জীবন্ত কবিতা আলমগীর রেজা চৌধুরী

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৭ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৪ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪১

Akash

জীবন্ত কবিতা আলমগীর রেজা চৌধুরী

রনি রেজা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২২ ১০ মার্চ ২০২০  

আলমগীর রেজা চৌধুরী। ছবি: কবির ফেসবুক থেকে

আলমগীর রেজা চৌধুরী। ছবি: কবির ফেসবুক থেকে

জীবনযুদ্ধে কবির একমাত্র অনন্য যুদ্ধাস্ত্র কবিতা। এই একটিমাত্র অস্ত্র দিয়েই নিজেকে ভাঙেন, গড়েন এবং আবিষ্কার করেন নতুন নতুন রূপে। জীবন-যাপনের নানা গল্প উঠে আসে কবিতার স্বরে। আমাদের দৈনন্দিন গল্পগুলোই উপস্থাপন করেন ভিন্ন রূপে। ভিন্ন স্বাদ থাকে সেখানে। সুভাস ছড়ায়। পরিচিত গল্পগুলো পায় অধরা অপ্সরীর রূপ। তৃষ্ণা জাগায়। তৃষ্ণা মেটায়।

এটা কবির ছোঁয়ায় হয়। তিনি তো শিল্পী। আবেগের তুলিতে আঁচড় কাটেন নরম হাতে। আবার প্রয়োজনে শিল্পের ছুরি মেরে কঠিন পাথরকে দেন জীবন্ত কুমারীর রূপ। পাঠক তা আস্বাদন করে আপ্লুত হয়। খুঁজে ফিরে নিজেকে। কবি হন সিদ্ধ। এ পর্যায়ে কবি নিজের মধ্যে থাকেন না। হয়ে ওঠেন জীবন্ত কবিতা। পরশ পাথরের মতো যাই স্পর্শ করেন সেটিই পায় কবিতার রূপ। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, এ পর্যন্ত পৌঁছাতে কতটা পথ পেরোতে হয়? বা বর্তমান সময়ের ক’জন কবি সেটি পারেন এবং পেরেছেন। চারপাশে তো প্রতিনিয়ত অনেক কবি ও কবিতার জন্ম হচ্ছে। পাঠকের বোধগম্য কবিতা কি সব কবি লিখতে পারছেন? কালোত্তীর্ণ কবিতা বা বহমান কাব্যসুর ক’জনার কবিতায় পাওয়া যায়? এ জবাবে একটি যুৎসই নাম আলমগীর রেজা চৌধুরী। যার মধ্যে উপরন্তু সবগুলো গুণই পাওয়া যায়। ৬৫ বছরের এ মানুষটি সাহিত্যের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছেন প্রায় ৪৪ বছর। বিচরণ করেছেন সাহিত্যের প্রতিটি শাখায়। কিন্তু তার প্রতিটি সৃষ্টিতেই রয়েছে কাব্যশৈলী।

তার ‘ঊর্মিলা নগরে থাকে’ উপন্যাসটি পাঠে পূর্ণ কবিতার স্বাদ মেলে। তিনি লিখেছেন- ‘তুমি যে গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছ সেখানকার মানুষ, প্রকৃতি ও বৃক্ষলতা তোমাকে রক্ষা করেছে। এখন তুমি শহরে...। শহর সর্বক্ষণ তোমাকে গ্রাস করার ফাঁদ পেতে আছে।’ সরল ও সাবলীল এ লাইন দুটি কি কবিতা নয়? ‘তার শালিকচ‚ড়ার বিন্দুবালা’, ‘দিন যাপনের গল্প’, ‘চন্দ্রাহত’ গল্পগুলো পাঠেও আমার এমনটি মনে হয়েছে।
এবার আসা যাক নিজেকে নির্মাণের বিষয়ে। দশক হিসেবে আলমগীর রেজা চৌধুরী সত্তর দশকের কবি। সত্তর দশকে প্রবল হয়ে ছিলো দেশপ্রেম। আশির দশকে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিকঘূর্ণাবর্তে চঞ্চল। তার প্রথম দিকের কবিতা পাঠে এগুলোর উপস্থিতি স্পষ্টই টের পাওয়া যায়।
‘যুদ্ধংদেহী পরিবেশ তেড়ে এসে ঘুম ভেঙে দিয়ে যায় প্রতিদিন
আমি মুয়াজ্জিনের আযান শুনিনি, দেখিনি ভোরের সুষমামÐিত দৃশ্যাবলী।
চোখে রগড় কাটতে দৃশ্যমান সামরিক কনভয় ছুটে যায়-
কঙ্কিত মুখ, বয়ার্ত জীবন থেকে যে কেউ পালাতে পারে অনায়াসে
শুধু কিছু মানুষ পারে না। ভালোবাসার মোহন স্বপ্নছায়া...’
উপরোক্ত লাইনগুলি তারই স্বাক্ষী।

সময় গড়িয়ে নব্বইয়ে এসেও কবি নিজেকে ভেঙেছেন। নব্বইয়ের কবিতাকে বলা হয় আত্মোপলব্ধির কবিতা। কবি মাহবুব কবীর তার ‘নববইয়ের কবিতা’ সংকলনের ভ‚মিকায় লিখেছেন, নববই দশকের কবিতায় একধরনের শিল্পগুণ সমৃদ্ধ, সমাজ নিরপেক্ষ- ঐতিহ্যে অর্ন্তমুখিন ধারা প্রবাহিত হয়েছিলো। এসময়ের কবিতায় প্রচল ছন্দের বাইরে বেরিয়ে নতুন সমীক্ষাধর্মী একটি গদ্য ভাষ্য-ধারার কাব্য শৈলী নির্মাণের প্রবণতা দেখা যায়; যেখানে ধ্বনিময়তার প্রাবল্য ছিল স্পষ্ট। তার ভাষায়, নববই দশকের কবিতায় আদর্শবোধের উদ্দেশ্যহীনতা, ব্যক্তিগত অনুভ‚তি, কবিকৃতির উগ্রতা, নৈঃসঙ্গ্যবোধ প্রভৃতির প্রকটতা দেখা যায়। পূর্বের দশকগুলোর মতো, এই একুশ শতকের প্রথম দশকের বাংলাদেশের বাংলা কবিতায়ও চলমান দেশীয় ও বিশ্ব-বাস্তবতার প্রভাব পড়েছে। অতীতে বিভিন্ন দশকের কবিতা থেকে যেমন বিশেষ কিছু প্রবণতা চিহ্নিত করা গেছে, তেমনি একুশ শতকের প্রথম দশকের কবিতায়ও কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন- কবিতায় অর্থহীনতা, কবিতার মধ্যে পারস্পরিক দ্ব›দ্ব ও বিমুখতা, ছন্দহীনতা ইত্যাদি। আলমগীর রেজা চৌধুরীর উপস্থিতি এখানেও রয়েছে। তিনি লিখেছেন- ‘নির্ঘুম নগরী এক/ শতাব্দী জুড়ে যেন এমন ছিলো/ কাজ ছিলো, শ্রম ছিলো/ ভালোবাসা-মমতা-প্রীতি এবং পরাজয়/ চলমান পৃথিবী জুড়ে মৃত্যুর নির্জনতা...।

আরো লিখেছেন, ‘এতোটা অবুধ হতে নেই বালক/ ঐ যে দ্রাবিড়সম্ভূত জনপথ দিয়ে ধেয়ে আসে/ গেরুয়া স্পর্টান/ ওরা তোমার সহযাত্রী, অনাদি অতীতের/ অনুগত দাস, নিসর্গেও ক্লীব সন্তান/ ঘর্মাক্ত চামড়ায় টান টান ক্ষিপ্র পেশী/ চিনে রাখো...।

সর্বশেষ প্রথম দশকে এসেও তার শক্ত উপস্থিতি পাওয়া যায়। প্রথম দশকের কবিতা নিয়ে কবি তালাশ তালুকদার লিখেছেন, শূন্য দশকের (প্রথম দশক) কবিতার প্রধান অর্জন হলো চিত্রাত্মকতা, বিমূর্তায়ন, চমকপনা ও কখনো কখনো জীবনমুখী হয়ে ওঠার প্রয়াস। এ সূত্র ধরে এগোলে আলমগীর রেজা চৌধুরীর বর্তমান প্রতিটি কবিতাই এ সাক্ষ্য দেয়। তার ২০১৭ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত ‘অতন্দ্রিলা ঘুমাওনি জানি’ বইয়ের প্রতিটি কবিতাই জীবনমুখী। পাঠকালে যে কারোরই এক তরুণ প্রথম দশকের কবির চিত্র আঁকতে হবে। কোনোভাবেই বোঝা যাবে না এটি সত্তর দশকের কোনো কবির লেখা।

কবি তার কাব্যনুভুতি ব্যক্ত করেছেন এভাবে- ঘাটাইল উপজেলার ধলাপাড়া নামক গ্রামে আমার জন্ম। পাশঘেঁষে বয়ে পাহাড়ি নদী বংশাই। স্রোতস্বিনী। বর্ষায় জল শোঁ শোঁ করে নদীতে পড়ে। উত্তর থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীর দু’কূল উপচে জল পড়ে। জলে আসে পলি। বনভূমির নিম্নাঞ্চলে বিস্তৃত বিল। বিলে আসে মাছ। তারপর জল চলে যায়। চারপাশে ধান গাছের ফলবান চারা সাম্বা নৃত্যের মতো দোল খায়। পূর্বে প্রাচীন গোবিন্দপুর শহর হয়ে রাস্তা চলে গেছে গুপ্ত বৃন্দাবনের দিকে। উত্তরে মধুপুর গড়ের মহা বেষ্টনী। আদিবাসী পল্লীর খোল-করতালের দ্রিমিকি দ্রিমিকি শব্দ। বংশাইর ওপর আদ্যিকালের এক লোহার সাঁকো আছে। ব্রিটিশদের তৈরি। সরু। ওই রাস্তা ডিস্ট্রিক বোর্ডের। পশ্চিমে রাস্তার বনভ‚মির চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ঘাটাইল থানার দিকে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মূল রাস্তার সঙ্গে মিশেছে। দক্ষিণে দেওপাড়ার বনভ‚মির নিবিড়তম স্নিগ্ধতা।

তারপরও বংশাইর জলের প্রতি ছিলো যত মুগ্ধতা। জলকেলিরত দুরন্ত বালকের আবেগ। কল্লোলিত জল ভেঙে দাঁড় টেনে নৌকোর মাঝি গায়, ‘কে যাইরে ভাটি গাঙ বাইয়া’। না মাঝির সঙ্গে দেখা হয় না। নতুন এক মাঝি পালতোলা নৌকায় বৈঠার ছলাৎ শব্দ করে নদীর বাঁকে হারিয়ে যায়। পাশের মৌডাল গাছের ডালে ঝাঁক ঝাঁক টিয়ে এসে বসে। ওড়াওড়ি করে। একদিন অনুভব করি আমি এক কবিতা কুমারীর প্রেমে পড়ে গেছি। এ বড় কঠিন পিরিত। এ পিরিতই আমায় কবি বানিয়েছে।’

সৃষ্টি ধরে এগোলে এরকম অস্যংখ্য উদাহরণ সামনে আসবে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর মেলায়ও এসেছে দুইটি বই। চির তরুণ এ কবি সাহিত্যের উঠোনে শব্দের ফুলঝুড়ি ছড়াচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ঋদ্ধ করছেন পাঠকদের। এ কেবল বিশাল হৃদয়ের অধিকারী হলেই সম্ভব। আর এ বিশাল মানুষটিকে নিয়ে নিশ্চয়ই ক্ষুদ্র এ আলোচনা যথেষ্ঠ নয়। বরং এ এক দুঃসাহসিক কাজ। গুরুজনের আস্কারায় এমন সাহস দেখানোই যায়। কৃতজ্ঞতা কবির প্রতি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর