ডাক্তাররা অফিস করেন ‘ফ্রি-স্টাইলে’

ঢাকা, বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

আখাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

ডাক্তাররা অফিস করেন ‘ফ্রি-স্টাইলে’

কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৮ ২২ মে ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ডাক্তারের দেখা মিললেও যেন রোগের কথা শোনার সময় নেই ডাক্তারের। ইচ্ছেমতো ব্যবস্থাপত্র লিখে তাড়াতে পারলেই যেন বেঁচে যান। রোগীর থেকে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ও বেসরকারি ক্লিনিকের দালালদের প্রতিই ডাক্তারদের বেশি আগ্রহ। হাসপাতালে ১৪ জন ডাক্তারের মধ্যে পদ রয়েছে ১১টি। ওই ১১’র মধ্যে আবার ৪টি পদ শূন্য। মার্তৃত্বকালীন ছুটি, ডেপুটিশন ও প্রশিক্ষণের জন্য বাইরে রয়েছেন ৩ জন ডাক্তার। শেষে যে চারজন বাকি থাকেন তারাও অফিস করেন ‘ফ্রি-স্টাইলে’। ফলে রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। 

সকাল ৯টা থেকে দুপুর পযর্ন্ত প্রতিদিন অন্তত দু’থেকে আড়াইশ' রোগী এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেটিতে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা আয়েশা খাতুন, কিবরিয়া, মাছুমসহ একাধিক রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ডাক্তারের দেখা মিললেও রোগের কথা তেমন একটা শোনেন না। ইচ্ছেমতো ব্যবস্থাপত্র লিখে তাড়াতে পারলেই যেন তারা বেঁচে যান। প্রতিদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ও বেসরকারি ক্লিনিকের দালালদের কমপ্লেক্সের ভিতরে ভিড় করতে দেখা যায়। 

অনেক সময় দেখা যায় রোগী দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে আর তারা চেয়ারে বসে থাকছেন। ফলে দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। 

তাছাড়া রোগীরা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে আসলে দাঁড়িয়ে থাকা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাদের নিয়ে টানাটানি ও ছবি তোলা শুরু করে। রোগী ও তাদের স্বজনদের অনুমতি ছাড়াই রোগীদের হাত থেকে ব্যবস্থাপত্র ছিনিয়ে নেয় তারা। এতে রোগী ও তাদের সঙ্গে আসা স্বজনরা পড়েন বিড়ম্বনায়। 

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালটি ৩১ শয্যা থেকে বর্তমানে ৫০ শয্যায় উন্নতি করা হয়েছে। পৌর শহরসহ উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও সদর উপজেলার বেশ কিছু এলাকার প্রায় ২ লাখ লোকের একমাত্র চিকিৎসার ভরসা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেটি। কিন্তু চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হওয়ায় আগত রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হয়ে তারা এখন জেলা সদর হাসপাতালে ভিড় করছেন। 

অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিকাংশ ডাক্তাররা নানা অজুহাতে বেশিরভাগ সময় ছুটিতে থাকছেন। তাছাড়া হাসপাতালে না এসে বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। 

দীর্ঘদিন ধরে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র এক্স-রে মেশিনটি বিকল হয়ে আছে। নেই ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি। বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর সুবিধা পাচ্ছেনা চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। এক প্রকার বাধ্য হয়ে তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা বাইরের ক্লিনিকে গিয়ে করতে হচ্ছে। 

চিকিৎসা নিতে আসা সদর উপজেলার বাবুদেব ইউনিয়নের মো. লোকমান হোসেন বলেন, সামান্য কিছুতেই ডাক্তাররা হাসপাতালে আসা রোগীদেরকে রক্ত, মল-মূত্রসহ অন্যান্য পরীক্ষা দিয়ে থাকেন। পরীক্ষা ছাড়া তারা ব্যবস্থাপত্র করছেন না। এক প্রকার নিরুপায় হয়ে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে ক্লিনিক থেকে ওইসব পরীক্ষা করতে হচ্ছে। 

পৌর শহরের দেবগ্রামের ব্যবসায়ী মো. আলী আজগর বলেন, স্ত্রীকে নিয়ে অনেক কষ্টে চিকিৎসকের কক্ষে যেয়ে দেখি সেখানে দুজন ওষুধ কোম্পানির লোক বসা। দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। কিন্ত কক্ষ থেকে বের হলে কয়েকজন এসে হঠাৎ ব্যবস্থাপত্র না বলে নিয়ে যার যার মতো ছবি তুলতে থাকে।
আসমা আক্তার নামে এক রোগী অভিযোগ করে বলেন, এই হাসপাতালে কোনো কিছুই পরীক্ষা করা যায়নি। বাহির থেকেই সব কিছু পরীক্ষা করতে হয়। 

চিকিৎসা নিতে আসা মোগড়া ইউনিয়নের শামসুল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আমার মেয়ে তানিয়া আক্তারকে ডাক্তার দেখাতে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে ডাক্তার দেখানো হয়। ডাক্তার এক্স-রেসহ দুটি পরীক্ষা দেন। কিন্তু এক্স-রে মেশিন নষ্ট থাকায় এখানে পরীক্ষা করা যায়নি। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা করে আনা হয়। তার প্রশ্ন তাহলে হাসপাতালে এইসব সেবা দেয়ার অর্থ কী?
হাসপাতালের রেডিওলজি এন্ড ইমেজিং বিভাগের ইনচার্জ গুগল চন্দ্র মন্ডল বলেন, অনেক দিন থেকেই এক্স-রে মিশিনটি বিকল হয়ে পড়ে আছে। তাই রোগীরা বাহির থেকে এক্স-রে করে চিকিৎসা নিচ্ছেন। 

আখাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রাশেদুর রহমান বলেন, এই স্বস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ বেডে উন্নতি হয়েছে। চিকিৎসক আবাসিক সংকট ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকটের কারনে স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতির জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। আশা করছি অচিরেই আমরা এসব কিছু পাব। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/এস