তামাক চাষিদের ঠকিয়ে লাভবান কোম্পানি!

ঢাকা, সোমবার   ০১ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৮ ১৪২৭,   ০৮ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

তামাক চাষিদের ঠকিয়ে লাভবান কোম্পানি!

লালমনিরহাট প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৯ ৭ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:০০ ৭ মে ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

করোনাভাইরাসের অজুহাত দেখিয়ে লালমনিহাটের কৃষকদের ঠকিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বিভিন্ন তামাক কোম্পানিগুলো। প্রতি বছর জেলায় হাজার হাজার কোটি টাকার তামাকের বাণিজ্য হলেও সাধারণ কৃষকরা প্রতিবারেই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন।

সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকারি বেঁধে দেয়া মূল্যে তামাক ক্রয় না করায় বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। লাভের টাকা যাচ্ছে তামাক কোম্পানি আর তাদের দালালদের পকেটে। সরকারিভাবে তামাকের একটি নির্দিষ্ট দাম ধরা থাকলেও তা তোয়াক্কা না করে কম দামে তামাক কেনা হচ্ছে কৃষকদের কাছ থেকে। নগদ টাকার প্রয়াজনে কৃষকরাও বাধ্য হচ্ছেন কম দামে তামাক বিক্রি করতে।

লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলায় ৮ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ১৩০ হেক্টর। তবে স্থানীয় চাষিদের মতে চলতি বছর আবাদ হয়েছে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সরকারিভাবে  বার্লি-১ প্রতি কেজি ৯২টাকা, বার্লি-২ প্রতি কেজি ৮৮ টাকা, বার্লি-৩ প্রতি কেজি ৮৬ টাকা এবং গ্রেড বহির্ভূত বার্লি তামাক ৪৫ টাকা কেজি দর নির্ধারণ করা হয়। 

সরেজমিনে জেলার আদিতমারী উপজেলার নাসির লীফ টোব্যাকো কোম্পানির ক্রয় কেন্দ্র দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ৬০ টাকা কেজি দরে তামাক কিনছে প্রতিষ্ঠানটি। তামাক কোম্পানিটি প্রতি কেজি তামাক ৬০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ টাকা কেজি দরে ক্রয় করছে। 

কোম্পানিটির দায়িত্বে থাকা এরিয়া ম্যানজার আনোয়ারুল ইসলাম অকপটে ওই মূল্যে তামাক ক্রয়ের কথা স্বীকার করে ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, কোম্পানির বেঁধে দেয়া মূল্যেই তারা লুজ পদ্ধতিতে তামাক কিনছেন।

জেলার আরেক কোম্পানি আবুল খায়ের টোব্যাকোতেও ৯০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ টাকা কেজি দরে তামাক ক্রয় করা হচ্ছে।

 এ বিষয় আবুল খায়ের টোব্যাকোর এরিয়া ম্যানেজার (সাপ্টিবাড়ি অঞ্চল) ইকতিয়ার আহমদ এর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

আদিতমারী উপজলার ভাদাই গ্রামের তামাক চাষি নজরুল ইসলাম ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, তামাক চাষ ক্ষতিকর জেনেও দু'টাকা লাভের আশায় কৃষকরা এই ফসল চাষাবাদ করেন। কিন্তু এ বছর তাদের লাভের সে আশা গুড়েবালি। করোনাকে পুঁজি করে তামাক কোম্পানিগুলো কম দামে তামাক কিনতে প্রতারণার জাল ফেলছে। আর টাকার প্রয়োজন হওয়ায় কৃষকরাও বাধ্য হয়েই প্রতারণার সেই জালে আটকা পড়েছেন। 

তিনি বলেন, ‘টাকার প্রয়োজন হওয়ায় বাধ্য হয়ে কম দামে তাংকু বেচে ফেলবার নাগছি। কোম্পানিগুলা হামাক খালি খালি মিছা কথা কয়া তাংকু আবাদ করে নিছে।’ 

জেলার আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ি গ্রামের তামাক চাষি সোহাগ মিয়া ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, গত বছর প্রতি মণ তামাক তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছিলাম। কিন্তু একই তামাক এ বছর বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে। করোনার জন্য বাইরে থেকে পাইকার আসছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কৃষকের ঘর এবার তাংকু আবাদ করি শ্যাষ হয়া গেলো। তামাক কোম্পানিগুলা হামাক যেমন করি নাচায় হামরা, ওদোন করি নাইচপার নাগছি’। 

মহিষখোচা হাটের তামাক ফড়িয়া (দালাল) আব্দুল হক ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে তামাক কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, কোম্পানিগুলোও কম দামে তামাক কিনছে। 

তিনি বলেন, তামাক কোম্পানির দেয়া দাম অনুযায়ী আমরা চাষিদের কাছ থেকে তামাক কিনছি। 

এদিকে জেলার সাপ্টিবাড়ির ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকো ঘুরে দেখা গেছে, কোম্পানিটি সরকারি বেঁধে দেয়া দামের চেয়েও অতিরিক্ত দাম দিয়ে তামাক ক্রয় করেছেন। 

এ বিষয়ে কোম্পানিটির সাপ্টিবাড়ী অঞ্চলের এরিয়া ম্যানেজার নুর আলম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, কোম্পানির পলিসি অনুযায়ী প্রতি বছরই আমরা সরকারি মূল্যের চাইতে বেশি দামে তামাক ক্রয় করে থাকি। কোম্পানি কোনোভাবেই কৃষককে ঠকাতে চায় না। কেননা কৃষক না বাঁচলে কোম্পানি হারিযে যাবে এমনটাই দাবি তার।  

লালমনিরহাট জেলা বিপণন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, সরকারিভাবে নন গ্রেড প্রতি কেজি তামাকের দাম ৯২ টাকা ধার্য করে দিলেও কোম্পানিগুলা তা কিনছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। দু-একটি কোম্পানি ছাড়া সবগুলো কোম্পানির একই চিত্র। নিয়ম অনুযায়ী তামাক চাষিদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাসহ মাস্ক বিতরণ করবে কোম্পানিগুলো। কিন্তু সেটিও করছে না তারা। আর ওজনেও রয়েছে কারচুপি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ