ডাইনি শিকারের নামে রেবেকাকে পুড়িয়ে মারা হয়! 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ১৮ ১৪২৭,   ১০ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

ডাইনি শিকারের নামে রেবেকাকে পুড়িয়ে মারা হয়! 

মেহেদী হাসান শান্ত ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:০৩ ১৩ জুন ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আজ থেকে ৪২৬ বছর আগের কথা। ১৫৯৩ সাল। জার্মান শহর নর্ডলিঙ্গেনে মারিয়া হল নামের এক পরিচারিকাকে ডাইনিবিদ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলো। এই ঘটনার পরই গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় মারিয়াকে। কিন্তু তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু এরপরও ছেড়ে দেয়া হয়নি মারিয়াকে। এক-দুইবার নয়, দফায় দফায় ৬২ বার টরচার সেলে নেয়া হয় তাকে। তবুও মারিয়া তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বীকার করেননি। অবশেষে শাসকগোষ্ঠী হাল ছেড়ে দিয়ে মুক্তি দেয় তাকে। 

মারিয়ার কয়েক বছর আগে রেবেকা লেম্প নামের আরেক নারীকে একই অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। তবে তার ভাগ্য মারিয়ার মতো প্রসন্ন হয়নি। জেল থেকে রেবেকা বেশ কিছু হৃদয়বিদারক চিঠি লেখেন তার স্বামীকে। সেসব চিঠিতে তার ওপর চালানো অসহনীয় নির্যাতনের কথা বর্ণনা করে রেবেকা লেখেন, অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে তিনি হয়তো এই ভ্রান্ত অভিযোগ স্বীকার করতে বাধ্য হবেন! যদিও মারিয়ার মতো রেবেকাও ছিলেন নিষ্পাপ। শেষমেশ অত্যাচারের কাছে পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন তিনি। স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন ডাইনিবিদ্যা চর্চার অভিযোগ। ফলাফল হিসেবে পরিবারের চোখের সামনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় রেবেকাকে।

পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে অষ্টাদশ শতকের শুরু পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ও আমেরিকান কলোনিগুলোতে এভাবে নির্বিচারে ডাইনি শিকার চলে। রেবেকা ও মারিয়ার মতো অসহায় নারীরা ছিলেন সেই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের হতভাগিনী। এই নির্লজ্জ অভিযানের পেছনে কোনো একক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ছিলনা, বরং তখনকার ইউরোপ ও আমেরিকায় এটা এক ধরণের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইংরেজি ‘উইচ’ শব্দটি নানান রকম অর্থ ধারণ করে। তবে মধ্যযুগের সেই ডাইনি শিকারের সময় ‘ডাইনি’ বা ‘উইচ’ শব্দটি দিয়ে বোঝানো হতো এমন কোনো নারীকে যে ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে শয়তানের উপাসনা করে অতিমানবীয় সব ক্ষমতা অর্জন করেছে! 
পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন গির্জা থেকে ডাইনিবিদ্যার এমন সংজ্ঞা বিশ্বের অনেক অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৪৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তখনকার পোপ তার এক অনুসারী হাইনরিখ ক্রেমারকে ডাইনি অনুসন্ধানের অনুমতি দিলে ডাইনি শিকারের ব্যাপারটি তখনকার পশ্চিমা সমাজে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। হাইনরিখ ছিলেন তখনকার ইউরোপের একজন স্বীকৃত ব্রহ্মবিদ্যার অধ্যাপক। পোপের অনুমতি পেয়ে হাইনরিখ চলে যান ইন্সব্রাক শহরে, তার প্রথম ডাইনি শিকারের উদ্দেশ্যে। তবে সেই শহরের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাকে এ কাজে সমর্থন করেনি। বরং সম্মানিত নাগরিকদের বিব্রতকর জিজ্ঞাসাবাদ করায় হাইনরিখের ডাইনি পরীক্ষা বন্ধ করে দেয় তারা। 

প্রথম চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হাল ছাড়েনি হাইনরিখ। ‘ডাইনির হাতুড়ি’ (ম্যলিয়াস ম্যালেফিক্যারাম) নামে একটি বই লিখে ফেলল সে। বইটিতে ডাইনিদের অস্তিত্ব বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করে হাইনরিখ, সেই সাথে তাদেরকে শিকার করার ও মৃত্যুদণ্ড দেয়ার নির্দয় সব কৌশল বাতলে দেয়। হাইনরিখ যুক্তি দেয়, নারীদের কবজা করা শয়তানের জন্য অনেক সহজ, যদিও পুরুষরাও ডাইনি হতে পারে। হাইনরিখের বই আরো অনেককে ডাইনিদের ওপরে নিজেদের মনগড়া বই লিখতে অনুপ্রেরণা জোগায়। এর ফলে আস্তে আস্তে ডাইনিবিদ্যাকে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ এক পর্যায়ে নিয়ে যায় চক্রান্তকারীরা। 

ওইসব বই অনুযায়ী, ডাইনিরা শয়তানের পায়ুপথে চুমু খেয়ে ও শয়তান যেসব মানুষকে অপছন্দ করে তাদের বিষ খাইয়ে ডাইনিবিদ্যার চর্চা করত। তবে এইসব তথ্য ছিল ভিত্তিহীন, এগুলোর পেছনে কোনো প্রমাণ ছিলনা। তবুও ডাইনিদের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষ খুব দ্রুত বিশ্বাস করা শুরু করল। দুর্ভাগ্যের সাথে ডাইনি শিকার ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো মৌসুমে ফসল ভালো না হলে অথবা গৃহপালিত গরু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা কারও গর্ভে মৃত সন্তান জন্ম নিলে সমাজের লোকেরা একে অন্যকে ডাইনি বলে অভিযুক্ত করত। এই অভিযুক্তদের অধিকাংশই হতেন সমাজের পিছিয়ে পড়া লোকজন। দরিদ্র, বৃদ্ধ, সামাজিক পদমর্যাদাহীন কিংবা দুর্বল মানুষদেরই সাধারণত ডাইনি বলে অপবাদ দেয়া হত। তবে সমাজের যে কাউকেই ডাইনি বলে অপবাদ দেয়া যেত। এমনকি কখনো কখনো শিশুরাও রেহাই পেত না এই অপবাদ থেকে।  

সমাজের ধর্মীয় হর্তাকর্তারা এসব ডাইনি শিকারে প্রণোদনা দিত। কিন্তু সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক কাজ করত স্থানীয় তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন। তারাই ডাইনিদের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা করত। ডাইনিদের ধরে নিয়ে গিয়ে শুরুতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। পরে শুরু হতো অমানবিক নির্যাতন। ডাইনি অভিযোগে আটককৃত নারীদের দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হত। নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একসময় অভিযুক্তরা স্বীকার করে নিত তাদের বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগ। এর ফলে চক্রান্তকারীরাও সুযোগ পেয়ে যেত পরবর্তী ডাইনি শিকারের। 

এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন মহাদেশে ডাইনি শিকারের নামে চলে এমন অন্যায়-অনাচার। একেক দেশে ডাইনিদের একেক ধরণের শাস্তি দেয়া হতো। এসব শাস্তির মাত্রা কখনো ক্ষুদ্র পরিমাণ জরিমানা থেকে শুরু করে কখনো কখনো জীবন্ত মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতো। শুরুতে বর্ণিত মারিয়া ও রেবেকার বিচার চলেছিল দীর্ঘ নয় বছর যাবত। তবে অধিকাংশের ক্ষেত্রেই মাত্র কয়েক মাসেই সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়ে দেয়া হতো। ডাইনি শিকারিদের লক্ষ্যও একেক সময়ে একেক রকম থাকত। অপরকে বলির পাঁঠা বানানো সবার লক্ষ্য ছিলনা, অনেক ডাইনি শিকারিই ডাইনিতত্ত্বে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করত। তারা ভাবত, সমাজ থেকে শয়তানের উপাসকদের তাড়িয়ে তারা সমাজের উপকার করছেন! 

মধ্যযুগের সেই ঘৃণিত ডাইনি শিকারের ঘটনা থেকে একটা বড় বিষয় শিক্ষা নেয়া যায়। সমাজের উঁচু স্থানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতারা তাদের প্রতিপক্ষকে দমানোর জন্য কিংবা পছন্দের নারীদের সুকৌশলে ধর্ষণ করতে কিংবা শত্রুদের শাস্তি দিতে ডাইনি শিকারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত। আর অন্ধ জনগণ কোনো বাছ-বিচার ছাড়াই তাদের কথা মেনে নিত, কোনো প্রশ্ন তুলত না। এভাবেই যুগে যুগে নিজেদের সামাজিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে শাসকদের দল শোষণ করে গিয়েছে সাধারণ মানুষদের।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস