তাজমহল বেচে দেয়া মানুষটি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৫ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১১ ১৪২৬,   ২০ শাওয়াল ১৪৪০

তাজমহল বেচে দেয়া মানুষটি

 প্রকাশিত: ১৩:২২ ১০ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৩:২২ ১০ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

এক সময় চোরের কারিশমা বোঝাতে 'চোখ থেকে কাজল চুরি' কথাটা উল্লেখ করা হতো। তবে এমন একজন মানুষ আছেন যার প্রতিভা প্রায় এমনই। হয়তো চেষ্টা করলে চোখ থেকে কাজলও চুরি করে দেখাতেন! তবে যা করেছেন সেটা এর থেকে কম নয় কিছুতেই। খোদ তাজমহল বেঁচে দেন তিনি। তাও একবার নয়, তিন তিন বার! মোঘল সাম্রাজ্যের আরেক নিদর্শন লালবাগ কেল্লাও ছাড়েননি, ওটাও বেঁচেন বার দুয়েক। রাষ্ট্রপতি ভবনটা অবশ্য মাত্র একবার বেঁচেই রেহাই দিয়েছেন ওটাকে, আর পার্লামেন্ট হাউজ তো বেঁচেছেন ভেতরের ৫৪৫ এমপি সহই!

কিভাবে করতেন এসব? কেনোই বা করতেন? মিতিলেশ কুমার শ্রীবাস্তব তার আসল নাম হলেও মি. নটবরলাল নামেই তিনি অধিক প্রসিদ্ধ। বিহারে জন্ম নেয়া দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় মিতিলেশ বরাবরই মাঝারি মানের ছাত্র। শেষমেশ ব্যারিস্টারি পাস করে ওকালতি পেশায় ঢোকেন। কিন্তু যার এত প্রতিভা, সে কি পারে মুখ গুঁজে ছাপোষা চাকরি করতে? পারেননি তিনি। ওকালতি ছেড়ে পালান। তার আগে প্রতিবেশীর হস্তাক্ষর নকল করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বেড়িয়ে পড়েন ভাগ্যান্বেষণে।

ছোটখাটো জোচ্চুরি দিয়ে শুরু। কখনো রেলস্টেশন এ নকল স্লিপ বানিয়ে ব্যাগেজ ক্লেইম করে নিয়ে যেতেন, কখনো অভিনব সব উপায়ে ঘোল খাওয়াতেন মানুষকে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার কাজের পরিধি সঙ্গে যোগ হতে থাকে নতুনত্ব। একবার এক গয়নার দোকানে মন্ত্রীর পিএ পরিচয় দিয়ে মন্ত্রীর ছেলের বিয়ে উপলক্ষে ৮২ হাজার রুপির গয়না নিয়ে বলেন, এগুলো বাড়িতে রেখে টাকা নিয়ে আসতে যাচ্ছেন এজন্য প্রয়োজনে দোকানের দু’জন কর্মচারীকেও সঙ্গে নিতে রাজি হন। আপাতদৃষ্টিতে কোনো ভেজাল নেই। কিন্তু তিনজনে কিছুদূর যেতেই নটবরলাল যে কোথায় হাওয়া হলো? কর্মচারীরা ভেবে কুল পেলো না। আরেকবার তো মূখ্যমন্ত্রীর হয়ে এক বড় ঘড়ির দোকানে গিয়ে জানান মন্ত্রী এক বিশেষ অধিবেশনে উপস্থিত সবাইকে ভালো ঘড়ি উপহার দিতে চান। কথামত প্রায় ১০০ ঘড়ি নিয়ে একটা নকল ড্রাফট ধরিয়ে দেন চম্পট।

পরের দিকে আরো নাটকীয় পন্থা আবিষ্কার করেন কাজের। তিনি বড় বড় স্থাপনার আশেপাশে সরকারি কর্মকর্তার বেশে ঘুরে বেড়াতেন আর বোকাসোকা, ধনী বিদেশি খুঁজতেন শিকার হিসেবে। পেয়ে গেলেই শুরু করতেন খেলা। ভারত সরকার ঋণের বোঝা নিতে না পেরে বড় বড় বিখ্যাত স্থাপনাগুলো ভালো খরিদ্দার পেলে বিক্রি করে দিচ্ছেন এ ধরণের গল্প ফাঁদতেন। এমন উদ্ভট গল্পকেও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেন নিজের তৈরি জাল সরকারি কাগজ দিয়ে। যাতে থাকতো রাষ্ট্রপতির নকল স্বাক্ষর, অার কথার জাদু। এভাবে একে একে তাজমহল, লালকেল্লা, রাষ্ট্রপতি ভবন, পার্লামেন্ট হাউজ একাধিকবার বেঁচে দেন! তিনি না-কি ইংরেজি ভালো জানতেন না। ভাগ্যিস জানতেন না! না জেনেই এই! ভালো জানলে হয়তো পৃথিবীতে আর কোন স্থাপনাই বাকি থাকতো না!

এসব কাজকর্ম নিয়েই তার কোনো আফসোস নেই। তিনি বলেন, মানুষকে মিথ্যা বলি, তারা বিশ্বাস করে টাকা দেয়, এখানে আমার দোষ কোথায়? তবে নিজেকে দোষী না ভাবলেও দেশের আইন কিন্তু ভেবেছিল। ১১টি রাজ্যে তার নামে একশ’র ওপর মামলা হয়েছে। শুধু নিজের রাজ্যেই ১৪টি মামলা, সবগুলোর সাজা একসঙ্গে করলে ১১৩ বছর স্রেফ বিহারেই জেল খাটতে হয়! এ পর্যন্ত ৯ বার তাকে ধরতে সক্ষম হয় পুলিশ। কিন্তু প্রতিবারই পূর্বের চেয়ে অভিনব পদ্ধতিতে উধাও হয়ে যান তিনি। শেষবার তিনি যখন জেল পালান তার বয়স তখন ৮৪! যে বয়সে মানুষ একা দু’পা হাটতেও দশবার ভাবে, সেখানে তিনি হুইলচেয়ার থেকে স্রেফ অদৃশ্য হয়ে যান অনেকটা পুলিশের নাকের ডগা দিয়েই। সে সময় তাকে জেল থেকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছিল।

তিনি কিন্তু নিজ গ্রামের মানুষের কাছে দেবতাস্বরূপ। তার মধ্যে সবসময়ই একটা রবিন হুড ইমেজ তৈরি করার চেষ্টা ছিলো। দান-খয়রাত তো প্রচুর করতেনই, প্রায়ই সার্কাস এর মত বিরাট প্যান্ডেল টানিয়ে বাইরে থেকে রাঁধুনি আনিয়ে পুরো গ্রামকে খাওয়াতেন। যাওয়ার সময় প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দিতেন এক-দুশো রুপি। সারা ভারতে যখন কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে, নিজ গ্রামে তখন তিনি হিরো, তারা কৃতজ্ঞতাবোধ করে, তিনি বাংড়াতেই জন্মেছনে। তবে তাকে নিয়ে সবার অনেক আগ্রহ, সেটা বোঝা যায় তাকে নিয়ে তৈরি সিনেমার বহর দেখলে। অমিতাভ বচ্চন অভিনয় করেছেন তার নামে তৈরি 'মি. নটবরলাল' ছবির নাম ভূমিকায়। ইমরান হাশমি অভিনীত একটি ছবিও হয়, 'রাজা নটবরলাল' নামে। এছাড়াও তার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কত কাজ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।

এই অসম্ভব প্রতিভাধর মানুষটি মুম্বাই পুলিশকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন, কাউকে মেরে, ধমকে টাকা চাইনি কখনো, তারা নিজেই হাতজোর করে সেসব দিয়ে গেছেন।।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড