ডুবে যাচ্ছে দ্বীপ, বাঁচাতে সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করলেন তারা

ঢাকা, শনিবার   ০৪ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২১ ১৪২৬,   ১০ শা'বান ১৪৪১

Akash

ডুবে যাচ্ছে দ্বীপ, বাঁচাতে সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করলেন তারা

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০৫ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৮:২০ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সমুদ্রের অতলে গবেষকরা

ছবি: সমুদ্রের অতলে গবেষকরা

নীলচে রঙা পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকশ মাছ ধরার নৌকা। ভারত ও শ্রীলঙ্কার লেকেডিভ সমুদ্রের মাঝে একটি ছোট্ট দ্বীপ ভান। জীব বৈচিত্র্য ও সমুদ্রের রত্নভাণ্ডারের প্রবেশ দ্বার বলা হয় এই দ্বীপকে। এর চারপাশে পানি আর পানি। সেখানেই চলে জেলেদের মাছ ধরার পাল্লা।

সেখানকার নীলচে পানিতেই লুকিয়ে রয়েছে জীব বৈচিত্র্যতা। সেখানেই রয়েছে প্রায় দুই হাজার ২০০ ফিন মাছের প্রজাতি, কাঁকড়ার ১০৬ প্রজাতি এবং ৪০০ টিরও বেশি প্রজাতির শামুক। পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক বোতলনোজ ডলফিন, পোর্টপেইস এবং হ্যাম্পব্যাক তিমি রয়েছে সেখানে। তবে আজ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে এসব। কারণ মাছ ধরার ট্রলারের পায়চারি যে কমছে না! আর এতে ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক উদ্ভিদ।

দ্বীপের চারপাশে শত শত নৌকাউপকূলীয় প্রায় দেড় হাজার জেলের জীবিকার উৎস হলো এই সামুদ্রিক প্রাণ। মূল ভূখণ্ড থেকে নৌকায় করে আধা ঘণ্টার মধ্যেই সেখানকার উপকূলের ৪৭ টি গ্রামে সহজেই তারা যাতায়াত করতে পারে। ভান দ্বীপটি সহায় সম্বলহীন জেলেদের আবাসস্থল। সঙ্গে গবেষকদের মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। তবে বিগত ৫০ বছর ধরে দ্বীপটি চারপাশের পানিতে মিলিয়ে যাচ্ছে। 

জেলেরা মাছ ধরছে১৯৭৩ সালে ভান দ্বীপটির বিস্তৃতি ছিল সাড়ে ২৬ হেক্টর (৬৫ একর) জুড়ে। এখন শুধু দ্বীপটি অবশিষ্ট রয়েছে চার দশমিক এক হেক্টর অর্থাৎ ১০ একরের মতো। গবেষকদের মতে, ২০২২ সাল নাগাদ দ্বীপটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। ১৯৮৬ সালে গাল্ফ অব ম্যানার বায়োস্ফেয়ার রিজার্ভ এর গবেষণায় লাল দাগে যে ২১ টি দ্বীপের নাম উঠে এসেছিল তার মধ্যে ভাল ছিল একটি। ২১ টির বর্তমানে মাত্র ১৯ টি অবশিষ্ট রয়েছে। এসব দ্বীপগুলোও কয়েক বছরের মধ্যেই বিলীন হয়ে যাবে বলে জানান গবেষকরা। 

ভান দ্বীপমূলত, জলবায়ু পরিবর্তনই ভানের মতো ছোট দ্বীপগুলো ডুবে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এছাড়াও দৈনন্দিন মাছ ধরার অভ্যাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ট বেড়ে যাওয়া এর কারণ হতে পারে। বর্তমানে এই দ্বীপের চারপাশে মাছ ধরা নিষিদ্ধ রয়েছে। যে কোনো দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র বাঁচাতে সামুদ্রিক উদ্ভিদের গুরুত্ব অপরিসীম। সিগ্রাস হলো এমন উদ্ভিদ যা পানির নীচে জন্মে এবং এর শিকড়, ডালপালা এবং পাতা জলজ প্রাণীদের আবাসস্থল। সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সামুদ্রিক প্রবাল।

নেই কোনো সমুদ্রের ঘাসদক্ষিণ ভারতের নিকটবর্তী উপকূলীয় শহর থুথুকুডির সুগন্তী দেবদাসন মেরিন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসডিএমআরআই) সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী গিলবার্ট ম্যাথিউস ২০০৮ সালে ভান দ্বীপের চারপাশে প্রথম গবেষণা কাজ শুরু করেন। তিনি মাসে অন্তত একবার আট ঘণ্টা যাবত গভীর পানিতে ডুব দিয়ে সামুদ্রিক জীব বৈচিত্র্য পরীক্ষা নীরিক্ষা করেন। তিনি সেখানকার চিত্র দেখে হতাশায় ভেঙে পড়েন। তিনি দেখলেন, তার চারপাশে বহু সামুদ্রিক প্রবাল ভেসে বেড়াচ্ছে। এই দ্বীপপুঞ্জটি ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বাধিক সীগ্রাসে (সামুদ্রিক ঘাস) পরিপূর্ণ ছিল। অথচ সেগুলো পানির নিচের মাটি ছেড়ে শূন্যে ভাসছে।

তারা সমুদ্রের নীচে পর্যবেক্ষণ করেনএর মূল কারণ হলো জেলেদের মাছ ধরার অভ্যাস। বিভিন্ন ট্রলার নৌকা এমনকি কারেন্ট জাল যেগুলোর হাতছানি গভীর পানি পর্যন্ত। এগুলোর কারণেই সমুদ্রের প্রবাল নষ্ট হতে থাকে। যদিও অনেক আগে থেকেই সমুদ্রের রত্নভাণ্ডার নষ্ট করার বিষয়ে কঠোর নিয়ম ছিল। তা স্বত্বেও তদারকি কম হওয়ার কারণে আইনটি কঠোরভাবে প্রয়োগ হয়নি। আর এ সুযোগে ট্রলার চলাচলের মাধ্যমে শত শত সবুজ ঘাসগুলো মাটি থেকে উপড়ে গেছে। এসব ঘাসের আড়ালে আবডালেই তো মাছেদের চলাফেরা। এ কারণে মাছের মজুদও আজ হ্রাস পেয়েছে। 

মাটি খুঁড়ে বীজ বপণ করা হয়গিলবার্ট ম্যাথিউজ জানান, আমরা ভান দ্বীপটিকে সংরক্ষণ করতে অনেক চেষ্টা আজো চালিয়ে যাচ্ছি। যদিও সমুদ্রের ঘাস পুনরুদ্ধার করা একটি মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী মিশেল ওয়েকটের নেতৃত্বে ২১৫ টি গবেষণার বৈশ্বিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, সমুদ্র প্রবাল ১৯৮০ সালের পর থেকে প্রতিবছরই দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ১৮৭৯ সালের পর সামুদিক প্রবাল বা উদ্ভিদ ২৯ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। 

রোপণের জন্য চারাগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছেতবে ভান দ্বীপের চারপাশে যদি সমুদ্রের তৃণভূমিগুলো পুনরায় প্রাণবন্ত করা যায় তবে কেমন হয়? গবেষকরা শুরু করলেন নতুন পরীক্ষা। কীভাবে সমুদ্রের নীচে আবারো উদ্ভিদের সংখ্যা বাড়ানো যায়? এর দু’টি উপায় ছিল- এক, সিগ্রাস বীজ পানির অগভীরে ছড়িয়ে দেয়া এবং দুই, সিগ্রাস বপন করা। তবে প্রথমটি করা হলেও এর ভালো ফলাফল মেলেনি। তাই দ্বিতীয় পদ্ধতিরই দারস্থ হন গবেষকরা। প্রতিটি সামুদ্রিক প্রবালের চারা একটি একটি করে রোপণ করেছেন তারা। যদিও এই কাজটি প্রচুর ব্যয়বহুল ও শ্রমনির্ভর ছিল তবুও গবেষকরা ভান দ্বীপটি বাঁচাতে এসব করেছেন।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে ডুবে তারা এ কাজ করেছেনপ্রতিটি উদ্ভিদের শিকড় কাদা মাটির নীচে পাকাপোক্ত হতে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগেছিল। পাশাপাশি প্রতি মাসে গবেষকরা সেখানকার পরিবেশগত অবস্থার পরিমাপ করেন। যা পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, অম্লতা এবং অক্সিজেনের স্তরগুলোকে দ্রবীভূত করার মতো সমুদ্রের বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। পঞ্চম মাসের মধ্যেই, দলটি সাফল্যের লক্ষণগুলো দেখতে শুরু করেন- দ্বীপের সমুদ্রিক বৈচিত্র্যতা আবারো বেড়ে যেতে শুরু করল। প্রচুর ফিন ফিশ, শামুক, হর্স ফিশ, সামুদ্রিক কচ্ছপের দেখা মিললো। মাছ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক জীবন ফিরে আসতে শুরু হলো। 

এভাবেই সমুদ্রের ঘাস রক্ষা করা হয়ম্যাথিউস এবং তার সহকর্মীরা ২০১৬ সাল নাগাদ তাদের এ কাজ অব্যাহত রাখেন। ডুবে যাওয়া দ্বীপটি বাঁচানোর লড়াইয়ে এটাই প্রথম ভারতের প্রচেষ্টা বলে জানান অ্যাডওয়ার্ড জে কে প্যাটারসন। তিনি বলেন, আজ অবধি ভান দ্বীপটিকে টিকিয়ে রেখেছে এর আশেপাশের অগভীর পানিতে থাকা জলজ উদ্ভিদরা। আমাদের প্রচেষ্টায় দ্বীপটি বিলীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমেছে। ডুবন্ত এক দ্বীপ বাঁচানোর লড়াইয়ে ভারতের প্রথম সার্থকতা এটাই। আপাতত, ভান দ্বীপটি স্থিতিশীল।

সূত্র: বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস