বাহুবলবাসীর যে উন্নয়ন আগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে ‘তা শেষ হয়ে যাক’ জনগণ তা চায় না। তাই আগামী ৩০ ডিসেম্বর জনগণ সারাদিন ভোট দিয়ে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করবে বলে জানান মিলাদ গাজী।

ধানের শীষের প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, আমার বাবা ছিলেন এক সৎ আদর্শবান ব্যক্তি। যিনি নবীগঞ্জ-বাহুবলবাসীর কল্যাণে সারাটা জীবন কাজ করেছেন। এই হবিগঞ্জের মাটিতেই আমার বাবাকে জীবন দিতে হয়েছে। তাই আমি আমার বাবার অসম্পন্ন কাজগুলো সম্পন্ন করতে চাই। আগামী নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে আমাকে নবীগঞ্জ-বাহুবলবাসীর উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

এ আসনে বাহুবল উপজেলায় ভোটার রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ২৩৪টি। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৬৪ হাজার ৮৯৫ এবং ৬৩ হাজার ৩৩৯ টি নারী ভোটার রয়েছে।

নবীগঞ্জ উপজেলায় ২ লাখ ৩১ হাজার ৭৯৪টি ভোটার রয়েছে। এরমধ্যে পুরুষ ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৩৫টি ও নারী ১ লাখ ১৮ হাজার ১৫৯টি ভোটার।

হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ)

এ আসনটি আওয়ামী লীগের দূর্গ হিসেবে পরিচিত। উপ-নির্বাচনসহ এ পর্যন্ত ১১টি নির্বাচনের মধ্যে ৮টি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয় লাভ করেছেন।

এবারের নির্বাচনে এ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ খান। এখানে বিএনপির কোন প্রার্থী নেই। তবে শরীক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ।

এছাড়াও প্রার্থী হয়েছেন শংকর পাল (লাঙ্গল), মনমোহন দেবনাথ (গামছা), পরেশ চন্দ্র দাশ (আম), আবুল জামাল মসউদ হাসান (হাতপাখা), স্বতন্ত্রপ্রার্থী আফছার আহমদ রূপক (সিংহ)।

আসনটিতে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবনকে মনোনয়ন না দেয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। পাশাপাশি খেলাফত মজলিসের নেই তোমন কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম। ফলে নিশ্চিত জয় দেখছে আওয়ামী লীগ।

এ আসনে বানিয়াচং উপজেলায় ভোটার রয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার ১৫৬ টি। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৯৪ এবং ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৬২টি নারী ভোটার।

আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ৭৯ হাজার ৭৫৩টি ভোটার রয়েছে। তার মধ্যে ৪০ হাজার ৫৩টি পুরুষ এবং নারী ভোটার ৩৯ হাজার ৭০০টি।

হবিগঞ্জ-৩ (সদর-লাখাই-শায়েস্তাগঞ্জ)

জেলার ৪টি আসনের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এটি। মূলত হবিগঞ্জ জেলা থেকেই পরিচালিত হয় জেলার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। যে কারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে এ আসনটি। আসনটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে রয়েছে দুইজন প্রভাবশালী নেতা। এ আসনের বর্তমান এমপি হচ্ছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। তিনি হলেন হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির। যার নেতৃত্বে একাট্টা রয়েছে হবিগঞ্জের আওয়ামী লীগ।

এ দিকে বিএনপির কঠিন সময়ে যিনি হাল ধরে রেখেছেন তিনি হচ্ছেন আলহাজ্ব জি কে গউছ। তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ও হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় কারাগারে থেকেও তিনি গত পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের (মহাজোট) মনোনয়ন পেয়েছেন অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির। আর বিএনপি (ঐক্যফ্রন্ট) থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন আলহাজ্ব জি কে গউছ।

এরইমধ্যে ওই দুই হেভিওয়েট প্রার্থী তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে দলীয় কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে পাড়া-মহল্লায় যাচ্ছেন প্রচার-প্রচারণা। আসনটিতে ওই দুই হেভিওয়েট প্রার্থী যেমন সমানে সমান তেমনি তাদের কর্মী-সমর্থকও রয়েছে সমানে সমান।

তবে এবারের নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।

আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবু জাহির বলেন, বর্তমান সরকারের ১০ বছরে যা উন্নয়ন হয়েছে অতীতে আর কোনো সরকার তা করতে পারেনি। রেকর্ড সংখ্যক উন্নয়নের মধ্যে উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হবিগঞ্জে মেডিকেল কলেজ নির্মাণ, হবিগঞ্জ আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মান, বৃন্দাবন সরকারি কলেজে আনার্স মাস্টার্স কোর্স চালু, হবিগঞ্জ জুডিশিয়াল ভবন নির্মাণ, ২৫০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণ, উপজেলায় উপজেলায় কলেজ নির্মাণ, বলভদ্র সেতু নির্মাণসহ রাস্তা-ঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তাই আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে এ উন্নয়ন কে আরও তুরান্বিত করতে নৌকা মার্কায় ভোট দিবে জনগণ। এছাড়াও আগামীতে শেখ হাসিনা সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে পারলে তিনি তার অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও জানান।

সংসদ নির্বাচন আর পৌরসভা নির্বাচন এক নয়। তাছাড়া অতীত পরিসংখ্যান ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উপর ভিত্তি করে আসনটিতে নৌকাকেই এগিয়ে রাখছে ভোটাররা।

এ আসনে মোট ভোটার রয়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৬৫১টি।

এছাড়াও আসনটিতে লড়ছেন জাতীয় পার্টির আলহাজ্ব মোহাম্মদ আতিকুর রহমান আতিক, ইসলামী আন্দোলনের মুহিব উদ্দিন আহমদ সোহেল ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি’র (সিপিবি) পীযুষ চক্রবর্তী।

হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর)

চা-বাগান বেষ্টিত এ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে আওয়ামী লীগের দখলে। দু’উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনের মোট ভোটার রয়েছে ৪ লাখ ২২ হাজার ৬২৩ টি। এর মধ্যে চুনারুঘাট উপজেলায় রয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৩৩১টি ও মাধবপুর উপজেলায় রয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ২৯২টি ভোট।

১৯৭০’র নির্বাচন থেকে শুরু করে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বারবার বিজয়ী হয়েছেন। সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী মরহুম এনামুল হক মোস্তফা শহীদ ৬বার এ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে দু’বার জাতীয় পার্টির সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার এ আসনে বিজয়ী হয়ে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মুহিবুল হাসান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে সৈয়দ মো. ফয়সল নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি না থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ তানভীরের সঙ্গে খুব সহজেই এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী। এ বারের নির্বাচনেও তিনি নৌকার মাঝি হয়েছেন। এছাড়াও এ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ড. আহমদ আব্দুল কাদের। আসনটি থেকে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েও চুড়ান্ত মনোনয়ন পাননি জেলা বিএনপির সভাপতি হেভিওয়েট প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সল। ফলে আসনটিতে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে ধানের শীষের কার্যক্রম। বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন এমনিতেই আসটি আওয়ামী লীগের ঘাটি। তারপরও বিএনপি’র ওই হেভিওয়েট প্রার্থী মনোনয়ন না পাওয়ায় আসনটি হাতছাড়া হওয়ায়ার সম্ভাবনাই বেশি। এছাড়াও তারা উল্লেখ করেন, এ আসনে চা বাগান বেশি হওয়ায় ফলে চা শ্রমিকরা নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে অনন্য ভূমিকা রাখেন।

এ আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলনের শেখ মো. শামসুল আলম ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মাওলানা সোলায়মান খান রাব্বানী।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর