.ঢাকা, শুক্রবার   ২২ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৮ ১৪২৫,   ১৫ রজব ১৪৪০

তাইওয়ান নিয়ে গভীর গাড্ডায় চীন

অমিত গোস্বামী

 প্রকাশিত: ১৬:১৬ ৮ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৬:১৬ ৮ জানুয়ারি ২০১৯

অমিত গোস্বামী
কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

‘স্বাধীনতা’ শব্দটা সবসময়ই প্রিয় যে কোনো মানুষের কাছে। দেশের স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা – প্রতিনিয়ত আমরা ব্যবহার করি আমাদের দৈনন্দিন কথায়। কিন্তু যে কোন স্বাধীনতার সঙ্গে ‘দেশের স্বাধীনতা’ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্ব মানচিত্রে চীনের ডানদিকে একটা ছোট্ট দ্বীপ – নাম তাইওয়ান। ২ কোটি ৩০ লক্ষ জনসংখ্যার বসবাস।

এই অঞ্চলটি কি চীনের একটি রাজ্য নাকি স্বাধীন দেশ? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আজও নিরূপিত হয়নি। তাইওয়ানের বর্তমান সরকারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সক্রিয়। বেইজিংয়ের থেকে এই দেশের অর্থনীতি ও মুদ্রাব্যবস্থাও একেবারেই ভিন্ন। আয়তন মাত্র ৩৫,৮৮৭ বর্গ কিলোমিটার হলেও, এই মুহূর্তে তাইওয়ান বিশ্বের ২২ তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। দেশটির উন্নত প্রযুক্তি শিল্প বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মানব উন্নয়নসহ সম্ভাব্য সকল সূচকেই দেশটি অনেক এগিয়ে আছে। দেশটির উন্নয়নের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে দক্ষ জনশক্তি। পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত দেশগুলোর একটিও এখন তাইওয়ান। বিশ্ব দরবারে একটি জনপদকে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতানুযায়ী রাষ্ট্রের চারটি উপাদান থাকতেই হবে। এই চারটি উপাদান হচ্ছে- নির্দিষ্ট ভূমি, জনসংখ্যা, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব। পৃথিবীতে এখন মোট স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩টি। তবে এই সংখ্যার বাইরেও কিছু রাষ্ট্র রয়েছে যারা এই চারটি শর্ত পূর্ণ করলেও এখনও তারা বিশ্ব দরবারে স্বীকৃত নয়। তার মধ্যে অন্যতম হল তাইওয়ান। ১৯৭১ সাল অব্দি অবশ্য একটি স্বতন্ত্র দেশ হিসেবেই আলাদা জায়গা পেয়েছিল দেশটি জাতিসংঘে। তারপরে মহাবলী চীনের প্রভাবে এদের জাতিসংঘের বাইরে পাঠানো হল। কিন্তু কেন? সবচেয়ে আগে এই অঞ্চলের ইতিহাস একটু দেখা যাক।

তাইওয়ানে মানুষ থাকে কম করে হলেও বিশ হাজার বছর আগে থেকে। চীনের মূল ভুখণ্ড, ফিলিপিন্সসহ আশেপাশের অন্যান্য কিছু দ্বীপ থেকে সেই বরফ যুগের সময়ই মানুষ গিয়ে থিতু হয়েছিল তাইওয়ানে। ছোট্ট এই দ্বীপের প্রতি চীনাদের কখনোই তেমন কোনো আকর্ষণ ছিল না। সাড়ে চারশ বছর আগে, ষোল শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই দ্বীপটির খোঁজ পেয়েছিল পর্তুগীজরা। মুগ্ধ পর্তুগীজ দস্যুর দল দ্বীপটির নাম দেয় “সুন্দর দ্বীপ”। কিন্তু তারা সেখানে বসতি গড়েনি। পরবর্তী শতাব্দীর শুরুর দিকে অন্য দুটো ইউরোপিয়ান শক্তির নজর পরে দ্বীপটির উপর। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এসে ঘাটি বানায় দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে আর স্প্যানিশরা উত্তর দিকে। এই দুই ইউরোপিয়ান শক্তিই দ্বীপের অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের নিস্তরঙ্গ জীবন একেবারে উল্টেপাল্টে দেয়। ডাচ আর স্প্যানিশরাই প্রথমদিকে চীনাদের এই দ্বীপে আসতে উৎসাহিত করতে থাকে। ফুজিয়ান এবং গুয়াংডং থেকে চাইনিজদের নিয়ে আসা হতো সস্তা শ্রমিক হিসেবে। ১৬৪২ সালে ডাচরা স্প্যানিশদের তাড়িয়ে দিয়ে পুরো তাইওয়ানের দখল নিজেদের করে নেয়। তখন চীনের শাসন করত মিং রাজবংশ। ১৬৬১ সালে মিং রাজবংশের প্রতি অনুগত সেনাপতি কোজিঙ্গা ডাচদের বিতাড়িত করে তাইওয়ানে প্রতিষ্ঠা করেন ডংনিং রাজ্য। ১৬৪৪ সালেই চীনের মূল ভূখণ্ডে মিং রাজবংশের পতন হল কিং রাজবংশের কাছে। ১৬৮৩ সালে কিং রাজবংশ কোজিঙ্গাকে যুদ্ধে হারিয়ে দ্বীপের দখল নিজের করে নেয়, এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতন তাইওয়ান চীনের অংশ হয়। ১৮৯৪ সালে এসে শুরু হয় প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর পরের বছরেই চীন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। জাপান একরকমের প্রহসনমূলক চুক্তি করেই তাইওয়ান দখল করে নেয়। ১৯১২ সালে আসে চীনের ইতিহাসের সবচাইতে বড় পরিবর্তন। সে বছর কিং রাজবংশকে ছুড়ে ফেলে চীনের হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায় ন্যাশনালিস্ট পার্টি অফ চায়না। দেশটির নাম হয় রিপাবলিক অফ চায়না। প্রেসিডেন্ট হন সান ইয়াত-সেন। ১৯২৭ এর অগাস্ট মাসে জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কমিউনিস্টরা। ১৯৩৭ এর মাঝামাঝি জাপান চীন আক্রমণ করে। চীন-জাপান যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই ১৯৩৯ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট এবং অন্য দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের মধ্যেও বিরোধ দেখা দেয়। ফলস্বরূপ ১৯৪৬ সালে চিনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। কমিউনিস্ট পার্টির গণ মুক্তি ফৌজ ১৯৪৯ সালে আমেরিকা সহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির কৃপাধন্য শাসকদের পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করে। চীনের ক্ষমতায় আসে মাও জে দং। মাও জে দংয়ের তীব্র আধিপত্যের কাছে খেই হারিয়ে ১৯৪৯ সালে চিয়াং কাইশেক ও তার কুওমিনটাং সরকারের লোকজন পালিয়ে তাইওয়ান চলে যান।  ১৯৪৯ সালে চীনা গৃহযুদ্ধ শেষে বেইজিংয়ের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটে। এ সময় তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় চিয়াং কাইশেকের হাতে। সেখানে তারা ‘রিপাবলিক অব চায়না’ নামে এক সরকার গঠন করে। নিজেদেরকে সমগ্র চীনের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার বলেও দাবি করে তারা। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘসহ  বিশ্বের অনেক দেশ চিয়াং কাইশেকের সরকারকেই চীনের সত্যিকারের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ বেইজিং এর সরকারকেই চীনের আসল সরকার বলে স্বীকৃতি দিল। তারপর থেকে একে একে বিশ্বের প্রায় সব দেশই বেইজিং এর পক্ষ নিল, এবং তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কমতে থাকলো। তাই এই মুহূর্তে মাত্র ১৭টি দেশের সাথে তাইওয়ানের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কোনো এশীয় দেশের সাথেই তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

চীন মনে করে তাইওয়ান তাদের দেশেরই অংশ। এটি চীন থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটি প্রদেশ। যেটি ভবিষ্যতে কোন একদিন চীনের সঙ্গে বিলুপ্ত হবে। ১৯৭৯ সালে 'এক দেশ, দুই পদ্ধতি' নামে চীন এক সংযুক্তির প্রস্তাব তাইওয়ানকে দেয়। যেখানে তাইওয়ান মূল চীনে বিলুপ্ত হবে, কিন্তু তাদের স্বায়ত্বশাসন দেয়া হবে। কিন্তু তাইওয়ান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। আমেরিকাও চীনের কাছ থেকে পাওয়া বিরতিহীন রাজনৈতিক চাপের কারণে ১৯৭৯ সালে তাইওয়ানকে আলাদা দেশ হিসেবে অনুমোদন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। উঠিয়ে নেওয়া হয় আমেরিকা থেকে তাইওয়ানের দূতাবাস। অবশ্য অনুমোদন না পেলেও এর বাইরে থেকেই নিজের মতন করে সব ধরনের সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে তাইওয়ান পৃথিবীর আর দেশগুলোর সঙ্গে। বর্তমানে প্রায় ১২২ টি দেশের সঙ্গে নানা ধরনের সম্পর্ক চালু আছে এ দেশটির। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত না হলেও দেশ হিসেবে তাইওয়ান কিন্তু মোটেই পিছিয়ে নেই। ১৯৬০ এর দশকের শুরু থেকেই তাইওয়ানে ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও শিল্পায়নের সূচনা ঘটে, যার ফলে দেশটিতে একটি স্থিতিশীল শিল্প-অর্থনীতি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ১৯৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে দেশটি একদলীয় সেনাশাসন থেকে বেরিয়ে এসে সেমি-প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থার বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে পা বাড়ায়। এই মুহূর্তে তাইওয়ান বিশ্বের ২২ তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।

চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্কের উন্নতি হয় ১৯৯১ সালে।  তাইওয়ান ১৯৯১ সালে  চীন প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে তাদের যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করে এবং চীন সরকারও তাইওয়ানের নাগরিকদের জন্য চীনে ভ্রমন ও বিনিয়োগ  প্রক্রিয়া অনেকটা শীথিল করে। কিন্তু ২০০০ সালে তাইওয়ানের নুতন প্রেসিডেন্ট হন চেন শুই বিয়ান। ২০০৪ সালে তিনি ঘোষণা দেন যে তাইওয়ান চীন থেকে আলাদা হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সুই বিয়ানের এই মন্তব্য হঠাৎই চীনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয়। ২০০৫ সালে চীন তড়িঘড়ি করে এক আইন পাশ করে যাতে বলা হয়, তাইওয়ান যদি চীন থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে, সেটা ঠেকাতে চীন প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করবে। ২০০৮ সালে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মা ইয়াং জেউ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তিনি চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে বেশ মনযোগী হয়ে ওঠেন। তবে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বিরোধ থাকলেও অধিকাংশ দেশই মনে করে, তাইওয়ানের একটি স্বাধীন দেশ হওয়ার অনেক লক্ষণ আছে বটে, তবে এটির আইনগত সত্বা এখনো অস্পষ্ট। তাইওয়ানের অর্থনীতি এখন চীনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এখন আর স্বাধীনতাকে বাস্তবসম্মত বিকল্প বলে ভাবে না। তাইওয়ানের বড় দুই দলের মধ্যে ‘ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি’ এখনো অবশ্য স্বাধীনতার পক্ষে। অন্যদিকে কুওমিনটাং পার্টি (কেএমটি) চায় মূল চীনের সঙ্গে একত্রীকরণ। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ৭ নবেম্বর চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং ও তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট মা ইং-জিউ গত সিঙ্গাপুরে এক বৈঠকে মিলিত হন। ১৯৪৯ সালে চীনে গৃহযুদ্ধ অবসানের পর থেকে ৬৬ বছরের মধ্যে দু’পক্ষের এটাই প্রথম শীর্ষ বৈঠক। চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা তাইওয়ানের সঙ্গে মূল চীনের শান্তিপূর্ণ পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রাথমিক অথচ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।কিন্তু এই বৈঠকের পরের নির্বাচনে স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বী ‘ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি’ ক্ষমতায় আসে। প্রেসিডেন্ট হন সাই ইং-ওয়েন। অতি সম্প্রতি ২০১৮ সালে স্বাধীনতাকামী ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) দেশটির মেয়র ও স্থানীয় নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। এই ভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতা নয়, ‘এক চীন’ নীতির পক্ষে তাইওয়ানের ভোটাররা মত প্রকাশ করেছেন বলে দাবি করেছে চীন। ২০১৬ সালে সাই ইং-ওয়েন ক্ষমতা নেওয়ার পর তাইওয়ানের ওপর চীন নানাভাবে চাপ প্রয়োগ শুরু করে। চীন থেকে বেরিয়ে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা চান সাই। তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ দাবি করা চীনের জন্য এটা সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়।

এই অবস্থায় এই বছরের শুরুতেই গত ২ জানুয়ারি চীনা প্রসিডেন্ট শি চিনফিং ১৯৭৯ সালে পাঠান সংযুক্তির প্রস্তাবের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বক্তৃতা দেন । তিনি তাইওয়ানকে বলেন স্বাধীনতার কথা ভুলে যান, শান্তিপূর্ণ ভাবে আমাদের দেশের সঙ্গে জুড়ে যান। তিনি আরো বলেন যে প্রয়োজন পড়লে কিন্তু সামরিক বাহিনীকেও নামানো হতে পারে। চীনা প্রেসিডেন্ট  চিনফিংয়ের বক্তৃতার প্রেক্ষিতে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন জানিয়েছেন, সংযুক্তির কোনও প্রশ্নই নেই। বেজিংয়ের শর্ত মেনে তাইওয়ান কোনও দিনই চিনের সঙ্গে জুড়বে না। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, ‘‘আমি আবারও জানাচ্ছি, তাইওয়ান ‘এক দেশ, দুই সরকার’ নীতি কখনওই মানবে না। এখানকার প্রত্যেকটি মানুষ সেটাই বিশ্বাস করে।’’ ‘এক দেশ দুই সরকার’ নীতিতে স্বশাসনের ক্ষমতা তাইওয়ানের হাতেই দেয়ার কথা, যেমনটা হংকংয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে। চিনা প্রেসিডেন্টের মতে, ‘‘তাইওয়ানের মানুষকে বুঝতে হবে স্বাধীনতা শুধু তাদের দুর্ভোগ বাড়াবে। তাইওয়ানের স্বাধীনতা প্রচার সংক্রান্ত কোনও ধরনের সক্রিয়তা বেজিং সহ্যও করবে না। সংযুক্তির মাধ্যমে চিনের মানুষও উজ্জীবিত হবেন।’ তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের পালটা বক্তব্য “আমাদের ২ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র নিয়ে যা ভাবে, সেটার প্রতি চীন সম্মান দেখান। দু’পক্ষের মধ্যে যে ভিন্নতা, তাকেও শান্তিপূর্ণ চোখে দেখতে শিখুন।’’

কাজেই আজ চীনা সাম্রাজ্যবাদ বনাম স্বাধীন গণতন্ত্রের এই সংঘাতের প্রেক্ষিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও রাষ্ট্রপুঞ্জ কী মতপ্রকাশ করে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশ তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্যে এই সমস্যাকে ‘চীনের আভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে নিশ্চুপ রয়েছে ঠিক যেমন ১৯৭১ সালে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কারণে পাকিস্তানকে সমর্থন করে বলেছিল যে ওটা ‘পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয়’। তবে বর্তমান বিশ্বে চট করে যুদ্ধ শুরু হয় না এবং তাইওয়ানের নাগরিকরাও শান্তিপুর্ণ ধনতন্ত্র ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তারা চীনা আগ্রাসনের বিপক্ষে থাকলেও অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে নন যদিও তাদের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী আছে। এদিকে ‘এক দেশ দুই সরকার’ নীতি’ যে নিতান্ত বকচ্ছপ বুদ্ধি তা আজ তাইওয়ান ভাল করেই জানে। কিছুদিনের মধ্যে এই নীতি নিতান্ত পুঁথিগত নীতিমালার অংশ হিসেবে বিরাজ করবে সেটা বোঝা যাচ্ছে। তাই তাইওয়ান চাইছে স্ট্যাটাস কো বজায় থাকুক। তারা তাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ও জনপ্রতি উপার্জনের গড় বৃদ্ধি নিয়েই সন্তুষ্ট। রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে মাথাব্যথা নেই। বাণিজ্যিক সম্পর্কে বাধা না পড়লেই হল। তাই তাইওয়ান ইস্যুতে আজ গভীর গাড্ডায় চিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর