Alexa ডাক্তার পাহাড়ে এসে স্থায়ী হতে চায় না

ঢাকা, রোববার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

খাগড়াছড়ি সদর সরকারি হাসপাতাল

ডাক্তার পাহাড়ে এসে স্থায়ী হতে চায় না

শংকর চৌধুরী, খাগড়াছড়ি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১৭ ১৪ জুন ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪০ ১৪ জুন ২০১৯

পাহাড় বিমুখ চিকিৎসকরা, অপারেশন থিয়েটার, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ডেন্টাল চেয়ার এক্স-রেসহ প্রায় সব মেশিন অচল, ডিজিটাল যুগে এনালগ মেশিনে রোগ নির্নয় এযেন উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা সদরের একমাত্র সরকারি হাসপাতালে নাজুক স্বাস্থ্য সেবার কারণে বঞ্চিত হচ্ছে জেলার লাখো বাসিন্দা। এ জেলা ছাড়াও রাঙামাটির বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলার হাজারো বাসিন্দা এখানে চিকিৎসা নিতে আসে। কিন্তু হাসপাতাটিতে ১০০ শয্যা থাকলেও এখনো ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে কার্যক্রম চলছে। ফলে খাগড়াছড়ি সদর সরকারি হাসপাতালে বেশির ভাগ রোগীই চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত।

পুরো জেলাজুড়ে এই হাসপাতালেই আছে একটি মাত্র আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন। সেটি এখন নষ্ট। এ নষ্টের তালিকায় আছে একটি ডায়াথার্মি মেশিন, পেসান্ট মনিটর। একটি ডেন্টাল চেয়ার তাও নষ্ট হওয়ার কারণে পুরো ইউনিট অকেজো। কমপ্রেসার মেশিন নেই, ইলেক্ট্রিক স্টেরিলাইজার ১০টির চাহিদা থাকলেও রয়েছে ৪টি। এরমধ্যে ২টি নষ্ট আর ২টি মাঝেমধ্যে চলে। অপারেশন থিয়েটার গাইনি ও সাধারণ ২টি ওটির মধ্যে সাধারণটি নষ্ট গাইনিটিরও বেহাল দশা। ওটি লাইট ৪টির চাহিদা থাকলেও রয়েছে ২টি আর স্পট লাইট নেই।

ডাক্তার সুপর্ণা খীসা (ডেন্টাল সার্জন) বলেন, ডেন্টালের পুরো ওয়ার্ডে সমস্যা। প্রায় ৬-৮ লাখ টাকার ডেন্টাল চেয়ারটি নষ্ট। দাঁত ফিলিং স্ক্যানার করা যায় না, কমপ্রেসার মেশিন ও স্ক্যানার মেশিন না থাকার কারণে পুরো ইউনিটই অকেজো।   

এক্স-রে দায়িত্বে থাকা সৌরভ চাকমা বলেন, ১৬ লাখ টাকার নিউ ডায়না মেক্স ৫০০ এম.এ হাঙ্গেরি এক্স-রে মেশিনটি ১৯৮৬ সালের। মেরামত করে এতোদিন চালালেও ২০১৭ থেকে সেটি নষ্ট। ৩০০ এম.এ লিষ্টিম কোরিয়ান এক্স-রে মেশিন ২০০৩ থেকে অচল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণাালয়ে বার বার ধর্ণা দিয়ে অনেক লেখালেখির পর ২০১১ সালে ১০০ এম.এ পোর্টেবল এ্যালানজার্স ইন্ডিয়ান এক্স-রে মেশিন আনা হয়। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাশরুবা এন্টারপ্রাইজ এটিকে চালু করে দিতে পারেনি।

হাসপাতালের ভর্তি হওয়া বেশিরভাগ রোগীকে রেফার করা হয় ঢাকা বা চট্টগ্রামে। অনেক সময় সাধারণ রোগের জন্যও বাইরের হাসপাতালে রেফার করা হয়। দায়িত্ব এড়ানোর জন্যই এমনটি করা হয় বলে রোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। জরুরি রোগী ও হাসপাতালের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চট্টগ্রামে রেফার করিয়ে দেয়া হয়।

সার্জারী ও গাইনী বিভাগসহ সবকটি বিভাগে চিকিৎসকের সংকট আছে। মূলত চিকিৎসক সংকট আর রোগ নির্নয় মেশিন গুলো নষ্ট হওয়ার কারণে হাসপাতালের এই স্বাস্থ্য সেবার নাজুক পরিস্থিতি। বিদুৎ সংকট মোকাবেলায় অতীতে বিকল্প কোন ব্যবস্থা না থাকলেও বর্তমানে জেনারেটর এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ এর ব্যবস্থা করা হলেও তা অপর্যাপ্ত। সবকটি ওয়ার্ডে রোগীদের অপরিচ্ছন্ন বেড। এছাড়া হাসপাতালে রোগীদের গুনগত মান সম্পন্ন খাবার পরিবেশন করা হয় না। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী বলেন, দুপুর বা রাতের খাবার আমরা খেতে পারি না। শুধুমাত্র সকালের রুটি, কলা বা ডিম খায়। ভাত, সবজি, মাংসে এক ধরণে গন্ধ থাকায় খেতে পারি না।

হাসপাতালের সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয় মেডিসিন বিভাগে। মেডিসিন ওর্য়াডের দার্য়িত্বরত নার্স বলেন, এই বিভাগে বেশির ভাগ সময় বেড সংখ্যার দ্বিগুণ রোগী ভর্তি হয়। বেডে জায়গা না থাকার ফলে এখানে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগীকে ফ্লোরিং করতে হয়। রোগীদের সেবা দিতে দিতে অনেক সময় নিজেরাই অসুস্থ হয়ে যায়।

হাসপাতালে সার্জারি ওয়ার্ডে দুটি কক্ষ থাকলেও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে মাত্র একটি কক্ষে। কক্ষ থাকলেও বেড স্বল্পতার কারণে সার্জারি বিভাগে রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না। ফলে রোগীরা চট্টগ্রামমুখী হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন মাত্র নার্স দিয়ে কোন রকমে চলছে। বাড়তি রোগী ভর্তি হলে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় সামান্য কাটা ছেড়া, মাথা ফাটা রোগীকেও চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেয়। এছাড়া হাসপাতালে রোগীদের পর্যাপ্ত ওষুধের স্বল্পতাও আছে। যৎসামান্য ওষুধ হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হয়। বেশির ভাগই ওষুধ কিনে আনতে হয় বাইরে থেকে।

খাগড়াছড়ির সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) নয়ন ময় ত্রিপুরা বলেন, কাগজে কলমে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতাল ১০০ শয্যার। তবে ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে। ৪৩ জন ডাক্তারের মধ্যে আছেন ১২ জন। বেশির ভাগ ডাক্তার পাহাড়ে এসে স্থায়ী হতে চায় না। তার মধ্যে আবার কনসাল্টেন্টসহ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারা অনিয়মিত। যেমন হাসপাতোলের সহকারী পরিচালক (এডি) ডাক্তার মাহামুদুল হক ঢাকায় থাকেন ঢাকা থেকেই বেতন তোলেন। দু’তিন মাস পর মন চাইলে একবার আসেন। সিনিয়র কনসাল্টেন্ট (জেনারেল সার্জন) ডাক্তার আব্দুর রউফ, জুনিয়র কনসাল্টেন্ট (কাডিও লজিস্ট) সৈয়দ আলম কোরাইশি সপ্তাহে একদিন আসে আবার রাতে চলে যায়।

আবার অনেকে হার্টের সমস্যা নিয়ে আসে কিন্তু আইসিও, সিসিও না থাকার কারণে আমরাসহ পুরো জেলাবাসী ঝুকির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া আমরা মেডিকেল অফিসার ও নার্সরা মিলে সকাল, বিকেল, রাতে ২৪ ঘন্টা যে ভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। ডিজিটাল আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনের জন্য মন্ত্রনালয়ে একাধিকবার লেখালেখি করেও এখনো পাওয়া হয়নি। আর নষ্ট এক্স-রে মেশিনসহ অন্যান্য মেশিনারির ব্যাপারে উপরস্থ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।   

খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন ডা. মো. ইদ্রীস মিঞা বলেন, ১০০ বেড থাকলেও চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল আছে কেবল ৫০ বেডের। আর ৫০ জনের ওষুধসহ অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে বাড়তি রোগীদের চিকিসা দিতে হিমশিম খেতে হয়। তবে তরুণ ডাক্তাররা এখানে বদলি হয়ে আসার পর অনেক সময় পড়াশোনার জন্য এক থেকে দেড় বছরের জন্য আবার চলে যায়। এছাড়া পাহাড়ে কাজ করতে অনেক ডাক্তারের কিছুটা পাহাড় বিমুখতা কাজ করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম