জীবনবাজি রেখে করোনা পরীক্ষায় চবির গবেষকদল

ঢাকা, বুধবার   ২৭ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৭,   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

জীবনবাজি রেখে করোনা পরীক্ষায় চবির গবেষকদল

রুমান হাফিজ, চবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৩২ ১২ মে ২০২০   আপডেট: ১৯:৪৭ ১২ মে ২০২০

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল উদ্যমী গবেষক

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল উদ্যমী গবেষক

করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত পুরো বিশ্ব। দেশে দেশে চলছে লকডাউন। এখনও আবিষ্কার হয়নি প্রতিষেধক। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিতে এগিয়ে এলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল উদ্যমী গবেষক।

যারা নিজেদের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে এই দুর্যোগে কাজে লাগানোর স্বপ্ন দেখতেন। ১০ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার ল্যাব চালু হওয়ায় খুলে যায় তাদের স্বপ্নের দোয়ার।

চমেকে কোভিড-১৯ পরীক্ষাগার-এর সামগ্রিক বায়োসেইফটি পর্যালোচনা এবং পরীক্ষা পদ্ধতির সঠিক নিয়মাবলী (SOP) তৈরি করতে কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করেছেন তারা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের ৬ জন গবেষক (শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমন্বিত) এই ল্যাবে করোনা পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্‌-ফোরকান, সহযোগী অধ্যাপক ড. লায়লা খালেদা, প্রভাষক জিবরান আলম, একই বিভাগের এমফিল গবেষক ডাঃ শুভ দাশ, অমিত দত্ত এবং গবেষণা সহকারী ইনজামামউল ইসমাঈল শাওন। সেই সঙ্গে দক্ষতা আদান প্রদানের জন্য এবং ল্যাবের জৈবনিরাপিত্তা নিশ্চিত করতে চমেক টিমের সঙ্গে  কাজও করছেন।

চট্টগ্রামে প্রথম বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজে (বিআইটিআইডি) নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়। এরপর গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু) ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়। আর সর্বশেষ ল্যাব স্থাপিত হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক)।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে জানা যায়, চমেকের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে স্থাপিত ল্যাবে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে দেয়া করোনা সম্পর্কিত নিরাপত্তার নিয়ম-কানুনে বলা হয়েছে, এই কাজে সংশ্লিষ্ট সবার পিপিই প্রয়োজন। যেখানে থাকবে একটি ফেসশিল্ড, নির্দিষ্ট ডিজাইনের চশমা, এন ৯৫ মাস্ক, সুরক্ষা পোশাক, দুটি গ্লাভস এবং শু-কাভার। 

কোভিড আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং পরীক্ষা করতে গিয়ে নিজেরাও অসুস্থ হয়ে পড়ার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। 

ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এই কাজে জড়ানোর কারণ জানতে চাইলে বিভাগের শিক্ষার্থী অমিত দত্ত বলেন, ল্যাবরেটরিতে এ ধরনের কাজ আমরা নিয়মিত করে থাকি। শনাক্তের কাজ আর রোগীর সেবা দেয়া আলাদা বিষয়। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতাকে কাজ লাগানোর সুযোগ পেয়েছি, যার জন্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিজেকে সম্পৃক্ত করা। দেশের জন্য, নিজের আনন্দের জন্য। 

গবেষক দলের একজন জিবরান আলম। চমেক ল্যাবের করোনা পরীক্ষায় তিনিও অংশ নিয়েছেন। ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। যার অন্যতম কারণ আগের থেকে এখন পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে। যতো বেশি পরীক্ষা করা যাবে ততই ভালো। আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত করে সঠিক চিকিৎসা সেবা দিতে পারলে রোগ ছড়ানোর মাত্রাটা অনেকাংশেই কমে আসবে। 

এমন সংকটকালে মানবিকতাকে যদি নিজের দক্ষতার সঙ্গে যোগ করতে না পারা যায়, তাহলে জীবনের শেষান্তে দেখা যাবে কিছু নেই। বলছিলেন ড. লায়লা খালেদা। 

আমাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখছি। সেই সঙ্গে আমাদেরকে পিপিএসহ আনুসাঙ্গিক সুরক্ষা বস্তু দিয়ে এগিয়ে এসেছেন অনেকে। 

তার মতে, এই বৈশ্বিক দুর্যোগের সময় যেহেতু আমাদের দেশে করোনা টেস্ট ল্যাব সংখ্যার স্বল্পতা রয়েছে। গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের বিভাগের USDA-ফাংশনাল জিনোমিক্স ল্যাবের শিক্ষক ও গবেষকরা উপাচার্যের অনুমতিক্রমে চমেকে আরটি পিসিআর ল্যাবে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের কাজ করছি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োসেফটি (লেভেল-৩) সুরক্ষিত ল্যাব স্থাপিত হলে কারোনা পরীক্ষা ছাড়াও ভবিষ্যতেও এমন ক্রান্তিকালীন সময়ে কাজ করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।

দীর্ঘদিন থেকে চমেকে বিভিন্ন বিষয়ে ল্যাব গবেষণায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্‌-ফোরকানের। 

তিনি ডেইলি বাংলাদেশকে বলছিলেন, চমেকে যখন করোনা পরীক্ষার কথা জানলাম তখন আমরা কাজ করতে আগ্রহী হই। এবং চমেকের এই ল্যাবে সহযোগী হিসেবে সবাই কাজ করছি।

চবিতে করোনা পরীক্ষার সুযোগ না থাকার বিষয়ে ড. ফোরকান বলেন, আমরা আশা করছি দ্রুত সম্ভব ক্যাম্পাসে করোনা পরীক্ষা শুরু হবে। ভিসি ম্যাম এ বিষয়ে চেষ্টা করছেন। আমাদের নিজস্ব ল্যাব রয়েছে যার জন্য করোনা টেস্টের সংখ্যা আরো বেশি বাড়াতে পারবো। বায়োসেফটি (লেভেল-৩) সুরক্ষিত ল্যাব স্থাপিত হলে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে যারা এই কাজে আগ্রহী। ফলে তারাও অংশ নিতে পারবে। 

এদিকে আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে করোনা টেস্টের অনুমতি সংক্রান্ত একটি চিঠি স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে।

যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় বায়োসেফটি (লেভেল-৩) সুরক্ষিত ল্যাব স্থাপন করে দেয় তাহলে বাইরে থেকে নমুনা এনে পরীক্ষা করতে পারবেন বলে জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম