ডেনমার্কের এক যৌনপল্লী ও কিছু গল্প...

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২১ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪২৬,   ১৫ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

ডেনমার্কের এক যৌনপল্লী ও কিছু গল্প...

 প্রকাশিত: ১৪:১৫ ৭ জুন ২০১৮   আপডেট: ১৪:১৮ ৭ জুন ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

যৌনপল্লী বা নিষিদ্ধপল্লি অথবা লালবাতি এলাকা (ইংরেজিতে Red light district রেড-লাইট ডিস্ট্রিক্ট) বলতে সেই অঞ্চলকে বোঝায় যেখানে যৌনশিল্প (যেমন সেক্স শপ, স্ট্রিপ ক্লাব বা অ্যাডাল্ট থিয়েটার ইত্যাদি) সংক্রান্ত বাণিজ্যের অস্তিত্ব বিদ্যমান। কোনো কোনো নিষিদ্ধ পল্লিতে যৌনকর্মীরা বৈধভাবে অবস্থান করে; কিন্তু বেশিরভাগ লালবাতি এলাকাগুলি তাদের বেআইনি পেশার কার্যকলাপের জন্য কুখ্যাত। ১৮৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলওয়াউকির সংবাদপত্র দ্য সেন্টিনাল-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে "রেড-লাইট ডিস্ট্রিক্ট" শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। ১৮৯০-এর দশকে সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহু ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল।

তেমনি নেদারল্যান্ডসের আমস্ট্রার্ডামকে বলা হয় রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট। ইউরোপের বিখ্যাত যৌনপল্লী এটি। শহরের অনেকে আমস্ট্রার্ডামকে নিয়ে গর্ব করে। এখানে সেক্স শপ, পর্ণোগ্রাপফি, মাদক সবই আছে। এখন সরকারীভাবে আমস্ট্রার্ডামে পতিতাবৃত্তি বৈধ। এখানে আছে ৩০০ এর ও বেশি উইন্ডো যেখানে কাজ করে অনেক পতিতা। কিন্তু এই পতিতারা কিন্তু তাদের নিজের ইচ্ছায় আসেনি এই নিষিদ্ধ পেশায়। এখানের প্রতিটি পতিতারই একটি করে গল্প আছে। কিন্তু গল্প গুলো শোনার কেউ নেই। কারণ এখানে কেউ গল্প শুনতে আসে না। এখানের প্রতিটি ঘরের কোণায় লুকিয়ে থাকে গল্প। এখানে কাজ করে যারা তাদেরকে সমাজ মর্যাদা দেয় না। নাক ছিটকায় তাদের থেকে। কিন্তু সমাজেরই ভদ্রলোকেরা রাতের অন্ধকারে পতিতাদের কাছে যায়।

বিখ্যাত ভারতীয় সাপ্তাহিকে একজন পতিতা বলেছিলেন, দুই হাজার পুরুষের সাথে বিছানায় যাবার পরও আমি নিজেকে এখনও গঙ্গাজলের মত পবিত্র মনে করি। কারণ এটি আমার পেশা, যেটা আমি নিজে বেছে নেইনি। নিতে বাধ্য হয়েছি।

আজ বলব আমস্টডার্মের নিষিদ্ধ পল্লীর একটি প্রেমের গল্প। ইউরোপের বিখ্যাত যৌনপল্লী এটি। এখানের প্রতিটি পতিতার গল্প একেক রকম। কিন্তু সবার মধ্যে একটি মিল আছে। তাদের কেউই চায়নি পতিতা হয়ে জীবন ধারণ করতে। সবাই চায় এখান থেকে চলে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে। সংসার করতে। কিন্তু সবাই তাদের জীবনের শন’কে খুঁজে পায় না। সবার ভাগ্য লিনার মত হয় না।

লিনা আমস্ট্রাডার্মের নিষিদ্ধ পল্লীতে কাজ করা এক পতিতা। কিন্তু লিনা আর সবার থেকে ভাগ্যবান। কারণ তাকে সাহায্য করতে এসেছিলে শন। জাহাজের কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করত শন। কোন এক কারণে নেদারল্যান্ডে আসে সে। আমস্ট্রার্ডামের নিষিদ্ধ পল্লীতে পরিচয় হয় লিনার সাথে। লিনা আর অন্য সব পুরুষের মত মনে করত শনকে। অন্য পুরুষরা যেমন ঘরে আসে, কথা বলে আর কাজ ফুরিয়ে গেলে পয়সা দিয়ে চলে যায়। কিন্তু শন তা করত না। শন লিনার কাছে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকত।

এক সাংবাদিক শনকে প্রশ্ন করেছিলেন, ঘন্টার পর ঘন্টা কিভাবে কাটাতেন লিনার সাথে। জবাবে শন বলেছিল শুধু মাত্র লিনার গল্প শুনে। শনের কাছে লিনা অন্য সবার থেকে আলাদা। লিনার সুন্দর মনটাকে খুঁজে বের করতে পেরেছিলেন শন। লিনারও শনকে ভালো লাগতে শুরু করে। কারণ পতিতার কাছে কেউ শুধু গল্প শুনতে যায় না। কিন্তু শন লিনার কাছে যেত শুধু লিনার গল্প শুনতেই। কিভাবে এখানে এসেছে, কেন এসেছে, তার ইচ্ছা কি এমন সব গল্প করত লিনা। আর শন তা মনোযোগ দিয়ে শুনতো।

লিনা বুলগেরিয়া থেকে দালালের খপ্পরে পরে এখানে এসেছে। এখানকার প্রায় প্রতিটি পতিতারই গল্প এরকম। কেউ ভালোবাসার জালে কাউকে বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়ে এখানে এসে পৌঁছেছে। আবার কেউ চাকরীর স্বপ্নে কাউকে বিশ্বাস করে ঠকে এখানে এসে পড়ছে। নিজের ইচ্ছে থেকে কেউ এখানে থাকতে আসেনি। তেমনি লিনা ও না। চার বছর বয়সে লিনার বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যায়। পরিবারের ভাঙনের ফলে শিশুদের মনে প্রভাব পরে। তাই ঘটেছিল লিনার।

১৫ বছর বয়সে মায়ের সাথে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বের যায় লিনা। সাথে কোন পয়সা ছিল না। এক দালালের খপ্পরে পড়ে এই পেশা বেছে নেয় সে। এভাবেই শুরু তার। এরপর বুলগেরিয়া থেকে পাঠিয়ে দেয়া হয় আমস্ট্রার্ডামে। এ সব গল্পই শোনাত শনকে। শন প্রেমে পড়ে যায় লিনার। আমস্ট্রার্ডাম থেকে চলে যাওয়ার পর সে লিনাকে ইমেইল করত, ফোন করত। মাঝে মাঝেই চলে যেত লিনার কাছে। সাংবাদিক একসময় প্রশ্ন করেছিল আপনি কি নিশ্চিত আপনি লিনার মনকে ভালোবেসেছেন? এর জবাবটাও শন খুব সুন্দর করে দিয়েছিল। শন বলেছিল আমি ওর সাথে প্রেম শুরু করার আগে কিন্তু শারীরিক সম্পর্কে যাইনি। ওর মনটাকেই কিন্তু আমি আগে দেখেছি।

শন ও লিনা জানে তাদের প্রেমটা আর অন্য সব প্রেম এর মত নয়। লিনা একজন পতিতা আর শন সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো একজন কেবিন ক্রু। শন চায় লিনাকে নিয়ে নিউইয়র্কে পাড়ি দিতে। তার বাবা মা’র সাথে লিনাকে পরিচয় করে দিতে। কিন্তু একটা জায়গায় সে এখনো ভয় পায় তা হল ‘সমাজ’। আর সবার মত শন ও চায় না সমাজের কাছে কথা শুনতে। সবার মত সেও চায় না তার প্রেমিকা পতিতার কাজ করুক।

২২ বছর বয়সী এঞ্জেলিকা তার পতিতা জীবনের কথা বলছিলেন এক সাংবাদিককে। কিভাবে সেই নরকে পাঁচটি বছর কাটিয়েছে বলতে গিয়ে এঞ্জেলিকা বারবার কেঁদে উঠছিল। এঞ্জেলিকা রোমানিয়ার মেয়ে। ১৭ বছর বয়সে প্রেম এ পড়ে এক যুবকের। প্রেম এতটাই তীব্র ছিল যে বিয়ে করে ঘর বাঁধবে বলে ঠিক করে তারা। ভালো চাকরি  নিয়ে সংসার করবে  বলে তার বয়ফ্রেন্ড তাকে নিয়ে নেদারল্যান্ডে আসে। এখানে এঞ্জেলিকাকে বিউটি পার্লারে হেয়ার স্টাইলিষ্টের চাকরী দেওয়ার বদলে আমস্ট্রার্ডামের নিষিদ্ধ পল্লীতে বিক্রি করে দেয় এবং এঞ্জেলিকার পাসপোর্টও কেড়ে নেয়।

এখানে এসে শুরু হয় তার নরকে জীবনযাপন। একদিকে প্রেমে ধোকা খেয়ে তার হৃদয় ভেঙ্গে গেছে আর অন্যদিকে তাকে এখন পতিতা হয় জীবন পার করতে হচ্ছে। প্রেমে ধোকা খাওয়ার কষ্ট কিছুই মনে হয় না যখন এঞ্জেলিকাকে জোড় করে কারো রুমে পাঠানো হয়। তার মনে হয় কতগুলো পশুর মাঝে সে বাস করছে।

আশেপাশের পুরুষদের তার আর মানুষ মনে হয় না। নানা অত্যাচারের শিকার হত সে। জোর করে তার গর্ভপাত করানো হয়। এমনকি ওখানে যারা আসত তারা যে টাকা তাকে দিয়ে যেত তার বেশিরভাগ অংশই তার দিয়ে দিতে হত দালালকে। ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে দিনে ৩৫০ ইউরোর মত আয় করলেও দালালদের দিয়ে দিন শেষে হাতে থাকত মাত্র ৯ ইউরো!

এমনকি এঞ্জেলিকার দালাল প্রায়ই তাকে মারত ও রেপ করত। যখন সে তার ক্লাইন্টের কথা মত কাজ করতে না চাইতো সেখানেও তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হত। এঞ্জেলিকার মতে সবার আগে সভ্য হওয়া ব্রিটিশরা পশুর মত আচরণ করে। তারা পতিতাকে একজন মানুষ মনে করা না। নোংরা কীট মনে করে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে তারাই এই পতিতাদের কাছে আছে আনন্দ খুঁজে নিতে।

এতকিছুর পর পাঁচ বছর সে কাটিয়ে দিলো সেখানে। কিন্তু একদিন সে সাহস করে ওখান থেকে বের হুওয়ার চেষ্টা করে। পতিতাদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বহুজাতিক এন জি ও ডেনমার্কের রয়েছে। এনজিও তে কাজ করা এক কর্মকর্তার সাথে তার পরিচয় হয় এবং সে সাহস করে বলে সে এই নরক থেকে বের হতে চায়। তাদের সহযোগিতায় এঞ্জেলিকা পাঁচ বছর পর সেই নরক থেকে বের হতে পারে। কিন্তু সবাই এঞ্জেলিকার মত ভাগ্যবতী নয়।

এঞ্জেলিকা এখন রোমানিয়াতে আছে তার পরিবারের কাছে। কিন্তু নিষিদ্ধ পল্লী থেকে সাধারণ জীবনে ফিরে আসাও সোজা ব্যাপার না। সমাজ পল্লী থেকে ফিরে আসা পতিতাদের পতিতা হিসেবেই দেখে। আর পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মত আচরণ করে না তার সাথে।

এঞ্জেলিকাকে এখন এই সব সহ্য করতে হচ্ছে। তার পরিবারের সাথেও খুব একটা ভালো সম্পর্ক যাচ্ছে না। প্রতিবেশীরাও তাকে নিয়ে নানা কথা বলে। বাইরে কাজ করতে ও তার সমস্যা হচ্ছে। আশপাশ থেকে নানা কথা তাকে শুনতে হয়। সব মিলিয়ে মাঝে মাঝে এঞ্জেলিকা ভাবে, এক নরক থেকে বেরিয়ে সে কি এবার অন্য কোন নরকে এসে পড়ল?

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ

Best Electronics