Alexa জুমা’র দিনে যে ভুলগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়

ঢাকা, রোববার   ২১ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৭ ১৪২৬,   ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪০

জুমা’র দিনে যে ভুলগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়

গাজী মো. রুম্মান ওয়াহেদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৩:২২ ১৪ জুন ২০১৯  

পবিত্র জুমার দিন মুমিন মুসলমানরা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু ভুল করে থাকেন, যাতে একটু সতর্ক থাকলেই তা আর হয় না। 

আর এ ভুলগুলো না হলে অনেক সহজেই জুমা’র পরিপূর্ণ সওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হওয়া যায়।

এ ভুলগুলো থেকে বাঁচতে প্রত্যেককেই মুমিন মুসলমানেরই সতর্ক থাকা জরুরি। 

জুমা’র দিনের ভুলগুলো হলো-

(১) খুতবার সময় কথা:
জুমা’র নামাজের খুতবার সময় কথা বলা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন। কথা বলার দ্বারা অন্যকে খুতবা শুনতে বাধাগ্রস্ত করায়ও অনুমতি নেই। খুতবার সময় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম উম্মাহকে চুপ থাকতে বলেছেন।

সুতরাং ইমাম যখন খুতবা দেয় তখন চুপ থাকা উচিত। সাপ্তাহিক জুমা’র খুতবা সব মুসলিমের জন্য অনেক উপকারি। কারণ জুমার খুতবায় দ্বীন ও দৈনন্দিন অনেক বিষয়ে বয়ান পেশ করা হয়। হাদিসে এসেছে-

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ইমাম যখন জুমার খুতবা দেয়, তখন তুমি তোমার কোনো সাথীকে চুপ থাকতে এবং খুতবার শোনার আহ্বান কর তবে নিঃসন্দেহে এটাও (চুপ থাকা ও খুতবা শোনার কথা বলা) শয়তানের কাজ।’ (বুখারি)।

(২) খুতবা না শোনা:
মুসল্লিদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে খুতবা শোনে না কিংবা খুতবার সময় কথা-বার্তায় সময় অতিবাহিত করে, সে ব্যক্তি জুমা’র নামাজ থেকেও অনুপস্থিত থাকে। যারা মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনে না, তারা পুরস্কারও পাবে না। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা। হাদিসে এসেছে-

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি (ইমামের) খুতবার সময় নিজেকে কথা বলা থেকে বিরত না রাখবে সে জুমা’র পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হবে।’ (মুসলিম)

(৩) জুমা’র নামাজের সময় কাজ করা:
জুমা’র দিন নামাজের সময় যেকোনো কাজ করা নিষিদ্ধ। তারপরও মানুষ এ দিন নামাজ বাদ দিয়ে কাজে ব্যস্ত থাকে। শুক্রবার যখনই জুমা’র নামাজের আজান হবে তখনই সব কাজ রেখে মসজিদের দিকে ছুটে যেতে হবে। আল্লাহ তায়ালা জুমার নামাজের নির্দেশ দিয়ে বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِي لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

‘হে মুমিনগণ! যখন জুমার দিন নামাজের জন্য (আজান) আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও। আর বেচা-কেনা বর্জন কর। এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পার।’ (সূরা জুমআ : আয়াত ৯)।

(৪) জুমা’র নামাজে দেরিতে যাওয়া:
শুক্রবার যথা সময়ে জুমার নামাজের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কোনো অজুহাতে জুমা’র নামাজে দেরি করে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শুক্রবার তাড়াতাড়ি জুমা’র উদ্দেশ্যে গোসল করে মসজিদের দিকে যাওয়ার জন্য রয়েছে পুরস্কার। হাদিসে এসেছে-

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যেক জুমা’র দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতা অবস্থান করেন। ক্রমানুসারে মসজিদে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার আগে আসে তার জন্য মোটাতাজা উট কোরবানির সাওয়াব লেখেন। তারপর যে আসে তার জন্য গাভী কোরবানির সাওয়াব লেখেন। তারপর আগমনকারীর জন্য মুরগি দানের সাওয়াব লেখেন। তারপর আগমনকারী ব্যক্তি ডিম দানকারীর সাওয়াব পাবে। অতঃপর ইমাম যখন মিম্বারে আরোহন করেন তখন ফেরেশতা (সওয়াব লেখার) খাতা বন্ধ করে মনোযোগ সহকারে ইমামের খুতবা শুনতে থাকেন।’ (বুখারি)।

(৫) অপরিস্কার কাপড় পরিধান:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমা’র নামাজের জন্য ভালো পোশাক পরিধান করতে বলেছেন। তিনি নিজেও শুক্রবার সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন। জুমা’র নামাজের জন্য অতিরিক্ত এক জোড়া পোশাক তৈরির তাগিদ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে-

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কারো ওপর দোষ আসবে না , যদি সে নিজের প্রয়োজনীয় কাপড় ছাড়াও সামর্থ্য থাকলে আরো দু’টি কাপড় জুমা’র নামাজের জন্য বানিয়ে নেয়া।’ (ইবনে মাজাহ, মিশকাত)।

মূল কথা:
জুমা’র দিন ইচ্ছা করলেই প্রিয়নবী (সা.) ঘোষিত সুন্নাতগুলো যথাযথ পালন করা যায়। বিনিময়ে লাভ করা যায় অনেক সাওয়াব ও কল্যাণ। অথচ মানুষ ইচ্ছা করে-

খুতবার সময় কথা বলে।
ইমামের খুতবা শোনা থেকে বিরত থাকে।
জুমার নামাজের সময় হওয়া সত্ত্বেও কাজে ব্যস্ত থাকে।
জুমার নামাজে দেরি আসে এবং
অবহেলা বশতঃ অপরিস্কার, পুরাতন কাপড় পরিধান করে।
 
সুতরাং জুমা’র দিনের এ সাধারণ ভুলগুলো থেকে বেরিয়ে এসে হাদিসের নিদের্শনা অনুযায়ী, খুতবার সময় হট্টগোল না করে খুতবা শোনা, আজান হওয়ার নামাজের প্রস্তুতি গ্রহণ করে তাড়াতাড়ি মসজিদের দিকে ছুটে যাওয়া এবং জুমার দিন সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করা।

মহান রাব্বুল আরামিন আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জুমা’র দিনের এ ভুলগুলো থেকে হেফাজত থাকার এবং জুমা’র দিনের করণীয় কাজগুলো যথাযথ আদায় করার তাওফিক দান করুন। 

জুমা’র দিনে রাসূল (সা.) এর প্রতি দরুদ পাঠ:
মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হলো, জুমার দিন। এই দিনে তোমরা আমার প্রতি দরুদ পাঠ কর। যেহেতু তোমাদের দরুদ আমার ওপর পেশ করা হয়ে থাকে।’ (আবূদাঊদ, সুনান ১৫৩১)

রাসূল (সা.) আরো বলেন, ‘জুমার রাতে ও দিনে তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ কর। আর যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, সে ব্যক্তির ওপর আল্লাহ ১০ বার রহমত বর্ষণ করবেন।’ (বায়হাকী, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ১৪০৭)

জুমা’র রাতে (বৃহ্স্পতিবার দিবাগত রাতে) ও (জুমার) দিনে প্রিয়নবী (সা.) এর শানে অধিকাধিক দরুদ পাঠ করা কর্তব্য।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হাবীব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম এর ওপর দরুদ পড়তে স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দেন।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন,
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

‘নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) স্বয়ং এবং আমার ফেরেস্তাগণ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর দরুদ পাঠ পূর্বক সালাম প্রেরণ করিয়া থাকি; হে মুমিনগণ তোমরাও তাঁহার ওপর দরুদ পাঠ কর এবং সালাম প্রেরণ কর।’ (সূরা: আহযাব, আয়াত: ৫৬)

দরুদে ইব্রাহিমের আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ:
اَللّهُمَّ صَلِّ عَلى مُحَمَّدٍ وَّعَلى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدُ، اَللّهُمَّ بَارِكْ عَلى مُحَمَّدٍ وَّعَلى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ।

উচ্চারণ:
‘আল্লা-হুম্মা স্বাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁউঅআলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা স্বাল্লাইতা আলা ইবরা-হীমা অ আলা আ-লি ইবরা-হীম, ইন্নাকাহামীদুম মাজীদ। আল্লা-হুম্মা বা-রিক আলা মুহাম্মাদিঁউঅ আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা বা-রাকতা আলা ইবরা-হীমা অ আলা আ-লি ইবরা-হীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।

অর্থ:
‘হে আল্লাহ! তুমি হজরত মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরের ওপর রহমত বর্ষণ কর, যেমন তুমি হজরত ইব্রাহিম ও তাঁর বংশধরের ওপর রহমত বর্ষণ করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত গৌরবান্বিত।’

‘হে আল্লাহ! তুমি হজরত মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরের ওপর বর্কত বর্ষণ কর, যেমন তুমি হজরত ইব্রাহিম ও তাঁর বংশধরের ওপর বর্কত বর্ষণ করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত গৌরবান্বিত।’ (বুখারী, মিশকাত ৯১৯)

জুমা‘র সালাত ত্যাগ করা কবীরা গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমা ত্যাগের ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে সকল লোক জুমা ত্যাগ করে তারা যেন অবশ্যই তা থেকে ফিরে আসে, নচেৎ আল্লাহ তায়ালা তাদের হৃদয়ের ওপর মোহর মেরে দিবেন অতঃপর তারা গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সহীহ মুসলিম)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি অবহেলা করে তিন জুমা ত্যাগ করবে আল্লাহ তার হৃদয়ের ওপর মোহর মেরে দিবেন।’(সুনান তিরমিযী ও নাসাঈ)।
 
অপর একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমার ইচ্ছা হয়, কোনো ব্যক্তিকে লোকদের ইমামতি করার আদেশ দেই, অতঃপর যে সকল লোক জুমা‘র সালাতে আসেনি তাদের ঘর-বাড়ির দিকে অগ্রসর হয়ে সেগুলোকে জ্বালিয়ে দেই।’(সহীহ মুসলিম)।

উপরোক্ত হাদিসসমূহ জুমা’র সালাতের গুরুত্বের ওপর তাকিদ দিচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে, শুধুমাত্র জুমা’র সালাতই ফরজ; বরং জুমা’র সালাত যেমন ফরজ তেমনিভাবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতে আদায় করাও ওয়াজিব।

সুতরাং যারা কোনো সালাতই পরতাম না আজ জুমা হতে শুরু করব আর যারা শুধু শুক্রবার সালাত আদায় করতাম তারা পাঁচ ওয়াক্ত শুরু করব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহুম্মা আমিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে