ডিজে নারীদের জীবন এখনো ঝুঁকিপূর্ণ, কম হয় না কটূক্তিও!

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

ডিজে নারীদের জীবন এখনো ঝুঁকিপূর্ণ, কম হয় না কটূক্তিও!

আয়েশা পারভীন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:১৬ ৩০ মে ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের উচ্চবিলাসী মানুষদের কাছে ডিজে পার্টি এখন খুব পরিচিত। শুধু উচ্চ বিলাসীদের কাছে নয় বরং এই দেশের মধ্যবিত্ত অনেক তরুণ-তরুণীদের কাছেও এর জনপ্রিয়তা অধিক। এর আগে থেকে বিশ্বের অনেক দেশেই ডিজে পার্টির জনপ্রিয়তা রয়েছে। 

তবে বিশ্বের সব দেশে এই কাজটি নারী-পুরুষ দ্বারা সংঘটিত হলেও একটা সময় বাংলাদেশে এটি শুধু পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে কয়েক বছর ধরে এর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে নারীদেরও। এরপর থেকে বাংলাদেশে ডিজে পার্টি তরুণ-তরুণীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিভিন্ন পার্টিতে গানের মিক্সিং করে তার তালে তালে অতিথিদের মাতানোর কাজটি করেন ডিজেরা। এতে বর্তমানে পুরুষদের মতো নারীরাও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজটি করে চলেছেন। 

ডিজে সনিকা

ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য থাকছে আজ এই রঙিন দুনিয়ার নারীদের জীবনের গল্প। কীভাবে তারা এই পথ বেছে নিয়েছেন। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ডিজে তরুণীদের জীবন যাপনের এমনই গল্প। যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ডিজে হিসেবে আবির্ভাব হয় সনিকার, আর তাকে দেখে মূলত আগ্রহী হয়ে ২০০৭ সাল থেকে একই কাজ শুরু করেন সুলতানা রাজিয়া সুমি। 

ডিজে সুমি

এদিকে, ডিজে পার্টিতে সনিকা ‘ডিজে সনিকা’ হিসেবে অধিক পরিচিত। তবে এটি তার মূল নাম নয়। তার নাম মারজিয়া কবীর সনিকা। এর আগে, তিনি শুধু দেশেই নন, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো দেশে বিভিন্ন শোতে নিয়মিত ডিজে হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে এই পেশা এখনো মেয়েদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, এমনটা মনে করেন সনিকা। তবে তিনি এই রাস্তায় কীভাবে এসেছেন; তাও জানিয়েছেন বিবিসির প্রতিবেদকের কাছে। 

তার ভাষ্য, ডিজেতে আসার আগে আমি একেবারে মিডিয়া থেকে আলাদা ছিলাম। কিন্তু ডিজে রাহাত ঘোষণা দেন, বাংলাদেশে ডিজে শিখতে আগ্রহী প্রথম ব্যাচকে বিনামূ্ল্যে শেখাবেন তিনি। তখন আমি জানলাম, মেয়ে ডিজে নাই বাংলাদেশে। তখন আমার মনে হলো এই পেশায় আসতে হবে। চলে আসলাম।

তবে পেশাটি ঝুঁকিপূর্ণ এই কারণে বললাম, লোকজন সন্ধ্যার দিকেই ডিজে করতে পছন্দ করে। দিনে এই ধরনের পার্টি খুব কমই হয়। শুধু জন্মদিন বা পিকনিকে ডিজে দিনে হয়। বাকিটা কিন্তু রাতেই হয়। তাই এই সময় মেয়েদের বের হয়ে কাজ করা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সেক্ষেত্রে আমাকে তো সেরকম সিকিউরিটি নিয়ে যেতে হয়। যাতে বের হয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারি। দুজন মানুষেকে সঙ্গে রাখতে হয়, শুধুমাত্র সিকিউরিটির জন্য।

ডিজে পার্টির মধ্যেও এখন অনেক কিছু বদলে গেছে, বললেন সনিকা। তিনি বলেন, আগে এই কাজ অনেক কষ্টসাধ্য ছিল, কারণ ওই সময় ডিজেতে ডিস্কের মাধ্যমে গানের ব্যবহার করা হতো, কিন্তু বর্তমানে পেনড্রাইভ এর যুগে কাজটি সেভাবে আর করতে হয় না। এছাড়া পুরুষদের মধ্যে ডিজে হিসেবে অনেকেই কাজ করছেন বেশ আগে থেকেই এবং তাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে সংগীত পরিচালনা, বিজ্ঞাপনের কাজ ইত্যাদিতেও যুক্ত হয়েছেন।

বাংলাদেশে কয়েকজন পুরুষ ডিজের মধ্যে, ডিজে প্রিন্স, ডিজে রাহাত, ডিজে লিটন ও ডিজে মিরাজসহ আরো অনেকের নাম চলে আসে। এদের মধ্যে অনেকেই নতুনদের প্রশিক্ষণ করান। আবার অনেকেই এক যুগ ধরে এই প্ল্যাটফর্মে লেগে আছেন। তবে ডিজে মিরাজ ১০ বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পারফর্ম করছেন। তিনি নিজেই প্রশিক্ষণও দিচ্ছেন উঠতি অনেক ডিজেকে। আবার পারফর্মও করছেন মেলা দিন ধরে।

ডিজে পরী

ডিজেদের ডাক পড়ে মূলত বড় বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে। আইসিসি ওয়ার্ল্ড কাপ ইভেন্টের উদ্বোধনী কিংবা হাতিরঝিলে ডান্স অব ফাউন্টেন এর উদ্বোধনে, এমনকি কোনো বড় বড় ব্র্যান্ড শপ ও হোটেলের উদ্বোধনীতে। মূলত নিউইয়ার পার্টি, থার্টি ফার্স্ট নাইট, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক অনুষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের রি-ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জন্মদিন বিয়ে সবকিছুতেই ডিজে মানে বিশেষ আনন্দ। সে আনন্দকে আরো একধাপ এগিয়ে নিতে ডিজেদের সমাগম ঘটে এসব অনুষ্ঠানে। 

এদিকে, রাত গভীর হলে মূলত শুরু হয় ডিজেদের কাজ। দিনের বেলাতেও মাঝে মাঝে ডাক পড়ে তাদের। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের কাজ হয় রাতে। বাংলাদেশের ডিজে হিসেবে এখন রাতভর কাজ করছে মেয়েরাও। বিষয়টি কিভাবে দেখে সমাজ? এমন উত্তরে সুমি বলেন, ডিজেটা যেহেতু রাতের বেলার কাজ সেহেতু অনেকেই এই পেশাকে কটূক্তি করে। তারপরও আমরা এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি, তা না হলে এই রাস্তায় এগিয়ে যেতে পারব না। আমাদের স্বপ্নটাও পূরণ করতে পারব না।

ডিজে সনিকা ও সুমির মতো এই প্ল্যাটফর্মে নারীদের মধ্যে আরো কাজ করছেন, ডিজে মারিয়া, ডিজে ফারজানা, ডিজে পরী এবং আরো অনেক মেয়েই এখন রীতিমত স্টেজ মাতাচ্ছেন। তবে ডিজেদের সাজ-পোশাক নিয়ে অনেকসময় অনাকাঙ্খিত মন্তব্য এড়াতে সতর্ক থাকতে হয়। এই ব্যাপারে সুমি বলেন, বিয়ে ববাড়িতে বা জন্মদিনে যে পোশাক পড়ে যাওয়া যায় সে পোশাক কর্পোরেট কোনো অনুষ্ঠানে পড়া যায় না। ফলে বাড়তি সতর্কতা রাখতেই হয়। তবে এখনো এ পেশার প্রতি সামাজিক মনোভাব ইতিবাচক হয়ে উঠতে আরো সময় লাগবে বলে মনে করেন নারী ডিজেরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই