ইজ আশার ফুল ব্যাক?

ঢাকা, সোমবার   ০১ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৮ ১৪২৭,   ০৮ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

ইজ ‘আশার ফুল’ ব্যাক?

 প্রকাশিত: ২২:৪৫ ২ এপ্রিল ২০১৮   আপডেট: ২০:৪৫ ১৫ এপ্রিল ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ক্রিকেটের উজ্জল নক্ষত্র মোহাম্মদ আশরাফুল ১৯৮৪ সালের ৭ জুলাই ঢাকায় জন্ম নেন। তার ডাকনাম মতিন। তবে ভক্তদের কাছে এই নামে তিনি পরিচিত নন। অ্যাশ নামেই সমধিক পরিচিত আশরাফুল। তিনি দেশের সেরা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে অন্যতম একজন হিসেবে এখনো সমানতালে মাঠ মাতিয়ে চলছেন।

২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ওয়ানডে অভিষেক হয় আশরাফুলের। ২০০১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আশরাফুল কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন। ২০০৫ সালে ক্রিকেট পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্মরণীয় জয়ের অন্যতম নায়ক আশরাফুল। তার ব্যাট থেকে আসে সেঞ্চুরির রান।

২০০৭ বিশ্বকাপের পর আশরাফুল দলের সহ অধিনায়ক হন। পরে অধিনায়কের দায়িত্ব পান তিনি। যিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম অধিনায়ক ছিলেন। আশরাফুল ২০০৯ সালে ভারতের আইপিএল টুর্নামেন্টে ম্ম্বুাই ইন্ডিয়ানসের পক্ষে একটি ম্যাচ খেলেন। বিপিএলে দ্বিতীয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে সেঞ্চুরি হাঁকান আশরাফুল। ২০১৩ সালে টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ৪১৭ বলে ১৯০ রানের চোখ ধাঁধানো ইনিংস খেলেন আশরাফুল। যা ছিল সে সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের টেস্টে সর্বোচ্চ রান।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ বা বিপিএলে ঢাকা গ্লাডিয়েটর্স এর অধিনায়কত্ব পালনের সময় ২০১৩ সালে ম্যাচ ফিক্সিংয়ে অভিযুক্ত হয়ে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন দেশের সেরা এই ব্যাটসম্যান।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে রয়েছে তার ব্যাপক অবদান। বলা যায় তার মাধ্যমেই এদেশের ক্রিকেট বিশ্বে শক্ত অবস্থান করতে সক্ষম হয়। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে আশরাফুল নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান। কিন্তু হঠাৎ করে কালো অধ্যায়ের আঘাতে তার ছন্দপতন কেঊ মেনে নিতে পারেননি।

বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট, শক্ত অবস্থানে রয়েছে। আর এই সময় ক্রিকেটের ছুঁটে চলা গতিকে আরো শক্তিশালী করতে জাতীয় দলে আশরাফুলের মতো ব্যাটসম্যানের প্রয়োজন অনেক বেশি। তার ভক্ত সমর্থকরা আসা করেন আশরাফূল বর্তমান ফর্ম কাজে লাগিয়ে আবারো ফিরে আসবেন জাতীয় দলে।

অভিযুক্ত ছন্দপতনের জীবনে দীর্ঘ সময় বেশখানিকটা নির্বাসনে থাকার পর ঘরোয়া ক্রিকেটের মাধ্যমে ফিরেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘আশার ফুল’ বলে খ্যাত সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে টানা তিনটি সেঞ্চুরির পাশাপাশি এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৫টি সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ভালো খেলার মাধ্যমে আবারো ফিরতে চান জাতীয় ক্রিকেট দলে। পৌঁছাতে চান অনন্য উচ্চতায়, গড়তে চান আরো আরো রেকর্ড। যদিও চলে গেছে অনেকটা সময়।   জীবনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। বিয়ে করেছেন, হয়েছেন কন্যা সন্তানের বাবা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে ২০১৮ সালের আগস্টে।

ডেইলি বাংলাদেশ এর “ক্রিকেট নক্ষত্র আড্ডায়” ওঠে আসে আশরাফুলের খেলোয়াড়ি জীবনের উত্থান-পতন আর ক্রিকেটে ফেরার সংগ্রামী কিছু তথ্য। দেশের সেরা এই ক্রিকেটার একান্তে বলেছেন না বলা অনেক কথা। অজানা সেসব কথা নিশ্চয় জানাতে ইচ্ছে করছে আপনাদেরও? আর তাই তুলে ধরা হলো আশরাফুলের কতকথা।

প্রশ্নঃ কেমন আছেন?

উঃ আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি। সবার দোয়ায় ভালো ভাবেই বেঁচে আছি।

প্রশ্নঃ গুড কামব্যাক, ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে হ্যাট্রিক সেঞ্চুরিসহ ৫ টি সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়লেন, কেমন লাগছে ?

উঃ আলহামদুলিল্লাহ্ , খুবই ভালো। শুরুতে ততোটা ভালো হয় নাই। একটা সেঞ্চুরির পর তিনটা জিরো, আমার ড্রপের একটা সম্ভবনাও ছিল। যে ম্যাচে সুযোগ পেলাম সেই ম্যাচে আরেকটা সেঞ্চুরি করি। এরপর আরো একটা জিরো। পরে অবশ্য সবগুলো ম্যাচেই ভালো রান করতে পেরেছি। ৫ বছর আগে লিগে আমার ৫ টি সেঞ্চুরি ছিল। এবার ১৩ ম্যাচে আরো ৫টি সেঞ্চুরি পেলাম আলহামদুলিল্লাহ্ সব মিলিয়ে ভালো লাগছে।

প্রশ্নঃ আপনার ভক্তদের জন্য বার্তাটা কি?

উঃ ফ্যানরা চাইছিল, একটা ভালো কামব্যাক। আমি তা করতে পেরেছি, ভালো লাগছে। সবার দোয়া চাই।

প্রশ্নঃ অনেকের জানতে চাওয়া, কবে ফিরছেন জাতীয় দলে?

উঃ জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন এখনো দেখি। তবে এই মুর্হূতে আমার লক্ষ্য বিসিএল’এ খেলার। ওখানে যদি সুযোগ পাই, তিনটি ম্যাচ খেলতে পারবো বিসিএল’এ। সেখানে যেন বড় হ্যান্ড্রেড করতে পারি, ডাবল হ্যান্ড্রেড বা ট্রিপল হ্যান্ড্রেডেরও চেষ্টা থাকবে। এরপর বিপিএল আছে। তার আগে টি টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আছে। সেগুলোতে যেন ভালো খেলতে পারি। জাতীয় দল নিয়ে স্বপ্ন দেখি, কিন্তু এখন চিন্তা করছি না।

সামনে যে খেলাগুলো রয়েছে, তাতে আমি ভালো করার চেষ্টা করবো। আরো ফিট হতে হবে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ভালো হয়েছে, স্ট্রাইক রেট ৭৪। ওয়েট কমাতে পারলে, ফিজিক্যাল ফিটনেস বাড়াতে পারি, তাহলে এ স্ট্রাইক রেট ৮৫ বা ৯০য়ে চলে যাবে। আমার জন্য তা খুব ইম্পরট্যান্ট। আর বিপিএল এর খেলাগুলো ক্যামেরার সামনে হবে। সেখানে যদি ভালো খেলা সম্ভব হয়, বড় ইনিংশ খেলতে পারি, তখন হয়তো সিলেক্টররা বিবেচনা করতে পারেন।

এক সময়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য এই ক্রিকেটার কথার ফাঁকে বললেন, জাতীয় দলে খেলার জন্য আমি এখনো রেডি নই। ৫টি সেঞ্চুরি করেছি কিন্তু টিম বাংলাদেশে খেলার মতো ফিট হইনি এখনো। বর্তমানে যেভাবে জাতীয় দল খেলছে, সেখানে সুযোগ পেতে নেক্সট ৫-৬ মাস আমাকে প্রচুর শ্রম দিতে হবে।

প্রশ্নঃ জীবনের কঠিন সময় পার করে ফের মাঠে নিয়মিত হয়েছেন, কার অনুপ্রেরণা আপনাকে শক্তি জুগিয়েছে ?

উঃ হ্যাঁ, পাঁচটা বছর অনেক কঠিন সময়। ছোটবেলা থেকে ক্রিকেট খুব ভালোবাসি, খেলাটা আমার সখ। ভক্তরা আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছেন। আমার ফ্যামিলি, আমার বন্ধুরাও। নিজের প্রতিও ঐ বিশ্বাসটা ছিল। সবসময় সৎ থাকার চেষ্টা করেছি। যার কারনে আল্লাহ আমাকে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৫টি সেঞ্চুরি করার ক্ষমতা দান করেছেন।

প্রশ্নঃ অনেকে বলেন আপনার বয়স বেড়েছে। সেই আশরাফুলকে আর পাওয়া সম্ভব নয়, এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি ?

উঃ ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের বয়স তেমন কোন সমস্যা নয়। বরং বয়স যত বাড়ে ব্যাটসম্যানরা ততই ম্যাচিউরড হন। হ্যাঁ, ১৮ বছর বয়সে যে ম্যানটালিটি ছিল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক অবস্থাও ততই ম্যাচিউরড হয়। ফিটনেসটা আরো একটু বাড়ালে আমার মনে হয় না সমস্যা হবে। বরং আগের আশরাফুলের চেয়ে ভালো হবে। পারফর্মেন্স ওয়াইজ ভালো হবে ইনশাল্লাহ।

প্রশ্নঃ ক্রিকেট বোর্ডের নীতি-নির্ধারকরা আপনার ফর্মে ফিরে আসা, কিভাবে দেখছেন ?

উঃ আমার বিশ্বাস, আশরাফুলের পারফরমেন্সে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ খুশি। সবাই চায় আমি ভালো করি।

প্রশ্নঃ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির সুনজর রয়েছে আপনার দিকে, কথাটা কতটা সত্য ?

উঃ হ্যাঁ, বোর্ড প্রেসিডেন্ট বলেন, ক্রিকেট বোর্ড বলেন, সবাই আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছে। আমি খুব ভাগ্যবান যে ১৬ কোটি মানুষই আমাকে ভালোবাসেন। ছোট বেলা থেকে পেয়ে আসছি মানুষের ভালবাসা। এখনও দিয়ে যাচ্ছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। অন্তত তাদের জন্য হলেও ভাল পারফমেন্স করতে পারি, এই লক্ষ্যই থাকে সারাক্ষণ।

প্রশ্নঃ আপনার জীবনের স্মরণীয় ম্যাচ কোনটি ? অনুভূতি কেমন ছিল?

উঃ আমার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, ওটা আমাকে এবং বাংলাদেশকে টেস্ট নেশন হিসেবে বিশ্বে পরিচিত করেছে। অস্ট্রেলিয়াকে হারানো, ইয়াংগেস্ট টেস্ট সেঞ্চুরি। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বিশ্বকাপে জেতাটা, বাংলাদেশের আগের জেতা ম্যাচগুলো সবই স্মরণীয়। যে ম্যাচ গুলোতে আমি ভালো খেলেছি।

প্রশ্নঃ পরিবার নিয়ে কেমন কাটছে দিন ? অবসর সময়গুলো কিভাবে কাটান ?

উঃ আমার মেয়ে, বোনের ছেলে এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে খুব ভালোই আছি।

 

প্রশ্নঃ সম্প্রতি বল টেম্পারিং একটি আলোচিত বিষয়, এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি ?

উঃ এ ধরণের ঘটনা এর আগেও হয়েছে। কিন্তু এভাবে ক্যামেরায় বন্দি হয়নি। এটা খুব দুঃখজনক ঘটনা যে ৩ জন ক্রিকেটার এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার মধ্যে ২ জন কিন্তু গ্রেট ক্রিকেটার। ওদের জন্য আসলেই খারাপ লাগছে। ওত বড় ক্রিকেটার একটা বছর খেলতে পারবেন না, এটা খুবই দুঃখজনক। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য বার্তা হলো, ওদের কাছ থেকে আমাদের খারাপ-ভাল অনেক কিছুই শিখতে হবে। ঐ ধরণের ঘটনা যেন আমাদের দ্বারা না হয়।

প্রশ্নঃ দেশে-বিদেশে আপনার প্রিয় ক্রিকেটার কে ?

উঃ আমি ছোট বেলা থেকে শচিন টেন্ডুলকারের ভক্ত ছিলাম। আর বাংলাদেশে আমিনুল ইসলাম বুলবুল। এ দুই জন ক্রিকেটারকে দেখে বড় হয়েছি। সুজন ভাই, হাবিবুল বাশার সুমন ভাই, নান্নু ভাই, আকরাম ভাই, রফিক ভাইদের সঙ্গে খেলেছি। উনাদের সঙ্গে খেলতে পেরে, আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি। এখন তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাশরাফি ওদের সঙ্গেও আমি খেলেছি। অলোক কাপালি ভাইয়ের খেলা খুব ভালো লাগত।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশ ক্রিকেটে প্রথম সুপারস্টার আপনি। এক সময় বলা হতো আশরাফুল দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিভাবান ক্রিকেটার। সেই আশরাফুলের এতো উত্থান-পতন, আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? সেক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি ?

উঃ অবশ্যই আমি আমার ঘটনার জন্য পুরো জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছি। এটা অবশ্যই দুঃখজনক ছিল। তবে আমি লাকি যে আমি আরেকবার সুযোগ পেয়েছি। স্টিভেন স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নারের কাছ থেকে যেভাবে শিখতে হবে, আমার কাছ থেকেও শিখতে হবে সেভাবেই। যাতে করে এধরণের ঘটনা আর না ঘটে। বর্তমান ক্রিকেটে টাকার যে ছড়াছড়ি, সেখানে বিভিন্ন ধরণের অফার আসবে। কিন্তু তরুনদের এসব বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। এধরনের সিচুয়েসনকে সততার সঙ্গে ভালোভাবে কন্ট্রোল করতে হবে। পুরো টিম, কোচ, সর্বোপরি ক্রিকেট বোর্ডকেও। সবচেয়ে বড় কথা হলো নিজেকে সৎ থাকতে হবে।

প্রশ্নঃ আশরাফুল, ডেইলি বাংলাদেশ’কে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন।

উঃ আপনাকেও ধন্যবাদ। ডেইলি বাংলাদেশকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর/সালি/এলকে