Alexa ট্রেনের তেল চুরি যেন ওপেন সিক্রেট!

ঢাকা, শনিবার   ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৩০ ১৪২৬,   ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১

ট্রেনের তেল চুরি যেন ওপেন সিক্রেট!

মো: ইদ্রিস আলম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৩৬ ১৬ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৯:১৯ ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

স্টেশনের আউটার কিংবা হোম সিগন্যালে ট্রেন আসামাত্রই তেল চুরি শুরু করেন চক্রের সদস্যরা। দেশের ৫০-৬০টি স্থানে প্রতিদিনই এভাবে ট্রেনের তেল চুরি হচ্ছে। যা এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দিনের পর দিন এ ঘটনা ঘটলেও তেমন কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তেল চোর সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন সাধারণ মানুষ।

জানা যায়, ট্রেনের চালক ও সহকারি চালকের যোগসাজশে ইঞ্জিনে পাইপ লাগিয়ে ড্রামে বা প্লাস্টিকের বস্তার মধ্য পলিথিনে করে তেল চুরি করা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-খুলনাসহ বেশ কয়েকটি রেলপথের বিভিন্ন পয়েন্টে বছরের পর বছর ধরে ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে তেল চুরি করা হচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ে লোকসান থেকে বের হতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।

রেলের নথিপত্র থেকে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়ে রেলের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। নির্দিষ্ট সংখ্যক বগি নিয়ে একটি ট্রেন চললে কী পরিমাণ তেল খরচ হয়, সেটার একটা হিসাব ধরে যুগের পর যুগ চলছে। মৌখিক এ হিসাবকে পুঁজি করে চোর চক্রের সঙ্গে দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে চুরি হচ্ছে তেল। আর মূলত চুরির কারণেই তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই রেলের।

ট্রেনের তেল চুরি করে পাচারের সময় আটক যুবক

এদিকে রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত এক দশকে জ্বালানি তেলের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি কমেছেও। সব মিলিয়ে একটা স্থিতিবস্থা বজায় ছিল। এর পরেও রেলের জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তেল চুরি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানান, পার্বতীপুর রেলওয়ের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা, বড় জংশন, বিভিন্ন ইঞ্জিন রাখার স্থানসহ ৫০ থেকে ৬০টি স্থানে তেল চুরির ঘটনা বেশি হয়। আর মালবাহী ট্রেনগুলো দীর্ঘ সময় বিভিন্ন স্টেশনে থামিয়ে রাখার কারণে সেখানে তেল চুরির ঘটনা বেশি ঘটে। অনেক সময় ডিপো থেকে তেল ইঞ্জিনে ভরার সময়ও চুরি করা হয়।

সরেজমিনে কমলাপুর স্টেশনের সামনে শাহজাহানপুর ওভারব্রিজের কাছেই গিয়ে দেখা যায়, ট্রেন পরিষ্কার বা মেরামতের করা হচ্ছে। সেখানে কাজের ফাঁকে চুরি করা হয় তেলসহ ট্রেনের যন্ত্রাংশ। ঢাকার বাইরে থেকে ট্রেনটি কমলাপুর স্টেশনে আসার পর পরিষ্কার বা যন্ত্রাংশ চেক করার জন্য পাঠানো হয় সেখানে। এই সুযোগকে কাজে লাগায় কিছু অসাধু কর্মকর্তা- কর্মচারী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেখানে কর্মরত একজন বলেন, প্রতিদিনই এখানে কোনো না কোনোভাবে ট্রেনের ক্ষতি সাধন হচ্ছে। তেল চুরি তো সাধারণ ঘটনা। চুরি করা হয় যন্ত্রাংশও।

সরেজমিনে সান্তাহার লোকোসেড গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন কর্মচারী একটি বালতিতে করে ট্রেন থেকে তেল নামিয়ে আনেন তাদের অফিসের বারান্দায়। তেল কী করা হবে বা কোথায় বিক্রি করা হবে তা নিয়ে কথা বলেন নিজেদের মধ্যে। এসব তেল কেনার নিজস্ব লোকও রয়েছে।

সান্তাহার রেলওয়েতে কর্মরত কয়েকজন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘ট্রেন থেকে তেল চুরির ঘটনা তো ওপেন সিক্রেট!’

এতো বড় ঘটনা কেন ওপেন সিক্রেট জানতে চাইলে তারা বলেন, ভাই এই সান্তাহারে রেলের সম্পদের অভাব নেই। এখানকার একটা সিন্ডিকেট রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে পারলে পুরো ট্রেনটাই বিক্রি করে দেয়।’

যেসব স্থান থেকে তেল চুরি করা হয়:-
আব্দুলপুর রেল জংশন: এখানে সান্তাহার দিনাজপুর, সৈয়দপুরগামী রাজশাহীর ট্রেনগুলো ইঞ্জিন পরিবর্তন করে রাজশাহীর দিকে রওনা হয়। এই সময় আব্দুলপুর রেল স্টেশনের সামনের দিকে ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। এই সুযোগে তেল চোরচক্রের সদস্যরা চালকদের যোগসাজশে ইঞ্জিন থেকে তেল নামিয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে করে পাচার করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্টেশনের পাশেই একটি বাড়িতে চোরাই তেল মজুদ রাখা হয়। সেখান থেকেই পরে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করা হয়।

আব্দুলপুর জংশনে নিরাপত্তা ইনচার্জ আব্দুল হান্নান বলেন, আমি এখানে দায়িত্বে আসার পর থেকে তেল চুরির কোনো ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া কোনো অভিযোগও পাইনি। আর অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: এই রুটে চলাচলকারী প্রায় সব ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে প্রকাশ্যে তেল চুরির ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় প্রভাবশালী চোরচক্রের সদস্যরা ট্রেন চালকদের সহায়তায় আমনুরা জংশন ও আমনুরা বাইপাস রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন রেলের শত শত লিটার তেল চুরি করে।

অভিযোগ রয়েছে, শুধু আমনুরা পয়েন্টেই প্রতিবছর রেলের কোটি টাকার তেল চুরি হচ্ছে। এই তেল চুরির সঙ্গে ট্রেনের চালক, নিরাপত্তাকর্মীসহ রেল বিভাগের অনেকই জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে।  

ট্রেনের তেল চুরি করে পাচার করা হচ্ছে

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আমনুরা জংশন, আমনুরা বাইপাস রেলস্টেশন, আব্দুলপুর, নাটোর, জয়পুরহাট, পাঁচবিবি, হিলি, পাবর্তীপুর, সৈয়দপুর, সান্তাহার, শাহগোল্লা, আত্রাই, ঈশ্বরদী, পাকশীসহ প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি স্থানে চুরি হচ্ছে তেল।

আরো জানা যায়, রেলস্টেশনে ঢোকার এক কিলোমিটার আগেই কমিয়ে দেয়া হয় ট্রেনের গতি। এরপর চলন্ত ট্রেন থেকে তেল ভর্তি ড্রাম বা বস্তা ফেলে দেয়া হয়। চোর চক্রের সদস্যরা সঙ্গে সঙ্গে ওই সব ড্রাম ও প্লাস্টিকের বস্তা মোটরচালিত ভ্যান ও ভটভটিতে করে পাচার করেন। প্রতি ড্রামে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল থাকে।

আমনুরা বাইপাস রেল স্টেশনের কয়েকজন দোকানি তেল চুরির কৌশল সম্পর্কে বলেন, এখানে তেল চোরের কয়েকটা গ্রুপ রয়েছে। তারা নিজেরা ভাগাভাগি করে চুরি করে ট্রেনের তেল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টেশনে কর্মরত একজন বলেন, ‘আমনুরার মালেক, বাবু, আজিজুল, হারুন, ফারুকসহ প্রায় ২৫ জন এই তেল চুরি করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলা যায় না। চোখের সামনে রাষ্ট্রের এতো বড় ক্ষতি চুপ করে দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাদের হাত অনেক বড়। চাকরি করতে হবে বলে চুপ করে সব সহ্য করে যাই।’

তিনি আরো বলেন, মালেক, বাবু ও হারুন তিনটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন। আবার তাদের নেতা হলো সোহেল নামের এক ব্যক্তি।

তেল চোর চক্রের সদস্যরা বলেন, আমরা মজুরি হিসেবে তেল চুরির কাজ করি। একজন ভ্যানচালক বলেন, তেল চুরির ভাড়া মারলে টাকা একটু বেশি পাই, তাই এই কাজ করে থাকি। এ কারণে জেলও খেটেছি। তারপর থেকেই পুরোদমে এ কাজ করি।

ভ্যানচালক আরো বলেন, রেলের কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনী, জিআরপি পুলিশ, পুলিশ ফাঁড়িসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ম্যানেজ করে তেল চুরি করা হয়।

প্রকাশ্যে এসব তেল চুরির ঘটনা ঘটলেও এ ব্যাপারে নীরব থাকছেন জিআরপি পুলিশ ও স্টেশন কর্মকর্তারা।  

তেল চুরির বিষয়ে রেলের পাকশী বিভাগীয় ম্যানেজার (পাবনা) অসীম কুমার তালুকদার বলেন, আমরা এসবের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছি। তেল চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দেয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আগের থেকে তেল চুরি কমে এসেছে, আগামীতে যেন একবারেই কমে যায় সেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

 

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/এস