Alexa তাকওয়া অর্জনের চারটি উপায় (পর্ব-১)

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৮ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৩ ১৪২৬,   ১৪ জ্বিলকদ ১৪৪০

তাকওয়া অর্জনের চারটি উপায় (পর্ব-১)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৩২ ৪ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৮:৩৫ ৪ জুলাই ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

আল্লাহ তায়ালা সমস্ত মানবজাতিকে শুধু তার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আর সকল ইবাদত এর মূল কথাই হচ্ছে তাকওয়া। তাকওয়া হচ্ছে মুমিনের অতি উঁচু পর্যায়ের ইবাদত এবং সর্বোত্তম সম্পদ। 

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয় (মুমিনের) সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া।’ (সূরা: বাকারা,  আয়াত: ১৯৭)।

তাকওয়া অবলম্বনের ব্যাপারে যিনি সফল হবেন তিনি বিপুল ঐশ্বর্যের বাহক হবেন। দুনিয়া ও আখিরাতে সকল সম্পদ ও সম্মানের কোষাগার এটিই। কোরআন মজীদ তাকওওয়ার নির্দেশে পরিপূর্ণ। স্থানে স্থানে একটু পরপরই তাকওয়ার নির্দেশ এসেছে। কোরআন মজীদের রীতি হলো, কোনো নির্দেশ বা বিধান জারি করার পূর্ব বা পরে সাধারণত তাকওয়ার আদেশ করা হয়। কারণ তাকওয়াই হচ্ছে ওই বস্তু, যা মানুষকে আল্লাহ তায়ালার যেকোনো হুকুম পাবন্দীর সঙ্গে মেনে চলতে বাধ্য করে। 

আরো পড়ুন>>> নারী-পুরুষের বেশভূষা সম্পর্কে ইসলাম যা বলে 

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, হে মানুষ সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের উপাসনা কর, যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে সৃষ্টি করেছেন; যাতে তোমরা পরহেযগার (ধর্মভীরু) হতে পার। (সূরা: বাকারা, আয়াত: ২১)।

তাকওয়া শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, ‘ভীতিপ্রদ বস্তু হতে আত্মরক্ষা করা।’ ইসলামি পরিভাষায় ‘পাপাচার হইতে আত্মরক্ষা করার নাম তাকওয়া।’ ইবনে রজব (রহ:) বলেন, ‘তাকওয়া মানে আনুগত্যশীল কর্মের মাধ্যমে এবং নাফরমানিমূলক বিষয় থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর ক্রোধ এবং শাস্তি থেকে বেঁচে থাকা।’

কুশাইরি (রহ:) বলেন, ‘প্রকৃত তাকওয়া হলো, শিরক থেকে বেঁচে থাকা, তারপর অন্যায় ও অশ্লীল বিষয় পরিত্যাগ করা, অতঃপর সংশয়পূর্ণ বিষয় থেকে বিরত থাকা, এরপর অনর্থক আজে-বাজে বিষয় বর্জন করা।’

আবদুল্লাহ্‌ বিন মাসঊদ (রা.) বলেন, ‘তাকওয়া হচ্ছে: আল্লাহর আনুগত্য করা, নাফরমানি না করা, তাকে স্মরণ করা, ভুলে না যাওয়া, তাঁর কৃতজ্ঞতা করা, কুফরি না করা।’ 

আরো পড়ুন>>> জুমার নামাজ ছুটে গেলে করণীয় যা

সাহ্‌ল বিন আবদুল্লাহ্‌ বলেন, ‘বিশুদ্ধ তাকওয়া হলো ছোট-বড় সব ধরণের গুনাহের কাজ পরিত্যাগ করা।’ 

হাসান বসরি বলেন, ‘এই প্রকার (পশমের) ছেঁড়া-ফাটা পোশাকে তাকওয়ার কিছু নেই। তাকওয়া হচ্ছে এমন বিষয় যা হৃদয়ে গ্রথিত হয়; আর কর্মের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হয়।’ 

ওমর বিন আবদুল আজিজ বলেন, ‘দিনে সিয়াম আদায় এবং রাতে নফল সালাত আদায়ই আল্লাহ্‌র ভয় নয়; বরং প্রকৃত আল্লাহর ভয় হচ্ছে, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করা, তিনি যা ফরজ করেছেন তা বাস্তবায়ন করা। কেউ যদি এর অতিরিক্ত কিছু করতে পারে তবে সোনায় সোহাগা।’

হজরত উমর বিন খাত্তাব (রা.) হজরত উবাই বিন কাবকে (রা.) প্রশ্ন করেন, তাওয়া কী? তিনি উত্তরে বলেন, কাঁটাযুক্ত দুর্গম পথে চলার আপনার কোনো দিন সুযোগ ঘটেছে কী? তিনি বলেন, ‘হ’ তখন হজরত উবাই (রা.) বলেন, ‘সেখান আপনি কী করেন? হজরত উমর (রা.) বলেন, ‘কাপড় ও শরীরকে কাঁটা হতে রক্ষা করার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করি। তখন হজরত উবাই (রা.) বলেন, এ ওই রকমই নিজেকে রক্ষা করার নাম।

ইবনুল মুআ’য তার নিম্নের কবিতায় এ অর্থই গ্রহণ করেছেন অর্থাৎ ‘ছোট ও বড় পাপসমূহ পরিত্যাগ কর, এটাই তাওয়া। এমনভাবে কাজ কর যেমন বন্ধুর কন্টকাকীর্ণ পথের পথিক যা দেখে সে সম্পর্কে সতর্ক ও সজাগ থাকে। ছোট পাপগুলোকেও হালকা মনে করো না, জেনে রেখো যে, ছোটো ছোটো নুড়ি পাথর দ্বারাই পর্বত তৈরি হয়ে থাকে।

তাফসির ইবনে কাছিরে উল্লেখ আছে যে, আতিয়াহ্‌ আস সাদী হতে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেছেন,  ‘বান্দা ততোক্ষণ পর্যন্ত মুত্তাকি হতে পারবে না, যতোক্ষণ না, সে সব সন্দেহযুক্ত বিষয় ত্যাগ না করে, যার মাধ্যমে হারামে পতিত হবার সম্ভাবনা থেকে যায়।’ (ইবনে মাযাহ, তিরমিযী)। 

হজরত আলী (রা.) খুব সুন্দর ও সহজভাবে তাকওয়ার সংজ্ঞা দিয়েছেন, যা বোঝা এবং আমল করা খুব সহজ। তার মতে তাকওয়া হলো চারটি বিষয়; এক. আল্লাহর ভয়, দুই. কোরআনে যা নাজিল হয়েছে তদানুযায়ী আমল, তিন. অল্পে তুষ্টি, চার. শেষ দিবসের জন্য সদা প্রস্তুতি।

হজরত আবু দারদা (রা.) স্বীয় কবিতায় বলেন, মানুষ চায় যে, তার অন্তরের বাসনা কামনা পূরণ হোক, কিন্তু আল্লাহ তা অস্বীকার করেন। শুধু মাত্র সেটাই পূরণ হয় যেটা তিনি চান। মানুষ বলে এটা আমার লাভ আর এটা আমার মাল, কিন্তু আল্লাহর তাকওয়াই’ হচ্ছে তার লাভ ও মাল থেকে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।

তাকওয়া অর্জনের সবচেয়ে মজবুত হাতিয়ার কী? তাকওয়া অর্জনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার দোয়া, মুত্তাকিদের নেগরানীওয়ালা সোহবত, হিম্মত ও আল্লাহর মুহাববত । এ চারটা বিষয়। আমরা ধোঁকায় থাকি, গাফলতে থাকি, এজন্য আমাদের কাছে সবই কঠিন মনে হয় । কিন্তু যদি চিন্তা করা হয় তাহলে দেখা যাবে, এ চারটার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হলো, হিম্মত। আবার হিম্মতের চেয়ে কঠিন চেষ্টা করা। আপনার মধ্যে নূ্ন্যতম যে হিম্মত আছে সেটাকে কাজে লাগান এবং আরেকটু আগে বাড়ুন। ওটাকে কাজে লাগিয়ে আরেকটু আগে বাড়ার চেষ্টা করুন। তো হিম্মত অনেক শক্তিশালী নিয়ামত। শুধু একটু তাওয়াজ্জুহ দরকার।

বিভিন্ন দোষত্রুটি ত্যাগ করার ইচ্ছা মানুষ এই ভেবে বাদ দেয় যে, অভ্যাস হয়ে গেছে। অভ্যাস ত্যাগ করা খুব কঠিন। সব কঠিনের পেছনে কারণ হলো, আমরা এই চার হাতিয়ার কাজে লাগাই না। শুধু একটাকে লাগাই। শুধু দোয়া করি। শুধু দোয়া এমন হাতিয়ার যা একা কখনো যথেষ্ট নয়। আসল দোয়া তো হলো, দিল হাজির রেখে আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নেয়া। ‘বল তো কে নিরুপায় মানুষের ডাকে সাড়া দেন ‘যখন সে ডাকে’ (সূরা নামল ২৭ : ৬২)।

ইযতিরারী হালত বা নিরুপায় অবস্থা যখন মানুষের সৃষ্টি হবে, দিল হাজির রেখে যখন মানুষ দোয়া করবে তখন যতো বড় নাস্তিক হোক আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে দোয়া কবুল করে নিবেন। আর এই ইযতিরারী হালত তখন পয়দা হবে, যখন আপনি অন্য সকল হাতিয়ারকে কাজে লাগাবেন। এসকল হাতিয়ার ব্যবহার করা ছাড়া ইযতিরারী হালত বা নিরুপায় ভাব পয়দা হওয়া কখনো সম্ভব না। সেজন্য শুধু এক হাতিয়ার ব্যবহার করা যেন কোনো হাতিয়ারই ব্যবহার না করা।

তাকওয়া অর্জনের চারটি হাতিয়ার: 
দুনিয়াতে স্বভাবগতভাবেই মানুষের কারো না কারো প্রতি টান থাকে, দুর্বলতা থাকে। সেটার ওপর কেয়াস করে আপনি আল্লাহর মুহাব্বতটাকে বুঝতে পারেন। কারো প্রতি আপনার দুর্বলতা থাকলে আপনি তার সঙ্গে কেমন আচরণ করেন? অথচ সে মাখলুক। আপনার ওপর তার যদি কোনো ইহসান থাকেও তাহলে তা আল্লাহর তাওফিকে হয়েছে এবং ঘুরেফিরে তার সকল ইহসান আল্লাহর দিকেই যাবে। এরপরও তার প্রতি আপনার এত রেয়ায়েত, এত দুর্বলতা ! আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিআমতে তো সেও ডুবে আছে, আপনিও ডুবে আছেন। তার প্রতি যদি আপনার এত মুহাব্বত হয় তাহলে আল্লাহর সঙ্গে আপনার মুহাব্বত কেমন হবে? 

কেমন হওয়া উচিত?
স্বভাবগতভাবেই মানুষের মধ্যে আল্লাহর মুহাব্বত সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু আল্লাহর নিআমতের কথা স্মরণ না করার কারণে সেই মুহাব্বত চাপা পড়ে থাকে। তো ‘ইসলাহি মাজলিসে’ আল্লাহর মুহাব্বত বাড়ানোর কিছু উপায় বলা হয়েছে। যেমন, আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করা। বেশি বেশি জিকির করা। কোরআন তেলাওয়াত করা। যাদের ভেতর আল্লাহর মুহাব্বত আছে তাদের কাছে বেশি বেশি যাওয়া। এরকম সাত আটটা উপায় সেখানে লেখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে যেটা আমার কাছে সহজ লাগে সেটা দিয়ে আমি আল্লাহর মুহাব্বত বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারি।

আল্লাহর মুহাব্বত বাড়ানোর চেষ্টা করতে গেলেই মানুষ একটা ধাক্কা খায়। হয়ত কখনো গোনাহ হয়ে গেলে ধাক্কা খাবে। অথবা কখনো নেক আমল ছুটে গেলে ধাক্কা খাবে। এভাবে ধাক্কা খাবে একবার, দুইবার, তিনবার, চারবার। তারপর ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। এটা অনেক বড় একটা কৌশল। আল্লাহর মুহাব্বত বাড়াতে হবে এবং মুহাব্বতটাকে হাজির করতে হবে। অনুশীলন করতে করতে মুহাব্বতটাকে হাজির করতে হবে। আমার আল্লাহ নারাজ হবেন এই ভেবে গোনাহের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

আমার মুরুব্বি যদি আমাকে এই কাজটা করতে দেখেন, তাহলে তিনি কী ভাবতেন? আমি কী এই কাজটা তার সামনে করতে পারতাম? অথচ মুরুব্বি আমার চোখের আড়ালে আর আমিও তার চোখের আড়ালে। তো একজন মুরুব্বির বেলায় যখন এ কথা ভাবতে পারি তাহলে আমার আল্লাহ সম্পর্কে কী এ কথা ভাবতে পারি না? আমার আল্লাহ তো আমাকে সব সময় দেখেন। তিনি আমার চোখের আড়ালে হলেও আমি তো আল্লাহর চোখের আড়ালে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে