Alexa তরুণ ক্রিকেটারের হতাশায় আগামী বিশ্বকাপ

ঢাকা, বুধবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৩ ১৪২৬,   ১৮ মুহররম ১৪৪১

Akash

তরুণ ক্রিকেটারের হতাশায় আগামী বিশ্বকাপ

মুনিম হাসান

 প্রকাশিত: ২০:৩৭ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৬:২৩ ২০ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে বলা হচ্ছে পঞ্চপাণ্ডবের দল। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক এবং রিয়াদকে ঘিরে এই পঞ্চপাণ্ডব তত্ত্ব এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। সত্যিকার অর্থে সাম্প্রতিক সময়ে এই পাঁচজনের পারফর্ম অসাধারণ। বেশির ভাগ ম্যাচ জয়েই ভূমিকা রাখছেন সামনে থেকে। এর বাইরে নতুনদের মধ্যে মেহেদী হাসান মিরাজ, মুস্তাফিজুর রহমান আলাদাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এছাড়া টেস্ট ক্রিকেটে মুমিনুল হক ও সম্প্রতি তাইজুল ইসলাম ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছেন।

২০১৫ সালের আগে ও পরে আরো বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার দলে এসেছেন। তারা খুব দ্রুত সময়ে পারফর্ম দিয়ে দারুণ জনপ্রিয়তা পেলেও তা ধরে রাখতে পারছেন না। ২০০৭ বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সাফল্যের বছর। সে সময় দলের সিনিয়র ক্রিকেটার বলতে ছিলেন হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিক, রাজ্জাক ও রাজিন সালেহ। আশরাফুল ও মাশরাফি তখন কম বয়সী হলেও অভিজ্ঞতার বিচারে বেশ এগিয়েই ছিলেন। এছাড়া তরুণ ক্রিকেটার হিসেবে দলে ছিলেন তামিম, সাকিব, মুশফিক।

সেই বিশ্বকাপটি তামিম-সাকিব-মুশফিকের সঙ্গে মাতিয়েছেন মাশরাফি, রাজ্জাক, রফিকরা। খুব একটা খারাপ করেননি আশরাফুলও। স্বভাবতই তরুন এসব ক্রিকেটারদের মাশরাফি, আশরাফুল, রাজ্জাকদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সুপার স্টার হিসেবে ভাবা হয়েছিল। এরপর দেশের মাটিতে ২০১১ বিশ্বকাপে মাশরাফি ইনজুরিজনিত কারণে খেলতে না পারলেও দলের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছিলেন আগের বিশ্বকাপের তরুণরা। সাকিব-তামিম-মুশফিকের সঙ্গে রাজ্জাক দারুণ পারফর্ম করেছেন। শুধুমাত্র আশরাফুলই বরাবরের মতো আশার প্রতিদান দিতে ব্যর্থ ছিলেন। তাই বলা যায় ২০০৭ বিশ্বকাপ থেকে ২০১১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জয়ের পরিসংখ্যানের উন্নতি যেমন হয়েছে তেমনি বাস্তবিক উন্নয়নও ঘটে। কারণ, চার বছর আগের তরুণরা পরের বছর নিজেদের উন্নত করেছিলেন।

২০১১ বিশ্বকাপের যারা দলের হাল ধরেছিলেন তাদের উপর নির্ভর করেই ২০১৫ বিশ্বকাপ মাতিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সিনিয়র হয়েও দলে জায়গা পোক্ত করতে পারেননি ইমরুল কায়েস। ২০১৫ বিশ্বকাপে সাকিব-তামিম-মাশরাফিরাই সিনিয়র। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ। তরুণ হিসেবে ২০১২ সাল থেকে দলে যুক্ত হতে শুরু করে বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ক্রিকেটার। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর ২০১৯ বিশ্বকাপে বেশ কয়েকজন তরুণের সাকিব-তামিম হয়ে ওঠার কথা ছিল। যার মধ্যে ছিলেন নাসির, সাব্বির, সৌম্য, লিটন, রুবেল, তাসকিন, আল আমিন, জুবায়ের। কিন্তু তারা তা হতে পারেননি।

অর্থাৎ ২০১৫ বিশ্বকাপের পর ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জয়-পরাজয় বিচারে বাংলাদেশের উন্নতির গ্রাফটা অনেকটা নিম্মমুখি। এর মধ্যে নতুনদের মধ্যে পরিপক্ক খেলোয়াড় পাওয়ার গ্রাফের মানটা একেবারেই তলানিতে। মিঃ ফিনিশার তকমা পাওয়া নাসির এই মুহূর্তে হয়ে ওঠার কথা ছিল সিনিয়র। অন্তত সাকিব-রিয়াদের কাছাকাছি থাকাটা বাঞ্চনীয় ছিল। পিঞ্চ হিটারের তকমা পাওয়া সাব্বির ম্যাচ জয়ী ইনিংসে আলোচিত হতে পারেননি। বরং মাঠের বাইরে জরিমানাতেই ব্যস্ত ছিলেন। সৌম্য সরকারের মতো একজন ব্যাটসম্যানের প্রতিক্ষা প্রতিটি দেশ করে। তিনিও হতে পারেননি ধারাবাহিক।

নতুন বল ও ডেথ স্পেশালিস্ট বোলার হিসেবে আল আমিন, তাসকিন, রুবেল হোসেন দলের ভরসা হয়ে উঠতে পারেননি। লেগ স্পিনার হিসেবে জুবায়েরকে তৈরি করার কোনো দৃশ্যমান আয়োজনও চোখে পড়েনি। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে সবুজ ঘাসের পিচে দুই শতক হাঁকানো আনামুল প্রতিশ্রুতিশীল হয়ে উঠতে ব্যর্থ। লিটন দাস প্রায় তিন বছর ধরে খেলেও আস্থাশীল হতে পারেননি। অর্থাৎ, ২০১৫ সালের পর ২০১৯ সালে বিশ্বকাপ জয়ের জন্য যে ধরণের ক্রিকেটার পাওয়া প্রয়োজন ছিল প্রতিভার বিচারে তার সবই পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু স্কিল ডেভলপমেন্টের জায়গায় একেবারেই পিছিয়েছে।

২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে হয়তো দৃশ্যমান জয়ের পরিমাণ বেড়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু ভিত্তিমূলক অর্জনের জায়গা শূন্য। অর্থাৎ নচিকেতার সেই গানের মতো, 'অনেক চলার শেষে দেখলাম শুরু থেকে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি'

২০১৫ সালে যে খুঁটির উপর বাংলাদেশ ক্রিকেট দাঁড়িয়ে ছিল সেই খুঁটিতেই জয় এসেছে। ব্যাপারটা বলা যেতে পারে, এক বাটি পানির মতো। যার উপরে বরফ জমেছে কিন্তু তলানিটা শক্ত হয়ে ওঠেনি।

এখানে দোষটা কি বোর্ডের নাকি খেলোয়াড়দের? কোনো পক্ষেরই দায় এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তামিম-মুশফিকরা গত ৪-৫ বছর ধরে প্রায় ৫০ গড়ে রান করেছেন। তার আগে ৩০-৩৫ গড়ে রান করেছিলেন। অর্থাৎ তারাও সেখানে গড়ে ৫ ম্যাচের দুটিতে সফল ছিলেন। এখন তা গড়ে ৫ ম্যাচে ৩-৪টিতে এসে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রায় ৬-৭ বছর ক্রিকেট খেলার পর এই পর্যায়ে এসেছেন। অথচ বেশির ভাগ খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে যায় ১০ বছর খেলার পর। আর তারা তাদের ক্যারিয়ারের সেরা ৮ বছর ওই ১০ বছরের মধ্যেই কাটান। সাকিব-তামিমদের অভিষেক নিছক ১৮-১৯ বছরে হয়েছে। তাই ২৮-২৯ এ এসে তারা সেরা সময় কাটাচ্ছেন। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে তারা শিখেছেন।

তাহলে সৌম্য-লিটন-তাসকিনদের সেরা পারফর্ম পেতেও কি ৭-৮ বছর অপেক্ষা করতে হবে? তাহলে এখানে ঘরোয়া লিগের দায় অবশ্যই রয়েছে। অর্থাৎ ক্রিকেটারদের যা কিছু শিখতে হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক ম্যাচ থেকে। ঘরোয়া লিগকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের করতে পারলে হয়তো সৌম্য-তাসকিনরা প্রথম এসে যে ঝলক দেখান তা মেইন্টেইন করতে পারবেন পুরো ক্যারিয়ারেই। এইখানে বিসিবির দায়কে অস্বীকার করবার উপায় নেই।

দ্বিতীয় বিষয়, খেলোয়াড়দের দায়। অধিকাংশ সময়ই দেখা যায়; যখন কোনো খেলোয়াড় অফফর্মে ভুগতে থাকেন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, সমস্যাটা কোথায়? এক্ষেত্রে দুটো বিষয় শোনা যায়। প্রথমত ব্যাটসম্যানরা বলেন, কোনো সমস্যা দেখি না। এক-দুই ইনিংস রান পেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আর দ্বিতীয় বিষয় বোলাররা বলেন, আগে তো এইসব করেই সফল হয়েছি।

ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা হল, সমস্যাটা ধরতে ব্যর্থ হওয়া। ক্রিকেটে এমন অনেক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। শচীন টেন্ডুলকারের বায়োগ্রাফিতে তিনি বলেছিলেন, একসময় আমি টানা দুই বছর রান পাচ্ছিলাম না। কেন পাচ্ছি না বুঝতে পারিনি। কিন্তু এক তরুণ ভক্ত আমাকে বলল, স্যার আপনার হ্যান্ডপ্যাডে সমস্যা আছে। ওটা ঠিক করে নেন। রান পাবেন। আমার তখনই মনে হল এটা হতে পারে। আমি হ্যান্ডপ্যাড অন্যভাবে তৈরি করে নিলাম। এরপর আমি রান পেতে শুরু করি। হয়তো এটা কিছুই না। কিন্তু আমার রান না পাওয়ার বিচ্ছিন্ন মনঃসংযোগকে এটি দূর করেছিল। অনেক সময় ছোট ছোট পরিবর্তন অনেক বড় সাফল্য এনে দেয়।

ব্যাটিংয়ে রানের ক্ষেত্রে ইউনুস খানের একটি বক্তব্য তুলে ধরা যাক। পাকিস্তানি এই ব্যাটসম্যান বলেছিলেন, আপনি সবসময় রান পাবেন না। কিন্তু যখন পাবেন তখন এটা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে উইকেটের গুরুত্ব বুঝতে হবে এবং রান করেই যেতে হবে।

অর্থাৎ দুই এক ইনিংস কখনও সব পাল্টে দেয় না। প্রতিটি ইনিংসের জন্য আলাদাভাবে তৈরি হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে রিকি পন্টিংয়ের বায়োগ্রাফি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সেখানে জানিয়েছেন, কিভাবে প্রতিটি সিরিজের আগে ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতেন।

মোহাম্মদ কাইফকে ডেব্যুর আগেই ভারতের ক্রিকেটের কিংবদন্তী হিসেবে ভাবা হতো। কিন্তু ক্যারিয়ারটা লম্বা হয়নি। আফসোস করে বলেছিলেন, ইশ! যদি একবার সিনিয়রদের সঙ্গে ভুলগুলো নিয়ে আলাপ করতাম! শচীন-সৌরভ-রাহুলদের মতো ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে খেলার পর আমার ক্যারিয়ার লম্বা না হওয়া আমার ব্যর্থতা। তাই এই বিষয়গুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বোলারদের সম্পর্কে কিংবদন্তী ওয়াসিম আকরামের একটি লাইনই যথেষ্ট। ওয়াসিম বলেছিলেন, আপনি বোলার হয়ে অভিষেকের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ এক বছর সফলভাবে কাটাতে পারবেন। কিন্তু যদি ইনোভেটিভ হন তবে ১৫-২০ বছর খেলা সম্ভব।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএইচ/এস