জ্বলন্ত আগুন থেকেও উঠে এসেছিলেন যে নবীপ্রেমিক

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২১ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪২৬,   ১৫ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

জ্বলন্ত আগুন থেকেও উঠে এসেছিলেন যে নবীপ্রেমিক

 প্রকাশিত: ১৯:১২ ১০ নভেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৯:১২ ১০ নভেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসংখ্য অগণিত সাহাবি ছিল। 

পূণ্যাত্মার মানুষ ছিলেন তারা। আখলাক চরিত্রে সর্ব উত্তম। আত্মার শুভ্রতা আকাশ ছোঁয়া। তাদের জীবন সফলতার গল্প নির্মিত হয়েছে মুক্তার দানা দিয়ে। শুভ্রতার ইতিহাসে আজও তারা দেদীপ্যমান। 

এই ইতিহাসের মহানায়কদের সঙ্গে যারা জীবনের পথ রাঙ্গিয়েছেন, যাদের থেকে নিয়েছেন রাসূলুল্লাহকে ভালোবাসার সবক; তাদের একজন হজরত আবু মুসলিম খাওলানী (রহ.)। তার আসল নাম আব্দুল্লাহ ইবনে সাওব। অনেকে তাকে সাহাবীও বলেছেন। তবে আল্লামা তকি উসমানী (দা. রা.) তাকে সাহাবী বলেননি। 

আবু মুসলিম (রহ.) ছিলেন দৃঢ়চেতা মনোভাবের অধিকারী। জিহাদের নেশায় ডুবে থাকতেন। নবীজি (সা.) এর সোহবত লাভ করতে পারেননি। এই ছিলো তার জীবন ইতিহাসের সর্বপেক্ষা বড় কষ্ট। বাড়ি ছিলো ইয়ামিনে। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ জমানায় ইয়ামানে আসওয়াদ আনাসি নামে এক ভণ্ডনবীর আর্বিভাব ঘটে। সেই ভণ্ডনবী আবু মুসলিম খাওলানীকে ডেকে পাঠায়। তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি আমাকে নবী মান? আবু মুসলিম এর সোজা উত্তর, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কাউকে নবী মানি না। 

একথা বলেই তিনি চুপ হলেন না। আরো দু’কথা শুনিয়ে দিলেন উত্তেজিত ভাষায়; ‘মুহাম্মাদ ছাড়া যে নবী দাবি করবে তার সঙ্গে আমার ফয়সালা হবে তরবারির মাধ্যমে।’ 

একথা শুনে আসওয়াদ আনাসী গরম তেলে মাছ ভাজার মতোই ছ্যাত করে উঠলো। লোকবল দিয়ে আবু মুসলিমকে (রহ.) বেঁধে ফেললো। অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করলো। আবু মুসলিম (রহ.)-কে তাতে নিক্ষেপ করা হলো। কিন্তু কুদরতের কারিশমা বুঝা বড় দায়! নবীপ্রেমিক আল্লাহর ওলি খাওলানী (রহ.) দীর্ঘ সময় আগুনে থাকার পরও আগুন তার লোমও স্পর্শ করেনি। সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় আগুন থেকে বেড়িয়ে আসেন।

এমন আজব কাণ্ড দেখে ভণ্ডনবী আসওয়াদ আনাসী নিজেও ভড়কে গেলো। তার অনুসারিদের মাঝেও স্পষ্ট হয়ে গেলো কে ভণ্ড নবী আর কে সত্যনবী! 

অবস্থা বেগতিক দেখে আবু মুসলিমকে দেশত্যাগে বাধ্য করে ওই ভণ্ডনবী। খাওলানী (রহ.) ইয়ামন ছেড়ে মদীনার পথ ধরেন। চোখে মুখে নবীজির সাক্ষাতের আকুলতা। বুকের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠা-নামায় অভিলাষের তীব্র ঢেউ। কথা আর কল্পনা একটাই যে- নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাতে ধন্য হবো।  

যতোই মদীনার নিকটবর্তী হয়, ততোই সাক্ষাতের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে প্রেমের জোয়ার। কণ্ঠে উঠে হাজার রকমের বাহারী দরুদ। কল্পনার জগত জুড়ে নবী (সা.) এর সাক্ষতের কল্পকথা। নবীজি  আমাকে কাছে ডাকবেন না বেআদব মনে করে দূরে ঠেলে দিবেন? আরো কত কিছু মনের আকাশে উড়াউড়ি করছে। 

কিন্তু ইতিহাস বলে অন্যকথা। আবু মুসলিম খাওলানী যখন মদীনায় প্রবেশ করবে ঠিক এই মুহূর্তে দরবারে আলাতে হাজিরা দিতে ইহধাম ত্যাগ করেন হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রেমিক খাওলানী মদীনার আকাশে তাকিয়েই বুঝে নিলেন এই পৃথিবীতে মুহাম্মাদ (সা.) নেই। 
আকাশ বাতাস কেমন যেন বিরহী যাতনায় নীরব নিশ্চুপ। বিরহ ব্যথা বুকে চেপে ধরেই মদীনায় ঢুকলেন খাওলানী (রহ.)। পৃথিবীকে দেখালেন না ভিতরে তার কেমন ক্ষত আর ক্ষরণ সৃষ্টি হয়েছে। ঘোড়াটা বাঁধলেন মসজিদে নববীর আঙ্গিনায়। মসজিদে প্রবেশ করে নামাজে দাঁড়ালেন। খুটির আড়াল থেকে হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব বিষয়টি দেখলেন। অসময়ে মসজিদে কে? হজরত ওমর (রা.) এর ভেতরে প্রশ্ন। নামাজান্তে পরিচয় জানতে চাইলেন। আবু মুসলিম বললেন, আমি ইয়ামন থেকে এসেছি। 

হজরত ওমর (রা.) আরো জানতে চাইলেন ভণ্ডনবী আসওয়াদ আনাসী আমাদের এক ভাইকে আগুনে নিক্ষেপ করেছে। তার কিছুই হয়নি। পরবর্তীতে আসওয়াদ আনাসী তার সঙ্গে কী রূপ ব্যবহার করেছে? 

খাওলানী উত্তর করেলেন, হ্যাঁ তার নাম আব্দুল্লাহ ইবনে সাওব। এতোক্ষণে হজরত ওমর (রা.) এর গভীর ঈমানি দৃষ্টির জালে আটক গেছে খাওলানী। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব বললেন, আমি আপনাকে কসম করে বলছি আপনি কী সেই লোক? জ্বী, হ্যাঁ। খাওলানীর ছোট্ট জবাব। 

একথা শুনে শোকরিয়া বিহবলতায় খাওলানীকে জড়িয়ে ধরেন এবং হাতে কপালে চুমু খান। হাত ধরে নিয়ে যান খালিফাতুর রাসূল হজরত আবু বকরের দরবারে। ছিদ্দিকে আকবর তাকে নিজের পাশে বসান। হজরত আবু বকর (রা.) বলেন, শোকরিয়া রাব্বুল ইজ্জতের যিনি আমার মৃত্যুর আগেই ওই লোকের সাক্ষাত করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ যার সঙ্গে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর আচরণ করেছেন। 

হজরত আবু মুসলিম খাওলানী (রহ.) ছিলেন দুনিয়া বিমুখ এক আবেদ কামিল মানুষ। তার নিজের ব্যাপারে তার একটি কথা দিয়েই শেষ করছি। তিনি বলেন, আমি যদি আমার এই চর্মচোখ দ্বারা জান্নাতকে দেখে ফেলি, তাহলেও আমার বর্তমান আমল থেকে বেশি কিছু করার নেই। তদ্রুপ আমি যদি খোলা চোখে জাহান্নাম দেখে নিই, তাহলেও বর্তমান আমার থেকে বেশি কিছু করার নেই। 

হজরত খাওলানী (রহ.) জিহাদের সফরেও রোজা রাখতেন, তার কোনো এক বন্ধু তাকে বললো, সফরের অবস্থায় রোজা রাখা বাধ্য নয়; তাও আবার জিহাদের সফর? আবু মুসলিম বলেন, ওই ঘোড়াই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে যে ঘোড়া চলতে চলতে হাড্ডিসার হয়ে যায়। এই মুসলিম মহামনীষির শেষ জীবন সিরিয়াতে কাটিয়েছেন। সিরিয়ার দারিয়া এলাকায় তার কবর রয়েছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics