Alexa টিপু সুলতানের বাঘ!

ঢাকা, শনিবার   ১৮ জানুয়ারি ২০২০,   মাঘ ৪ ১৪২৬,   ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

টিপু সুলতানের বাঘ!

সালমান আহসান নাঈম

 প্রকাশিত: ১০:৫৭ ১০ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১০:৫৭ ১০ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ইংরেজ আগ্রাসন থেকে উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মহীশূরের টিপু সুলতানের (১৭৫০-১৭৯৯) অবদান অবিস্মরণীয়। উপমহাদেশের আর কেউই তার মত ভূমিকা পালন করতে পারেননি। আজাদি রক্ষায় উপমহাদেশের প্রথম শাসক হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদত বরণ করেছিলেন তিনি। তার সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তিটি হচ্ছে 'শেয়ালের মতো কয়েকশো বছর বেঁচে থাকার চেয়ে বাঘের মতো একদিন বাঁচা অনেক ভালো।'  তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন ইংরেজরা এক মিনিটের জন্যও স্বস্তিতে ছিল না। তার বাবা হায়দার আলী রাজ্যটির গোড়াপত্তন করেছিলেন। ইংরেজরা তখনই আনাগোনা শুরু করেছিল। তিনি ইংরেজ বিতাড়নের কর্মসূচী শুরু করেছিলেন। টিপু সুলতানের আমলে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। বর্তমানে ভারতের এই রাজ্যটির নাম মহীশূর নয়, নাম বদলে রাখা হয়েছে কর্ণাটক। অবশ্য সীমানাও পরিবর্তীত হয়েছে।

কানাড়ি বা কন্নড় ভাষায় টিপু মানে বনের রাজা বা বাঘ। তাই বলা যায় টিপু সুলতান (ব্যাঘ্র সম্রাট) ছিলেন সার্থকনামা। বনের এই ভয়ংকর সুন্দর প্রাণীটি ছিল টিপুর কাছে এক অন্তহীন প্রেরণার উৎস। তার জীবন কাহিনী কিংবা তার বাঘ প্রেমের কাহিনী শুনলে বুঝা যাবে, বাঘ তার জীবনে কীভাবে বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছিল। এক কাহিনীতে বলা হয়ে থাকে, যৌবনে মহীশূরের জঙ্গলে তিনি শুধু ছোরা দিয়ে একটি বাঘকে হত্যার পর থেকে তাকে 'মহীশুরের বাঘ'(শের-ই-মহীশূর) নামে ডাকা হতে থাকে। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাঘের গল্প শুনতে ভীষণ ভালোবাসতেন। সুলতান হওয়ার পর তিনি মহীশূরের জাতীয় পতাকায় কানাড়ি ভাষায় লিখে দেন 'বাঘই শ্রেষ্ঠ'। তার সমস্ত পোশাক এমনকি রুমাল পর্যন্ত ছিল হলুদের ওপর কালো ডোরাকাটা। নিজের তরবারির হাতল, বন্দুকের নল, কুঁদো, হ্যামার প্রভৃতি জায়গায় খোদিত ছিল বাঘের রকমারি মূর্তি।

ভ্রমণের সময় তিনি বিশেষ জামা ব্যবহার করতেন। সোনালি কাপড়ের সেই জামাতে থাকতো বাঘের গায়ের ডোরার সূচিকর্ম। তাছাড়া তার সৈনিকদের উর্দিতে বা হাতিয়ারের গায়েও থাকতো বাঘের ছবি। তার আমলে মহীশুরে বাঘ শিকার ছিলেন নিষিদ্ধ। যৌবনকাল থেকেই বাঘ পুষতে শুরু করেছিলেন তিনি। তার ঘরের সামনে শেঁকল দিয়ে বাঁধা থাকতো কয়েকটি ভয়ংকর বাঘ। তবে কেউ কেউ মনে করেন প্রজা সাধারণের মনে  রাজশক্তির প্রতি ভয় ও সমীহ সৃষ্টির জন্যই ব্যাঘ্র প্রতীকের ব্যবহার বেছে নেয়া হয়েছিল। তবে সকলেই একমত যে শাসক হিসেবে টিপু সুলতান নিজের সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। প্রজাবৎসল, বিজ্ঞানমনস্ক এই লোকটি যুদ্ধবিদ্যায়ও ছিলেন পারদর্শী। ছিলেন বহু ভাষায় দক্ষ।দেশ বিদেশের খবর রাখতেন নিয়মিত। তার গ্রন্থাগারটি ছিল বিশাল। সেখানে তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটাতেন। কেউ কেউ মনে করেন ফরাসি বিপ্লব তার মনেও দোলা দিয়েছিল!

মহীশুরের উন্নয়নে টিপু সুলতানের অবদান অপরিসীম। তার উদ্ভাবনী চিন্তার ফলে পুরো মহীশূরে সেচব্যবস্থা চালু হয়। ফলে পতিত জমিগুলো ফসলে ভরে ওঠে। নতুন নতুন উদ্ভিদ নিয়ে পরীক্ষা চালাতে তার আগ্রহ ছিল অবাক করা। এমনকি ইংরেজ আগ্রাসনের মুখে তার যে প্রতিনিধিদলটি সুদূর ফ্রান্সের সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের দরবারে গিয়েছি, তারা রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন কামনার পাশাপাশি ফ্রান্সের কিছু ফুলের বীজ এবং কিছু ভালো জাতের গাছের চারা দেয়ার অনুরোধ করেন। তিনি একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি দেখতে পেয়েছিলেন নৌশক্তির বলেই ইউরোপিয়ানরা এত শক্তিশালী। অথচ উপমহাদেশের শাসকেরা এই শক্তির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেননি। এমনকি দোর্দণ্ড প্রতাপের সময়ও মোগলরা পর্তুগিজসহ অন্য ইউরোপিয়ান শক্তির অনুমতি নিয়ে হজে যেতেন। তাদেরকে এজন্য অর্থও দিতে হতো। মোগলরাও নৌশক্তি শক্তি অর্জনের চেষ্টা করেননি। টিপু সুলতান নৌ-বাহিনী গড়ার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি।

যা-ই হোক, পিতা হায়দার আলীর মৃত্যুর পর তিনি নতুনভাবে তৈরি হতে থাকেন। রাজ্যের অন্যান্য সংস্কারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সামগ্রীতেও পরিবর্তন আনেন। পুরানো সিংহাসনটি বদলে তৈরি করেন এক আশ্চর্য 'ব্যাঘ্রাসন'। আটকোনা আকারের ৮ ফুট চওড়া ও ৮ ফুট উঁচু চন্দ্রাতপ দেয়া কাঠের ফ্রেমের ওপরে সোনার পাত দিয়ে মোড়া আসনটির মাঝখানে ছিল সোজা হয়ে দন্ডায়মান একটি সম্পূর্ণ ব্যাঘ্রমূর্তি। এর ওপরই বসানো ছিল সিংহাসনটি। আর চারপাশে ঘেরা নিচু রেলিংয়ের মাথাতে ছিল সোনা দিয়ে তৈরি দশটি (কোনো কোনো বর্ণনায় আটটি) বাঘের মাথা। প্রতিটি মাথায় ছিল মনোরমভাবে বসানো মূল্যবান পাথর। আরো নানা সজ্জায় সজ্জিত ছিল সেটি।সে আমলেই নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ভারতীয় মুদ্রায় ১ হাজার ৬০০ গিনি। তবে তার বাঘ প্রীতির সবচেয়ে বড় নিদর্শন টিকে আছে একটি খেলনাতে।

দ্বিতীয় মহীশূর যুদ্ধে (১৭৮০-১৭৮১) ইংরেজ সেনাপতি হেক্টর মুনরোর সঙ্গে হায়দার আলী ও টিপু সুলতান মারাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এই ঘটনার স্মরণে তিনি ইংরেজ বন্দীদের বাঘের মুখে ফেলে শ্রীরঙ্গপত্তনম নগরের পথের দুই পাশে প্রচুর কার্টুন এঁকেছিলেন।এই মুনরোর একমাত্র ছেলে সুন্দরবনের সাগরদ্বীপে দু’জন সঙ্গী নিয়ে বাঘ শিকার করতে গিয়ে অঘোরে প্রাণ হারায়। সঙ্গীরা কোনোক্রমে পালিয়ে আসে। তাদের বিবরণ 'দ্য জেন্টেলম্যান্স' ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হলে দারুণ আলোড়নের সৃষ্টি হয়। খবরটি পেয়েই টিপু সুলতান তার ফরাসি কারিগর দিয়ে বানিয়েছিলেন চার ফুট লম্বা একটি বাঘের মূর্তি। এটিকে বিবেচনা করা হয় বিশ্বের সুপরিচিত বৃহত্তম যান্ত্রিক খেলনা। এতে দেখা যায় বাঘটি টুঁটি চেপে ধরেছে ফৌজি টুপি মাথায় নীল ব্রিচেস ও ফুট পরা, লাল কুর্তা গায়ে  ইংরেজ সেনাপতির।

বাঘের একপাশে লাগানো একটি হাত ঘোরালেই দেখা যেত যে সাহেবের বাঁ হাতটি উপরে উঠছে আর নামছে, যেন যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আর বাঘের পেটে লুকানো অর্গানটিও বাজতো- যা শুনলে মনে হতো বাঘটি চাপা গর্জন করছে এবং সাহেবটি আর্তনাদ করছে। এটি ছিল টিপু সুলতানের অত্যন্ত প্রিয় খেলনা। ১৭৯৯ সালে টিপু সুলতান ইংরেজবিরোধী যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তখন  ইংরেজরা মহীশূর জুড়ে লুটপাট চালায়। টিপুর গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ থেকে বাঘটি সংগ্রহ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা। গভর্নর জেনারেল লর্ড মর্নিংটন 'টাওয়ার অব লন্ডনে' প্রদর্শনের জন্য বাঘটিকে ব্রিটেনে পাঠিয়েছিলেন। ১৮০৮ সালে লন্ডনে প্রথম প্রদর্শিত হয় এটি। নানা স্থান ঘুরে এটি এখন ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট জাদুঘরে থিতু হয়েছে। শুরু থেকেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় খেলনাটি। ওই সময়ের বহু পর্যটক, কবি, নাট্যকার ও চিত্রশিল্পীর মনোযোগের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল এটি।

টিপু সুলতান ইচ্ছে করলে ইংরেজদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে ভারতের অন্য রাজা, নবাবদের মত আয়েশী জীবনযাপন করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি বরং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাঘের মতোই মহা পরাক্রমে লড়াই চালিয়ে গেছেন। বাঘের মতোই তিনি ছিলেন অনমনীয় ও আপোষহীন। শেষ যুদ্ধে তার পরাজয়ের পেছনে ছিল তার সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তার বিশ্বাসঘাতকতা। তা না হলে তিনি হয়তো আরো কিছুদিন ইংরেজদের ঠেকিয়ে রাখতে পারতেন। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করে জীবন বাঁচানোর সুযোগ গ্রহণ করেননি। তিনি বন্দিত্ব থেকে শাহাদাত বরণকেই শ্রেয় মনে করেছেন। সে সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৯ বছর।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস