ডোনাল্ড ট্রাম্প: এক বিশ্ব মোড়লের উত্থানের গল্প

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৫ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১১ ১৪২৬,   ২০ শাওয়াল ১৪৪০

ডোনাল্ড ট্রাম্প: এক বিশ্ব মোড়লের উত্থানের গল্প

 প্রকাশিত: ১২:২৩ ২০ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ১২:২৩ ২০ জুলাই ২০১৮

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প

নিউইয়র্ক শহরের রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার ও রিয়েলিটি টিভি স্টার ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালের নভেম্বরে আমেরিকার ৪৫ তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হোন। বিলিয়নিয়ার এই ব্যবসায়ী রিপাবলিকানের প্রার্থী হয়ে বিপক্ষ দল ডেমোক্রেটের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে দুর্দান্তভাবে জয় লাভ করেন। ট্রাম্পের ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিলো তার বাবার করা রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট ফার্ম দিয়ে। এর মালিকানা তিনি গ্রহণ করেন ১৯৭০ সালের কাছাকাছি সময়ে। এরপরের আসন্ন দশকে ট্রাম্প নির্মাণ করেন হোটেল, অফিস টাওয়ার, ক্যাসিনো, গলফ কোর্সসহ আরো অনেক কিছু। সেইসাথে আর্বিভূত হোন ১৪ সিজনের 'The Apprentice' এ। তিনিই আমেরিকার একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি পূর্বে কোনো রাজনৈতিক পটভূমি ও মিলিটারি এক্সপেরিয়েন্স ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন। 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন নিউইয়র্কের কুইন্সে। ট্রাম্পের বাবা ফ্রেড, একজন রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট এবং মা ম্যারি, একজন স্কটিশ অভিবাসী, হোমমেকার। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ট্রাম্প ছিলেন দ্বিতীয়। মিলিটারি একাডেমীর হাইস্কুলে ৮ বছর পড়াশুনার পূর্বে ট্রাম্প তার প্রাথমিক পড়াশুনা শেষ করেছিলো কুইন্সের একটি প্রাইভেট স্কুলে। এরপরের দুই বছর ট্রাম্প পড়াশুনা করেন নিউইয়র্ক সিটির ফোরডহ্যাম ইউনিভারসিটি তে। এর কিছুদিনের মধ্যে তিনি ইউনিভারসিটি ট্রান্সফার করে ভর্তি হোন পেনসাইলভানিয়ার হোয়ার্টন স্কুল অব ফিনান্স এন্ড কমার্স ইউনিভারসিটি তে। এবং সেখানেই ১৯৬৮ সালে তিনি তার গ্র্যাজুয়েশন অর্জন করেন। 


১৯৭৭ সালের দিকে ট্রাম্প বিয়ে করেন ইভানা জেলনিকোভা নামের এক মডেলকে। সেখানে ট্রাম্পের তিন সন্তান, জুনিয়র ট্রাম্প, ইভানকা ও ইরিকের জন্ম হয়। কিন্তু ১৯৯২ সালের দিকে এই জুড়ির বিচ্ছেদ হয়ে পড়ে। এবং সে বছর ই ট্রাম্প তার দ্বিতীয় বিয়ে সম্পন্ন করে অভিনেত্রী মারলা ম্যাপলেসের সাথে। এর ক'বছর পর তার কন্যা সন্তান টিফানি জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু তার সে বিয়েও টিকে মাত্র ৬ বছর। ২০০৫ সালের দিকে ট্রাম্প আবার আবদ্ধ হোন স্লোভেনিয়ান মডেল ম্যালানিয়ে নসের সঙ্গে। এবং ২০০৬ সালের দিকে এই  দম্পতি একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেন। 

২০০৪ সালের দিকে ট্রাম্প একটি টিভি সিরিজ "The apprentice" হোস্ট করা শুরু করলেন। যেখানে কনটেসটেন্টরা একটি প্রতিযোগিতা করে তার কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট বিভাগে কাজ করার সুযোগ পেতে পারতেন। ট্রাম্প প্রায় এভাবে ১৪ টি সিজন কম্পলিট করে। 

এই টিভি শো এর মাধ্যমে ট্রাম্প বেশ খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়াও বিভিন্ন টিভি শো ও মুভিতেও কেমিয়ো এপিয়েরেন্স হিসেবে ট্রাম্পকে দেখা যেতো। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ট্রাম্প  সুন্দরী প্রতিযোগিতা মিস ইউনিভার্স, মিস ইউএসএ সহ বেশ কিছু অধিকার করে নেন। ১৯৯৯ সালে তিনি একটি মডেলিং এজেন্সি পেয়েছিলেন, যেটি এই প্রোগ্রাম গুলো পরবর্তীতে পরিচালনা করে। 

ইউএস প্রেসিডেন্সী তে জয়ী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ট্রাম্প কখনো কোনো সরকারী অফিস অথবা কোনো ধরণের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নি। যদিও এর আগে বেশ কয়েকবার তার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার কথা শোনা যায়, শেষ পর্যন্ত আর তা হয়ে ওঠেনি। ২০১১ তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তিনি বেশ কিছু টেলিভিশন ইন্টার্ভিউয়ে বারাক ওবামার জন্মস্থান যুক্তরাষ্ট্রে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রকৃত জন্মস্থান নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে তিনি বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় চলে আসেন এবং রক্ষণশীল রাজনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। 

২০১৫ এর জুনে ট্রাম্প টাওয়ারে এক বক্তৃতায় তিনি তার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থি হওয়ার খবর জানান। তার নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান বাণী ছিলো, মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন। অধিকাংশ প্রচারণা সভায় এই ট্যাগলাইন প্রিন্ট করা একটি বেসবল হ্যাট পড়ে আসতে দেখা যেত তাকে। তিনি আমেরিকান জনগণের উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তৃতায় ব্যপকভাবে রাজনৈতিক সংস্কার, অবৈধ অভিবাসন ও সরকারি লবিস্টদের বিপক্ষে কথা বলতেন। পাশাপাশি তিনি কর কর্তন, বাণিজ্য নীতির সংস্কার ও আমেরিকান শ্রমিকদের জন্য লক্ষাধিক চাকরির ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতিও দেন। এসবের জন্য তিনি বেশ জনপ্রিয়তা পান ও জেব বুশ, টেড ক্রুজের মতো নেতাদের পিছনে ফেলে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন লাভ করেন। 

সাধারণ নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিন্টন। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। হিলারি ছিলেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক ফার্স্ট লেডি। কিন্তু নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক ও উত্তেজক বক্তব্য ও টুইটের ফলে সমালোচনায় পড়েন ট্রাম্প। নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির অনেক রাজনীতিবিদের সমর্থন পেতেও ব্যর্থ হন তিনি। যাই হোক, ট্রাম্পের সোজাসাপ্টা বক্তব্য এবং তার ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য তিনি সমর্থকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ইস্যুটি ছিলো, রাজনীতির মারপ্যাঁচের জগতে তিনি ছিলেন একদমই নতুন, এজন্য অনেক আমেরিকান নাগরিক তার ওপর ভরসা রাখতে শুরু করেন। 

নির্বাচনের আগে প্রায় সব নির্বাচনী বিশ্লেষণী সংস্থার জরিপেই উঠে এসেছিলো ব্যাপক ভোটে জয়ী হতে চলছেন হিলারি। কিন্তু  ৮ নভেম্বরের নির্বাচনের পর যা দেখা গেলো তাকে অঘটনই বলা চলে। ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্সিয়াল রানিং মেট  ইন্ডিয়ানার মাইক পেন্স হিলারি ও তার রানিং মেট ভার্জিনিয়ার টিম কেইনকে হারিয়ে দেন। সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৩০৬ টি ইলেক্টোরাল ভোটে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস