ঠেকানো যাচ্ছে না ঝুট রফতানি

ঢাকা, সোমবার   ০৬ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৩ ১৪২৬,   ১২ শা'বান ১৪৪১

Akash

ঠেকানো যাচ্ছে না ঝুট রফতানি

মীর সাখাওয়াত হোসেন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:০২ ১৪ মার্চ ২০২০  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ছোট্ট একটা খুপড়ি ঘরে বসে বড় বস্তায় থাকা বিভিন্ন রঙের কাটা কাপড়ের টুকরো আলাদা করছিলেন ময়না বেগম। রঙ অনুযায়ী বাছাই করা টুকরোগুলো রাখছিলেন আলাদা আলাদা ব্যাগে। মিরপুর ১১ নম্বরের ঝুটপল্লীর এমন শতাধিক খুপড়ি ঘরের প্রতিদিনের চিত্র এটি।

ময়না বেগম বলছিলেন, এ কাজ করে মাসে পাঁচ হাজার টাকা আয় হয় তার। দোকানের মালিক দিপু মুন্সি বলেন, প্রতিদিনই এমন ১০ থেকে ২০ বস্তা ঝুট কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে কেনেন তিনি।

তারপর সেগুলো বাছাই করে সবচেয়ে নিম্নমানের ঝুটগুলো পাঠিয়ে দেয়া হয় লেপ তোষকের দোকানে। দাম পান কেজি প্রতি ৩ থেকে ৪ টাকা। বাছাই করা ভাল মানের ঝুট বড় ব্যবসায়ীদের কাছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। তারা সেগুলো বিদেশে রফতানি করেন। তবে তৈরি পোশাক কারখানার এই ঝুট রফতানি নিয়ে চরম আপত্তি আছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন-বিটিএমএ, বাংলাদেশ টেরিটাওয়েল ও লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশন-বিটিটিএমএলইএ-এর নেতারা বলছেন, এইসব ঝুট ব্যবহার করে মোটা সুতা তৈরি করা হয়। যে সূতা দিয়ে তৈরি করা হয় টাওয়েল, হোমটেক্সটাইল, মোজা বা ডেনিমের মতো পণ্য।

বিটিএমএ এবং বিটিটিএলএমইএ’র দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কটন ওয়েস্ট ও গার্মেন্টস ওয়েস্ট বা নন কটন থেকে সুতা তৈরির জন্য ১৭৬টি স্পিনিং মিল রয়েছে। যাদের তৈরি বিভিন্ন মানের সুতা ৩২টি ডেনিম ফেব্রিক, ২২টি হোম টেক্সটাইল এবং শতাধিক টেরিটাওয়েল কারখানার প্রধান কাঁচামাল।

এসব কারখানায় বছরে ২ লাখ ৩৪ হাজার টন কটন ওয়েস্ট ও গার্মেন্টস ওয়েস্টের চাহিদা আছে। কিন্তু দেশে সব ধরনের ওয়েস্ট মিলিয়ে বছরে উৎপাদন হচ্ছে ২ লাখ ১৫ হাজার টন। ফলে ওয়েস্টেজের (ঝুট) সঙ্গে বেশি পরিমাণে ফ্রেশ কটন ব্যবহারের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।

দীর্ঘদিন ধরেই এসব কাঁচামাল রফতানি ঠেকানোর দাবি জানিয়ে আসছে কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন। তাদের দাবির মুখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে ওয়েস্টেজ কটনের ন্যূনতম রফতানি মূল্য কেজি প্রতি সাড়ে চার মার্কিন ডলার ঠিক করে দেয়।

পরের বছর সর্টেড গার্মেন্টস ওয়েস্ট কেজি প্রতি দশমিক ৬ ডলার এবং ননসরটেড গার্মেন্টস ওয়েস্টের ন্যূনতম রফতানি মূল্য কেজি প্রতি দশমিক ২৩ ডলার নির্ধারণ করে সরকার। তবে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এরপরও এসব ওয়েস্টেজ রফতানি বেড়েছে।

কটন ওয়েস্টেজের রফতানি ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৫৯৬ শতাংশ, একই সময়ের ব্যবধানে সরটেড গার্মেন্টস ওয়েস্টি ও ননসরটেড গার্মেন্টস ওয়েস্টের রফতানি বেড়েছে যথাক্রমে ২৭০ শতাংশ এবং ১৩১ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রথম পাঁচ মাসের রফতানি চিত্রও ঊর্ধমুখী। কটন ওয়েস্টেজ, সরটেড গার্মেন্ট ওয়েস্টেজ ও ননসরটেড গার্মেন্ট ওয়েস্টেজের রফতানি চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বরে আগের অর্থবছরের ঠিক একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে যথাক্রমে ২৭৭, ১২৩ এবং ১১১ শতাংশ।

মূল্য বেঁধে দেয়ার পরও রফতানি কমার বদলে কেন বাড়লো, জানতে চাইলে মিরপুর ঝুটপল্লীর রফতানিকারকরা জানান, কটন ওয়েস্টেজের অনেকগুলো ধরণ আছে। আর গার্মেন্টস ওয়েস্ট আছে কয়েকশ’ ধরনের। এগুলোর এইচ এস কোড একই, কিন্তু দামে ভিন্নতা রয়েছে। সব একসঙ্গে মিশিয়ে রফতানি করে গড় মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ফলে রফতানি করতে কোনো অসুবিধা হয় না।

এই ঝুটপল্লীর ক্যাপিটাল সাপ্লাইয়ের স্বত্তাধিকারী মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহ করলে দাম ভাল পাওয়া যায় না, টাকাও বাকি পড়ে থাকে দীর্ঘদিন। কিন্তু রফতানি করতে পারলে ভাল দামের পাশাপাশি টাকাও পাওয়া যায় অগ্রিম।

এজন্য বিটিএমএ ২০১৭ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশনে আবেদন করে, যাতে কটন ওয়েস্টেজকে ইয়ার্ন ওয়েস্ট ও থ্রেড ওয়েস্ট উল্লেখ করে রফতানির নামে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই মূল্যবান এই কাঁচামালের পাচার ঠেকাতে কটন ওয়েস্ট ও গার্মেন্টস ওয়েস্টের মতো ইয়ার্ন ওয়েস্ট ও থ্রেড ওয়েস্টেরও নূন্যতম রফতানি মূল্য বেঁধে দেয়ার আবেদন জানানো হয়।

গার্মেন্টস ওয়েস্টেজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কারসাজির অভিযোগ তুলেছে বিটিটিএমএলইএ। সংগঠনটির সভাপতি মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, কটনক্লিপ, ওয়েস্ট কটনক্লিপ, কটনওয়েস্ট হোয়াইট ক্লিপ ইত্যাদি নামে এসব কাঁচামাল রফতানির নামে পাচার হচ্ছে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমরা কটন ওয়েস্ট ও গার্মেন্টস ওয়েস্ট রফতানি সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছি। এখানে ডব্লিউটিওর দোহাই দিয়ে দেশের কোনো লাভ নেই, যোগ করেন তিনি।

কিন্তু ভিন্ন মত এসব বর্জ্য রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড গার্মেন্টস ওয়েস্ট প্রসেসরস ও এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের। দেশে ব্যবহৃত কোনো বর্জ্য বা ঝুট রফতানি বা পাচার করছেন না বলেও জানান তারা।

“দেশে কটন ওয়েস্ট ও গার্মেন্টস ওয়েস্টের যদি এতই চাহিদা থাকে তবে আমাদের ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিনাশুল্কে আমদানির সুযোগ দেয়া হোক,” বলছিলেন সংগঠটির সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। আমাদের শিল্পে বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে যতো ধরনের ওয়েস্ট হয় তার অনেকগুলোরই দেশে কোনো ব্যবহার নেই। এগুলো রফতানি করতে না দিলে সার্বিকভাবে সবারই উল্টো ক্ষতি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এজন্য ২০১৭ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ওয়েস্ট রফতানির নূন্যতম মূল্য প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছিল এ ব্যবসায়ী সংগঠন। তবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠকের পর, দেশে বর্তমানে কোনো ধরনের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ওয়েস্টের কেমন চাহিদা আছে তা নতুন করে যাচাই করে রফতানি মূল্য পুনঃনির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছে মন্ত্রণালয়ের বস্ত্র সেল।

২০১৬ সালে এস্তোনিয়া ভিত্তিক সফটওয়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রিভার রিসোর্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস ওয়েস্ট সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে বছরে চার বিলিয়ন ডলার বাড়তি মূল্য সংযোজন সম্ভব। পাশাপাশি সর্টেড গার্মেন্টস ওয়েস্ট থেকে সুতা তৈরির পর নতুন করে রঙ করার কোনো প্রয়োজন হয় না। ফলে এ ক্ষেত্রে পানির অপচয় হয় না, যেখানে পোশাক শিল্পের পানি দূষণ বিশ্ব জুড়েই উদ্বেগের বিষয়।

এ বিষয়ে ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান তপন কান্তি ঘোষ বলেন, অনেক ওয়েস্টই আছে যেগুলোকে আলাদা করে চিহ্নিত করা একটু কঠিন কাজ। যেগুলোর দেশে ব্যবহার আছে, আর যেগুলোর ব্যবহার নেই সেগুলোকে প্রতিটি কন্টেইনার খুলে বাছাই করা কস্টমস কর্মকর্তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। আবার রফতানি সম্পূর্ণ বন্ধ করাও সঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান আরো বলেন, সরকার সব সময়ই চায়, দেশে যাতে অধিক মূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদিত হয়, দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটে।

পাশাপাশি এগুলো (ঝুট) প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা আমাদের কতটুকু আছে, দেশে আসলে আমরা কতটা প্রক্রিয়াজাত করতে পারবো সেটি ভালোভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলেও যোগ করেন তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএস/এস