Alexa টাকার চেয়ে মনুষ্যত্ব বড়

ঢাকা, সোমবার   ১৮ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৩ ১৪২৬,   ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

টাকার চেয়ে মনুষ্যত্ব বড়

 প্রকাশিত: ১৭:১৫ ২১ অক্টোবর ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

সন্তানের চেয়ে আরাধ্য বাবা-মায়ের কাছে আর কিছু হতে পারে না।  

নিজ রক্তস্রোতের ধারাবাহিকতায় বাবা-মায়ের ভালোবাসার ফসল হিসেবে যে সন্তান জন্মায় সে হয় তাদের উত্তরসূরি ।তার কীসে ভালো হবে, কীসে সে ভালো থাকবে এটাই থাকে বাবা মার একমাত্র চিন্তা। নিজেরা কষ্ট করেন, সন্তানের গায়ে আঁচড়টি লাগতে দেন না। সন্তানের অসুস্থতায় বিনিদ্র রাত জাগেন । বিধাতার কাছে এই প্রার্থনায় নত হন, সন্তান যেন ভালো থাকে, সুখে থাকে। 

বিষয়টি সর্বজনীন। পৃথিবীর সব দেশে, সব সময়ে সত্য। ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নিচ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, অরণ্য-জলাভূমি- গুহাবাসী সবার জন্য সমানভাবে সত্য। 

যাদের সন্তান নেই শুধুমাত্র তারা জানে সন্তান না থাকার মর্মবেদনা। সন্তান কামনায় অতিবাহিত হয় তাদের কত শত বিনিদ্র রাত। সমাজ সংসারও তাদের ভালো  চোখে দেখে না। সন্তানের মধ্য দিয়ে রক্তের ধারাবাহিকতা আর উত্তরাধিকার নিশ্চিত হয় বলে সন্তান কামনা সবারই থাকে। সন্তানের মাঝে মানুষ বেঁচে থাকতে চায়। তাই নিঃসন্তানরা দিনের পর দিন ডাক্তারের কাছে ছোটে। ডাক্তার কবিরাজ বদ্যি ঝাড়ফুঁক পীর ফকির কিছুই বাদ যায় না। অনেকে বিকল্প পথ বেছে নেয়। টেস্টটিউব বেবি থেকে শুরু করে পাশ্চাত্যে এখন গর্ভ ধার দেয়া হয়। যে  কোনো উপায়ে মানুষ সন্তান চায়। 

বাবা মা সব সন্তানকে সমান চোখে দেখে। একজন দরিদ্র লোকের যদি দশ বারোটি সন্তান হয় তারপর ও সে সবকটি সন্তানকে ভালোভাবে বড় করতে সচেষ্ট হয়। অনেকে অনেক সময় বলে, ‘বাবা অমুক ছেলেটিকে বেশি ভালবাসে’ মা ‘অমুক মেয়েটিকে বেশি ভালোবাসে।’ সন্তানের শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো জটিল কারণ ছাড়া এমন ঘটে না। আপাতদৃষ্টিতে এমনটা মনে হলেও বাবা- মা আসলে সব সন্তানকেই সমান চোখে দেখে।

আগে অনেক সন্তান হত। দিনে দিনে সন্তানসংখ্যা কমে যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকার সমস্যা, যানজট ইত্যাকার কারণে সরকার চাইছে জনসংখ্যা কমুক। পরিবারগুলোও অল্প সন্তান নিয়ে তাদের ভালোভাবে মানুষ করতে চাইছে। আগে যৌথ পরিবার ছিল। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পবিরারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। যৌথ পরিবারে সন্তানের দেখাশুনা করার জন্য অনেক মানুষ ছিল। একক পরিবারে মানুষ নেই। মহিলারা এখন চাকুরিমুখী। সন্তান পালিত হয় কাজের বুয়ার কাছে। ঠিকমতো বুয়াও পাওয়া যায় না। তাই এখন পরিবার প্রতি এক দুজন সন্তান। এই সামাজিক বদলের মধ্যেও একটি জায়গা কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত ঠিক ছিল। সন্তানের প্রতি ভালবাসা। 

কিন্তু সে জায়গাটাও টলে গেছে। খারাপ সন্তানের কথা আমরা ভুরি ভুরি শুনি। ঐশী তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। এমন অনেক অনেক প্রমাণ আছে।  খারাপ বাবার কথা এতকাল তেমন শুনিনি। কিন্তু মুল্যবোধের অবক্ষয়, লোভ লালসা এখন সর্বগ্রাসী।  এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সন্তানকে বাবা মায়ের আগ্রাসন আর হিংসার শিকার হতে হচ্ছে। 

পিতা কন্যাকে ধর্ষণ করছে এ খবর এখন পুরোনো। প্রথম যেদিন শুনেছিলাম আঁতকে উঠেছিলাম। এখন আর উঠি না। মায়ের সহায়তায় সৎ পিতা কন্যাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করছে এমন ঘটনাও প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনা যা ঘটে তার কতটুকুই বা প্রকাশিত হয়। বেশিরভাগই থাকে অন্ধকার। সৎ বাবার কুকীর্তির আরো অনেক ঘটনা আছে। সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে সাড়ে তিন বছর বয়সী অনিক নামের সৎ ছেলেকে প্রথমে আছড়ে তারপর গলা টিপে হত্যা করেছে সৎপিতা মাধব পাল।  

সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশ । সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার  কেজাউরা গ্রামে পিতা আবদুল বাছির  নিজ হাতে তার সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী পুত্র তুহিন মিয়াকে হত্যা করেছে দুই ভাইয়ের সহায়তায়। রাতের বেলা ছেলেটিকে কোলে করে বাইরে নিয়ে এসে পিতা আর চাচারা নৃশংসভাবে খুন করে তার বুকে দুটি ছুরি ঢুকিয়ে কদম গাছে ঝুলিয়ে রাখে। ছুরি দুটিতে লেখা থাকে দুটি নাম। নাম দুটি অবশ্যই তাদের প্রতিপক্ষের। হন্তারক পিতা ছেলেটির লিঙ্গও কর্তন করে। 

জমি নিয়ে বিবাদ আর মামলার জের হিসেবেই এ খুন বলে জানা গেছে। একই গ্রামের প্রতিপক্ষ বাছিরের বিরুদ্ধে মামলা করে। ছেলেকে খুন করে তাদের আসামি করতে চেয়েছিলো বাছির। বাছির আগে থেকেই খুনি। তার নামে একাধিক খুনের মামলা আছে। জেলও খেটেছে। কিন্তু তাই বলে নিজের ছেলেকে খুন করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চাইবে পিতা এমনটি ভাবা যায় না!

সম্প্রতি কালো বলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলায় তিন মাসের মেয়েকে আছেড়ে মারার ঘটনা পড়ে শিহরিত হয়ে উঠিছিলাম। কিন্তু একই ঘটনা ঘটল আমার দেশে। তবে কালোর জন্য নয়, জিঘাংসায়। ঘটনা পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুরের কিসমত নিমজ্জা এলাকার । হাসিবুল একই গ্রামের মেয়ে সেলিনার সাথে প্রেমের সম্পর্ক  থেকে  দৈহের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সেলিনা ৫ মাসের অন্ত:সত্তা হলে এলাকায় জানাজানি হয়ে যায়। হাসিবুল বিবাহিত ছিল। তারপরও গ্রাম্য বিচারে হাসিবুলের সাথে সেলিনার বিয়ে হয়। একসময় সেলিনার সন্তান জন্ম নেয়। স্বামী তার ও মেয়ের কোনো খোঁজ খবর না নেয়ায় স্বামীর বাড়িতে যায় সেলিনা। সেখানে প্রথমে সবাই মিলে তাকে প্রচন্ড মারধোর করে। তারপর  সেলিনার প্রতি প্রচন্ড জিঘাংসায় ৩৬ দিন বয়সী হাসি নামের শিশুটিকে বিছনায় আছড়ে মেরে চিরদিনের মতো তার হাসি মুছে দেয় পিতা হাসিবুল। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় ১০ বছর বয়সী মোরসালিনকে মুখ চেপে শ্বাসরোধ করে ব্লেড বা অন্য কোনো ধাঁরালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে কচুড়িপানা ভর্তি পুকুরে লাশ ডুবিয়ে রাখে পিতা মোসাইদ। এরপর সে গ্রামে রটিয়ে দেয় তার ছেলেকে ছেলেধরা ধরে নিয়ে গেছে। ছেলের মা রেহানার ধারণা তাকে বা কোনো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য স্বামী  এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে । 

উপর্যুপরি এসব ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে অন্তর্হিত হচ্ছে বিবেকবোধ। যে পিতা সন্তানের সবচেযে বড় আশ্রয়স্থল, বটবৃক্ষের মতো সে পিতাই যদি হয় হন্তারক তাহলে সন্তানদের জীবনের নিরাপত্তা কি! সামান্য লোভ লালসায় ঔরসজাত সন্তানের বুকে ছুরি চালায় পিতা! যে জমি বা যে সম্পত্তির লোভে এই হত্যা সে সম্পত্তি তো এদের জন্যই। এরা যদি না থাকে এ সম্পত্তি দিয়ে কী হবে!  

আগে মানুষের দারিদ্র বেশি ছিল। গ্রাম গ্রামই ছিল। গ্রাম্য রাজনীতি তখনও ছিল, এখনও আছে। কিন্তু ভিলেজ পলিটিক্সের শিকার কোনো সন্তান হয়েছে বলে শুনিনি। পশু-পাখি, প্রাণিকুল বুক দিয়ে আগলায় তাদের সন্তানদের। আর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের ছুরি সন্তানের দিকে উত্থিত! সন্তানের ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্তে স্নান করে পিতা!। এ বীভৎসতা এ কদর্যতা মানা যায় না। এসব খুনের শাস্তি ফাঁসি নয়, আরো কঠিন কিছু। 

আমরা সভ্য হচ্ছি। সভ্যতার আলো কী গ্রামে পৌঁছাচ্ছে না। অতিরিক্ত লোভ, অঢেল টাকা পয়সা, ক্ষমতার অসারত্ব কী মানুষ আজো বুঝতে পারছে না! বুঝতে পারছে না আখেরে সুকীর্তিটুকুই থাকে  আর কিছুই থাকে না। এই মোটিভেশন গ্রামে পৌঁছে দেয়া জরুরি। লোভী পিতার লোভ মুক্তি হবে না ঠিক,  কিন্তু যে শিশু জন্ম নিচ্ছে আজ, জন্ম নেবে কাল তাদের জানানো দরকার টাকার চেয়ে, ক্ষমতার চেয়ে মনুষ্যত্ব বড়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর