.ঢাকা, শনিবার   ২৩ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৯ ১৪২৫,   ১৬ রজব ১৪৪০

ডান থেকে শুরু, নবীজি’র (সা.) সুন্নত

নুসরাত জাহান

 প্রকাশিত: ১৮:৩৬ ১৪ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৮:৩৮ ১৪ জানুয়ারি ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

নবী (সা.) এর সুন্নতসমূহের ওপর আমলের নিয়ত করা লুটের মালের মত। অর্থাৎ একটি আমলের মাঝে যতোগুলো সুন্নতের নিয়ত করবে, ততোটি সুন্নতের সওয়াব পেয়ে যাবে। 

যেমন তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করা একটি সুন্নত। পাত্র থেকে মুখ সরিয়ে নেয়া আরেকটি সুন্নত। একই সঙ্গে এ দু’টি সুন্নতের নিয়ত করা কতো সহজ। সুন্নত সম্পর্কে ইলম যতোবেশি থাকবে, নিয়তের মাধ্যমে ততোবেশি সাওয়াব লাভ করতে পারবে।

ডান দিক থেকে বণ্টন শুরু করাও সুন্নত:

عن انس رضى الله ةه ان رسول الله صلى  الله عليه وسلم اتى بلبن قد شيب بماء ، وعن يمينه اعرابى ، وعن يساره ابو بكر رضى الله عنه فشري ، ثم اعطى الاعرابى وقال : الايمن فالايمن 

হাদীসটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আদবের কথা বলেছেন। আদবটি মুসলিম উম্মাহর নিদর্শনও বটে। অথচ আমাদের সমাজে এ বিষয়েও অবহেলা করা হয়। আদবটি এই হাদীসে বিবৃত হয়েছে একটি ঘটনার মাধ্যমে। 

‘এক ব্যক্তি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে পানি মিশ্রিত কিছু দুধ নিয়ে এল। এ মিশ্রণটা ছিল বিশেষ কোনো কারণে; দুধ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নয়। বরং আরবের মাঝে প্রসিদ্ধ ছিল, নির্ভেজাল দুধের চেয়ে পানি মিশ্রিত দুধের মধ্যে তুলনামূলক ভিটামিন অধিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত দুধ থেকে কয়েক ঢোক পান করে বাকিটুকু উপস্থিতদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন। সে সময় তাঁর ডান দিকে উপবিষ্ট ছিল এক গ্রাম্য আরব। আর বাম দিকে উপবিষ্ট ছিলেন হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশিষ্ট দুধটুকু প্রথমে হজরত আবু বকর (রা.)-কে  না দিয়ে ডান দিকে উপবিষ্ট গ্রাম্য লোকটিকে দিলেন এবং বললেন, যে ব্যক্তি ডান দিকে আছে, সর্বপ্রথম সেই পাওয়ার অধিক হকদার। তারপর বামের ব্যক্তি’। (তিরমিযী, হাদীস নং-১৭১৫, বুখারী, হাদীস নং- ২১৭১)

হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর মর্যাদা:

হজরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহ.) এর ভাষায় ‘সিদ্দীক’ বলা হয়, ওই ব্যক্তিকে যিনি নবীর প্রতিচ্ছবি হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়নার সামনে দাঁড়ালে তাঁর সত্তা যদি নবী হয়, তাহলে আয়নার দেদীপ্যমান প্রতিচ্ছবির নাম হল সিদ্দীক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলীফা বলতে যা বুঝায় সিদ্দীকের ব্যক্তি সত্তার মাঝে তা পুরো মাত্রায় ছিল বিদ্যমান। 
আম্বিয়ায়ে কেরামের নবুওয়াতের মর্যাদার পরিবর্তী স্থান যে ব্যক্তির তিনি হলেন হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। তাই হজরত ওমর (রা.) একবার সিদ্দীকে আকবর (রা.)-কে বলেছিলেন, গোটা জীবন যেসব আমল করেছি, সবগুলো আপনি নিয়ে নিন, তবে তার পরিবর্তে সেই এক রাতের সওয়াব আমাকে দান করুন, যে রাতে আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাওর গুহাতে কাটিয়েছিলেন। এত বড় মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্তেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুধের পেয়ালাটা প্রথমে আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-কে দেননি; বরং গ্রাম্য ব্যক্তিটিকে দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে এর কারণও বলে দিয়েছেন যে, ‘ডানের লোকের হক অধিক। ডানের পর আসবে বামের পালা।’ একটু ভাবুন, বণ্টনের ক্ষেত্রে ডানকে প্রাধান্য দেয়ার গুরুত্ব  কতোবেশি।

ডান দিক বরকতময়:

ডান দিককে আরবি ভাষায় يمين বলা হয়। যার অর্থ হলো, বরকতময়। সুতরাং ডান দিক থেকে শুরু করাটাও হবে বরকতময়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ডান হাতে খাও, ডান হাতে পান কর, ডান পায়ের জুতা প্রথমে পরিধান কর, চলার সময় ডান দিক থেকে চল। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান দিক থেকে চিরুনি চালাতেন, তারপর বাম দিক থেকে আঁচড়াতেন। তাঁর কাছে ডানের গুরুত্ব  এতবেশি ছিলো। সুতরাং খাবারের মজলিসে বণ্টন করবে ডান দিক থেকে। ডান মানে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতেই রয়েছে বরকত।

ডান দিকের গুরুত্ব:

অপর হাদীসে এসেছে, একবার রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে কোনো পানীয় আনা হলো, তিনি পান করলেন। কিছু পানি অবশিষ্ট রয়ে গেল। তাঁর ডান পাশে উপবিষ্ট ছিল এক তরুণ। আর বাম পাশে ছিল এমন কিছু লোক যারা বয়সে ও জ্ঞানের দিক থেকে বড়। তিনি ভাবলেন, নিয়ম মত ডান পাশের তরুণটি আগে পাওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু বাম পাশে যেহেতু বড়রা আছেন, তাদেরও মূল্যায়ন প্রয়োজন। তাই তিনি তরুণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যেহেতু তুমি ডানে আছ, তাই নিয়মের কথা হল অবশিষ্ট এ পানীয়টুকু তুমি পাবে কিন্তু তোমার বামে যেহেতু বড়রা আছেন, তাই তুমি অনুমতি দিলে এইটুকু পানীয় তাদেরকে দিয়ে দিতে পারি। তরুণটি ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমান। সে উত্তর দিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অন্য ক্ষেত্রে হলে অবশ্যই আমি তাঁদেরকে অগ্রাধিকার দিতাম। কিন্তু পানীয়টুকু কার মুখের সেটাও তো দেখতে হবে। আপনার পবিত্র মুখের পানীয় আমি অন্য কাউকে দেব না। আমার অধিকার যেহেতু, সেহেতু আমাকেই দিন। অবশেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তরুণকেই দিলেন। এ তরুণ ছিলেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)। (মুসলিম)

দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মের বিপরীত কাজ করেননি। অথচ আমরা লৌকিকতাবশত প্রতিনিয়ত নিয়ম পরিপন্থী কাজ করি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে