টিনএজ সেনসেশন: টেইলর সুইফট

ঢাকা, শুক্রবার   ২১ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৭ ১৪২৬,   ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

টিনএজ সেনসেশন: টেইলর সুইফট

 প্রকাশিত: ১২:৫৩ ২১ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ১২:৫৩ ২১ জুলাই ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

টেইলর সুইফট এর নাম শুনলেই চোখে গিটার হাতে সোনালি চুলের মিষ্টি চেহারার পাশের বাড়ির মেয়ের ছবি মনের পর্দায় ভেসে উঠে। সেই সাথে তার ‘লাভ স্টোরি’ গানটির কথা মনে পরে যায় সবার। মূলত একজন কান্ট্রি সিঙ্গার হিসেবে গানের জগতে প্রবেশ করলেও পরের দিকে পপ গান গুলো দিয়েই বেশি খ্যাতি পান। টিনেজারদের কাছে তার গান গুলো বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়।  তার জন্ম ১৯৮৯ সালের ১৩ ই ডিসেম্বর। ধনু রাশির এই জাতিকার বেড়ে আমেরিকার পেনসিলভানিয়া রাজ্যে। ১৪ বছর বয়সে গানের সংগীতে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে টেনেসির ন্যাসভিলে চলে আসেন।

টেইলর এর কে অনেকে যেমন আইডল হিসেবে দেখেন অনেকেই আবার নানা সময়ে তার প্রেম জীবনের বিতর্কের জন্য মনে রেখেছেন। টেইলর কে একটি কথা প্রচলিত আছে, কোন ছেলেকে তার ভালো লাগলে তা তিনি সরাসরি সামনে না জানিয়ে তাকে নিয়ে একটি গান লিখে ফেলেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ২১ টির মতন গান তিনি লিখেছেন তার বিভিন্ন প্রেমিকদের নিয়ে। 

প্রেমিক বাদেও ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক নিয়ে গান লিখেছেন তিনি। নয় বছর বয়স থেকেই তিনি মিউজিক্যাল থিয়েটারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিয়মিত ভাবে অভিনয় আর গানের উপর তালিম নিতে থাকেন, এর পাশাপাশি নিয়মিত থিয়েটারে পারফরম ও করতেন। গিটারের হাত ধরেই বাদ্যযন্ত্রের সাথে তার পরিচয় হয়। ১৪ বছর বয়সে তিনি লিখে ফেলেন তার প্রথম গান ‘লাকি ইউ’। নিজ এলাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি গান গাইতেন নিয়মিত। 

শানিয়া টোয়াইনের গান থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই কান্ট্রি ঘরানার গান দিয়ে সংগীতের জগতে প্রবেশ করেন। তার নাম ও এক সংগীতশিল্পী জেমস টেইলরের নামানুসারে রাখা হয়েছে। তবে সংগীতকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেয়ার মূল কারণ ছিল ফেইথ হিলের গান। তার উপরে করা ডকুমেন্টারি দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, সংগীত ই হবে তার জীবনের অন্যতম ধ্যান-জ্ঞান। এরপরি তিনি সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন মিউজিক কোম্পানি গুলোর কাছে প্রায়ই গানের রেকর্ড পাঠাতেন। সেই সাথে তার বাবা এবং মা ছিলেন সবসময় পাশে। এই ন্যাশভিলে আসার জন্যই পেনসিলভানিয়ার পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেন এবং এইখানেই থিতু হয়ে পড়েন তার বাবা-মা।

সংগীতের জগতে তার প্রবেশ গান দিয়ে নয় বর গানলেখক হিসেবে। তার এই প্রতিভা দিয়ে সনি এটিভি মিউজিক পাবলিকেশন হাউস এ সর্বকনিষ্ঠ গানলেখক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। পুরো বিশ্ব এখন তাকে এক নামে চিনলেও সাফল্য একবারেই তার হাতে ধরা দেয় নি। এরজন্য বহুবার তাকে ধর্না দিতে হয়েছে নামকরা সব রেকর্ডিং স্টুডিও গুলোর কাছে। এবং প্রত্যেকবারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, বড় বড় রেকর্ডিং কোম্পানি গুলো থেকে বার বার ফিরে যেতে হয়েছে।

কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল তার বয়স মাত্র ১৩-১৪ বছর। তার ভাষায় ‘ আমি নিশ্চিত যে, যদি স্কট বরযেটার (বিগ মেশিন রেকর্ড)  সাথে চুক্তি না করতাম, তাহলে ১৭ বছর বয়সি কাউকেও এমন সুযোগ দিতে সবাই ভয় পেত’। স্কট ও তখন নিজের রেকর্ড লেবেল এর কোম্পানি খোলার পরিকল্পনা করছিল। এক ক্যাফেতে তাদের পরিচয় হবার পর ভাগ্য যেন দুইজনের জন্যই খুলে যায়। আবারো টেইলরের বাবা মা মেয়ের পাশে দাঁড়ান এবং বিগ মেশিন রেকর্ডের ৩% অংশীদারিত্ব কিনে নেন। সনি এটিভি থেকে তিনি সেই ১৪ বছর বয়সেই চলে আসেন। কারণ হিসেবে বলেন ‘ আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে আমার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার জীবনের সেইসব বছর গুলোতে আমার সাথে যা ঘটেছিল অ্যালবামের মাধ্যমে সেইসব ঘটনাগুলো ধরে রাখতে চাই’। তার সিদ্ধান্ত যে জুতসই ছিল তা বলবার দরকার ও বোধহয় নেই।

অ্যালবাম
বিগ মেশিন রেকর্ডের সাথে চুক্তি হবার পর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি  তার গানের অ্যালবাম এখন পর্যন্ত বেরিয়েছে ১২টি। এর মধ্যে স্টুডিও অ্যালবাম ৬টি, লাইভ অ্যালবাম ৩ টি ও এক্সটেন্ডেড অ্যালবাম ৩ টি। তার প্রথম অ্যালবাম প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। নিজের নামে প্রকাশিত এই অ্যালবামে ৫ টি গান ছিল যার মধ্যে ৩ টি গানের কথা তার একাই লিখা ছিল। সাত মিলিয়ন কপি বিক্রি হওয়া এই অ্যালবামের প্রতিটি গান ই ছিল প্রবলভাবে দর্শক সমাদৃত। প্রথম গান ছিল ‘টিম ম্যাকগ্র’ যা বিলবোর্ডের ‘হট কান্ট্রি সং’ এর তালিকার ১ নম্বরে চলে আসে, ২য় গান ‘টিয়ার ড্রপস অন মাই গিটার’ বিলবোর্ড হট ১০০ এর মধ্যে চলে আসে। মূলত এই গানটির কমার্শিয়াল সাফল্য ছিল সবচেয়ে বেশি। এই অ্যালবামের প্রচারণার সময় সুযোগ পেয়ে যান তার শৈশবের অনুপ্রেরণা ফেইথ হিল এর সাথে একই মঞ্চে কাজ করার সুযোগ। ‘ফিয়ারলেস’  অ্যালবামে কো প্রডিউসার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া এই অ্যালবামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরিচিতি আর সাফল্য দুটোই পান। তার প্রত্যেকটি অ্যালবামের একাধিক গান সাফল্য পেলেও সর্বাধিক জনপ্রিয় হিসেবে ধরা হয় ১৯৮৯ অ্যালবামটিকে। এই অ্যালবামটি পুরোপুরি পপ ঘরানার। ১৯৮৯ হল তার জন্মসাল। এই অ্যালবামের ‘শেক ইট অফ’, ‘আউট অফ উডস’, ‘ব্ল্যাঙ্ক স্পেস’, ‘স্টাইল’, ‘ব্যাড ব্লাড’, ‘ওয়াইল্ডেস্ট ড্রিম’ গানগুলো অভাবনীয় সাফল্য পায়। ইউএস ‘বিলবোর্ড হট ১০০’ এ ‘শেক ইট অফ’, ‘ব্ল্যাঙ্ক স্পেস’, ‘ব্যাড ব্লাড’ এই তিনটি গানই প্রথম হয়েছিল।

তার সর্বশেষ অ্যালবাম ‘রেপুটেশন’ বের হয় ২০১৭ সালে। এর ‘লুক হোয়াট ইউ মেইড মি ডু’ গানটি সমালোচক এবং ফ্যান দুটি ক্ষেত্রেই গানের কথা এবং ভিডিও এর জন্য  প্রবলভাবে সমাদৃত হয়।

 

টেইলরের গান এবং মেটাফোর

তার গান যে কেবলমাত্র শুনতেই ভালো লাগে টা নয়। টিনেজদের কাছে তার আবেদনটাই অন্যরকম। টিনএজদের কাছে সুইফট এর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয় তাদের মনের কথা, ভাবনাকে তিনি তার গানের ভাষায় তুলে আনতে পারেন। তাদের সেই জটিলতাগুলোকে আর অনুভূতিগুলোকে টেইলর খুবই সহজ ভাষায় গানের কথায় পরিণত করে তুলেন।

অনেক তারকারা যেমন ফ্যানদের থেকে পালিয়ে বেড়াতে চান, সুইফট তাদের দলে নন। তাকে নিয়ে মানুষের যে কৌতূহল ও উচ্ছ্বাস তা তিনি পুরোপুরি উপভোগ করেন। তার ব্যক্তিজীবন কে তিনি মিডিয়া থেকে লুকিয়ে রাখেন না। বরং তার গানের কথা এবং মিউজিক ভিডিও গুলোর মাধ্যমে তিনি নিজের কথাগুলো ছড়িয়ে দেন। তার বিভিন্ন সময়কার প্রেমিকদের নিয়ে রচনা করেছেন একাধিক গান। সেইসব গানের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হল-

১) ‘স্টাইল’- এই গানটি ১৯৮৯ অ্যালবামের গান। ওয়ান ডিরেকশন ব্যান্ডের হ্যারি স্টাইল কে নিয়ে এই গান টি ছিল বলে ধারণা করা হয়। 

২) আই নৌ ইউ ওয়্যার ট্রাবল- রেড অ্যালবামের এই গানটিও হ্যারি স্টাইলকে অনেকটা ব্যঙ্গ করেই গেয়েছেন।

৩) টিম ম্যাকগ্র- এটি টেইলর সুইফট এর প্রথম অ্যালবামের প্রথম গান। এই গান তার হাই স্কুলের জীবনের প্রেমিক ব্র্যান্ডন বরেলো কে নিয়ে রচনা করেছিলেন। সে ভিন্ন কলেজে চলে যাবার কারণে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।

৪) ‘টিয়ার ড্রপস অন মাই গিটার- এই গানটি তিনি তার স্কুল জীবনের ক্রাশ ড্রিউ হার্ডউইককে নিয়ে রচনা করেন গানের কথায় ই এই নামটি রয়েছে।

অভিনেতা জেক গিলেনহলের দেয়া স্কার্ফ নিয়েও ‘উই আর নেভার এভার গেটিং ব্যাক টুগেদার’ গানে ব্যঙ্গ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়কার সবচেয়ে আলোচিত ছিল তার ‘লুক হোয়াট ইউ মেইড মি ডু’ গানে কানয়ে ওয়েস্ট ২০০৯ সালে এমটিভি অ্যাওয়ার্ডসে পুরস্কার পাবার পর অপদস্থ করার জন্য বিয়ন্সের উল্লেখ করলে তার জবাব দেন। সেই সাথে কিম কার্দাশিয়ান, তার প্রেম জীবন, তাকে নাটুকে বলা সব সমালোচনার সমুচিত জবাব দেন।

 প্রতিভা

গান গেয়ে পরিচিতি পেলেও একাধারে তিনি গানের সুর করেন, কথা লিখেন, অভিনয় করেন। বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ডের জন্য ৬০৫ বার মনোনীত হয়ে পুরস্কার বাগিয়েছেন ৩১১ টি। এমনকি লরেক্স অ্যানিমেটেড ছবিটিতে অড্রে চরিত্র তে নিজে কণ্ঠ দিয়েছেন। ছোটবেলায় মিউজিক্যাল ড্রামাতে অভিনয় দিয়ে শুরু করে পরবর্তীতে হানা মন্টানা তে ক্যামিও এবং ভ্যালেন্টাইন্স ডে ফিল্মে অভিনয় করেছেন। বিভিন্ন টিভি সিরিজেও কাজ করেছেন তিনি। কেবল যে গিটার বাজাতে পারেন তা ই নয়। পিয়ানো, ব্যঞ্জো, ইলেকট্রিক গিটারেও রয়েছে তার সমান দক্ষতা। ইতিহাসের শিক্ষক হলেও তিনি মন্দ করতেন না। আমেরিকার ইতিহাস নিয়ে তার জ্ঞান এতই নির্ভুল যে, যেন হাতের রেখার মতন পরিচিত।

ব্যক্তিজীবন
আমেরিকান মিডিয়া ও ট্যাবলয়েডগুলোতেও টেইলরের ব্যক্তিজীবন নিয়ে রয়েছে অসীম কৌতূহল। প্রায়ই তার বন্ধু, প্রেমিক এবং অন্য তারকাদের সাথে নানাবিধ ঘটনা নিয়ে রসালো সব প্রতিবেদন ছাপান হয়। সাথে সেগুলোকে নিয়ে বোদ্ধাদের যুক্তি, বিচার, ভাবনা, সমালোচনা  গুলোও থাকে প্রচুর। এইসব বিষয়গুলো নিয়ে মিডিয়াতে কথা বলতেও তিনি পিছপা হন না। বরং জবাবটি সময়মতন ই দিয়ে দেন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি খুবই বন্ধুপ্রিয় এমনকি তার বাসায় তার অন্যতম প্রিয় বন্ধু কার্লি ক্লস এর জন্য আলাদা একটি ঘর ই আছে। সেখানে তার বন্ধুর প্রিয় সব খাবার স্টোর করা আর তার অসংখ্য ছবি দিয়ে পুরো ঘর সাজানো। তার প্রিয় সংখ্যা ১৩। রসিকপ্রিয় মানুষ বিধায় সবকিছুরই একটি ব্যাঙ্গাত্বক দিক খুব সহজেই বের করে ফেলেন। গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে তিনি যে পোশাকটি পড়েন সেখানে উপরে সোনালি রঙ এর তিনটি সারি এবং নিচের অংশে সাতটি সারি ছিল। কাকতালীয় ভাবে সেই অনুষ্ঠানে তিনি ১০ টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জিতেন। তার আরেকটি পছন্দের বিষয় হল কোটেশন। নানা সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কোটেশন থাকে তার পছন্দের তালিকায়।  

টেইলর সুইফট কখনই তার ভক্তদের হতাশ করেন না। তার চরম সমালোচককেও একটি বিষয় স্বীকার করতেই হয় যে সে প্রতিভাবান। নিজের নামের সাথে জুড়ে থাকা হাজারটা পাশ কাটিয়ে আরও এগিয়ে যান আর সংগীত জগতে তৈরি করুক অন্যরকম এক অবদান সামনের দিনগুলোতে এই রইল তার প্রতি প্রত্যাশা।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ