.ঢাকা, বুধবার   ২০ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৫ ১৪২৫,   ১৩ রজব ১৪৪০

ঝুঁকি নিয়ে জাহাজ মেরামত করেন তারা

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি

 প্রকাশিত: ১৫:৪৯ ৬ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ১৬:০৪ ৬ আগস্ট ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

‘আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া এখানে লঞ্চ ও জাহাজ মেরামত করা হয়। ভারী লোহার শীটসহ জাহাজের ভারী অংশ সমূহ শ্রমিকদেরই বহন করতে হয়। ঝুঁকি নিয়ে এসব কাজ করতে গিয়ে অনেকে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন এমনকি মারাও যান।’

আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বুড়িগঙ্গার তীর সংলগ্ন এক ডকইয়ার্ডের শ্রমিক ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ মামুন। শুধু সে নয় বরং তার মতো ১৫ হাজার শ্রমিক যুক্ত রয়েছে জাহাজ ভাঙা শিল্পে। যারা কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই দৈনিক ২৫০-৩৫০ টাকা মজুরীর বিনিময়ে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। 

জানা গেছে, বুড়িগঙ্গার তীর সংলগ্ন ঢাকার কেরানীগঞ্জ, হাসনাবাদ, দোলেশ্বর ও চর মিরেরবাগে গড়ে উঠেছে জাহাজ ও লঞ্চ তৈরির বিভিন্ন ডকইয়ার্ড। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৫টির মত ডকইয়ার্ড রয়েছে। লঞ্চ ও স্টিমার মেরামতসহ এখানে প্রপেলর তৈরী হয়ে থাকে। যা একসময় বিদেশ থেকে আমদানি করা হত। 

এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শুধু প্রাপ্ত বয়স্করাই নয় বরং আছে শিশু শ্রমিকও। একটি প্রপেলর ওয়ার্কশপে কাজ করে ১২ বছর বয়সি মোহাম্মদ আশরাফুল। তার মতো আরো অনেক শিশুকেই ডকইয়ার্ডে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দেখা যায়। আশরাফুল জানায়, সে মাসে ছয় হাজার টাকা বেতন পায়। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাকে। সপ্তাহে অবশ্য একদিন ছুটিও পায় সে। 

কেরাণীগঞ্জের ডকইয়ার্ডে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য নেই কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম। শ্রমিকরা জানেনও না এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কিছু নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরিধান করার বিধানের কথা। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনায়ও পড়েন অনেকে। জাহাজ ডকইয়ার্ডের আরেক কর্মচারী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি বড় বড় যন্ত্রের কথা জানি না যা সারা বিশ্বের জাহাজ তৈরি করে কিন্তু নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ এখানে বিপজ্জনক। প্রায় প্রতিনিয়ত কাজ করতে গিয়ে ছোট ছোট জখমের শিকার হতে হয়। একবার আমি পায়ে আঘাত পাই। ১৫ ফুট উচুঁ একটি ঝুলন্ত একটি তক্তার ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন হঠাৎ করেই আমার পা সরে যায় এবং পড়ে গিয়ে আমার পা ভেঙে যায়।’

আরো এক শ্রমিক জানায়, ‘আমাদের শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে মালিক পক্ষের কোনো দৃষ্টি নেই। তারা শুধু চায় কাজ আর কাজ। যতই অসুস্থ থাকি না কেন, কাজ না করলে টাকা নেই। অথচ মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গিয়েই কিন্তু আমরা দুর্ঘটনার শিকার হই।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ অক্যুপেশনাল সেইফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ফাউন্ডেশন (ওশি)র তথ্যমতে, দেশের বিভিন্ন জাহাজ ভাঙ্গা ইয়ার্ডে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন দূর্ঘটনায় ২০১৭ সালে ১৫ শ্রমিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২২ জনেরও বেশি শ্রমিক। ওশি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত বার্ষিক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড-কুমিরায় অবস্থিত  বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড সহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ছোট ছোট ইয়ার্ডে প্রতিনিয়তই এসব দূর্ঘটনা ঘটছে। এসব ইয়ার্ডে হতাহতের সংখ্যাও বেশি। দুর্ঘটনার কারণ জাহাজ থেকে পড়ে যাওয়া, লোহার পাতের ধাক্কা বা নিচে চাপা পড়া, অগ্নিকান্ড, এক্সক্যাভাটরের আঘাত এবং বিষাক্ত গ্যাসে আটকা পড়া। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৫ শতাংশ ইয়ার্ডের মালিক তাদের শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ- হেলমেট, সেইফটি জ্যাকেট, বুট ইত্যাদি সরবরাহ করেন না। অন্যদিকে যেসব ইয়ার্ডে ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয় সেখানকার শ্রমিকরাও এসব ব্যবহারে উদাসীন থাকেন। দেখা গেছে, যেসব শ্রমিক পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে চলছেন তারা দুর্ঘটনা থেকে মুক্ত।  

ওশির প্রতিবেদনে জাহাজ ভাঙ্গা ইয়ার্ডে শ্রমিকদের হতাহতের পেছনে রাতের বেলায় কাজ করা, সেইফটি প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রমিক নিযুক্ত করা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ প্রদানে মালিকপক্ষের অনীহা, শ্রম আইন ও বিধিমালার অপর্যাপ্ত প্রয়োগ, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অপর্যাপ্ত পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনার অভাবকে দায়ী করা হয়। 

জাহাজভাঙ্গা শিল্প এলাকায় কর্মপরিবেশ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়নে ওশির পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। শ্রম বিধি ২০১৫ অনুযায়ী প্রতিটি ইয়ার্ডে সেইফটি কমিটি গঠন ও তা কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছে ওশি ফাউন্ডেশন। তাছাড়া রাতের বেলায় কাজ করা, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শ্রমিক নিযুক্ত করা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ পরিধান না করলে জাহাজকাটার কাজে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সুপারিশ করা হয়।  

বেশীরভাগ জাহাজের জাহাজ পুরাতন বণিক জাহাজের প্লেটস, ইঞ্জিন এবং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে, যা ডেনমার্ক, জার্মানি এবং জানা গেছে, কেরাণীগঞ্জের ডকইয়ার্ডে তৈরি জাহাজগুলোতে ব্যবহৃত প্লেটের অধিকাংশই পুরনো। এ সব পুরনো স্টিল আসে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী এলাকার পুরনো ভাঙা জাহাজ থেকে। পুরনো স্টিল ব্যবহারের ফলে দেশে তৈরি এসব জাহাজ তৈরিতে খরচও হয় তুলনামূলক কম। 

এই ছোট এবং মাঝারি আকারের জাহাজগুলো ইউরোপীয় বাজারের জন্য রপ্তানি করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ শিপ বিল্ডিং এখন চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় জাহাজনির্মাণ শিল্পের সঙ্গে তুলনীয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে