জীবনজুড়ে শপথ হোক বইপাঠের

ঢাকা, বুধবার   ০১ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ১৮ ১৪২৬,   ০৭ শা'বান ১৪৪১

Akash

অমর একুশে বইমেলা

জীবনজুড়ে শপথ হোক বইপাঠের

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:২৮ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:২৯ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

ভাষা আর বইয়ের মাস ফেব্রুয়ারি। এ মাসে চারদিকে হয় ভাষা ও বই নিয়ে আলোচনা। বইয়ের লেখক এবং বইয়ের যতোসব কথা নিয়েও চলে আলোচনা। 

বই মানুষের অবসরের সঙ্গী, কথা বলার উত্তম বন্ধু। পৃথিবীতে বই-ই একমাত্র বন্ধু, যার সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়। বই শিক্ষিত সমাজের বন্ধু ভাই। বই মানেই শিক্ষার প্রতি মায়া ও মমতাবোধ। ইসলাম এমন একটি ধর্ম যারা শুরুটা হয়েছে ‘পড়ো’ নামক আদেশসূচক শব্দ দ্বারা। পবিত্র ঘোষণা হচ্ছে,

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ () خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ () اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ () الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ () عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ

অর্থাৎ: ‘পড়ুন আপনার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। আর আপনার প্রভু অনেক সম্মানিত ও  দানশীল। যিনি মানুষকে কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে এমন সব বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা  সে জানত না।  (সূরাতুল আলাক : আয়াত নম্বর  ১-৫)।

এই ধর্মের শুরুটা হয় পাঠ করার দ্বারা। পড়া আর পড়া এই ধর্মের মূল বিষয়ের সঙ্গে সংযুক্ত। পাঠের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে কোরআনের অন্যত্রে বলা হচ্ছে,

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ

অর্থাৎ: ‘হে নবী! আপনি বলুন যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? উপদেশ গ্রহণ করে একমাত্র জ্ঞানীগণই। (সূরাতুয যুমার : আয়াত নম্বর: ৯)।

এভাবে ইসলাম ধর্মের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে জ্ঞানী হও, জ্ঞান আহোরণ করো, জ্ঞানীদের সঙ্গে চলো। মোটকথা জ্ঞান অর্জন সদা-সর্বদা উৎসাহিত করছে ইসলাম। আর সেই জ্ঞানার্জনের আবশ্যক মাধ্যম হলো বই।

জানার বহু মাধ্যমের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হলো বই। বই মানুষের মনের খোরাক জোগায়। বই পড়া ব্যতীত মানুষ সত্যিকারার্থে সফলতার আলোয় আলোকিত হতে পারে না। বই পড়লে মস্তিষ্ক চিন্তা করার খোরাক পায়, সৃষ্টি করার যোগ্যতা বাড়ে এবং জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়। বই পড়লে মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিকমনস্ক হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে যারা জগদ্বিখ্যাত সফল মানুষ হয়েছেন, তারা বই পড়েই বড় হয়েছেন। পৃথিবীর যে কোনো বরেণ্য মনীষীর জীবনী পড়লে আমরা এমনটিই জানতে পারি।

আমাদের বিশ্বাসের স্তম্ভ হলো আল কোরআন। তাতে রয়েছে ৬৬৬৬টি আয়াত। যারা সূচনাটা হয়েছিল ‘পড়ো’ দিয়ে। তারপর প্রাসঙ্গিকক্রমে ৯২ জায়গায় জ্ঞানচর্চা বইপড়া গবেষণা সংক্রান্ত ঘোষণা এসেছে। আরো মজার বিষয় হলো আমাদের ‘কোরআন’ এই ‘কোরআন’ এর একটি অর্থও কিন্তু অধ্যয়ন বা পাঠ করা।

যখন কোরআন নাযিল হতো তখন রাসূল কোরআন দ্রুত আয়ত্বে করতে তৎপর হয়ে উঠতো। তখন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا

অর্থাৎ: ‘হে নবী! আপনি তাড়াহুড়া করবেন না কোরআনকে আয়ত্ব করতে ওহি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত। তবে দোয়া করতে  থাকুন হে প্রভু! আমার ইলম বৃদ্ধি করে দাও।  (সূরাতুত্বহা : আয়াত নম্বর ১১৪)।

এবার আমরা হাদিসের লক্ষ্য করবো; হাদিসে রাসূলের মধ্যে পড়া অধ্যয়ন ও গবেষণার প্রচুর তাগিদ রয়েছে। জ্ঞানার্জনের জন্য বাধ্যতা আখ্যায়িত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عن أنس بن مالك قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم  طلب العلم فريضة على كل مسلم

‘হজরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য।’ (ইবনে মাজাহ : হাদিস নম্বর ১২৪)।

আরেক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্ঞান আহরণের গুরুত্ব দিয়ে বলেন জ্ঞান আহরণের জন্য তোমরা চীন হলেও যাও (যত দূর ইচ্ছে যাও) আর জ্ঞানকে মগজে ভরতে যে বস্তুর প্রয়োজন তা হলো বই। বই-ই পারে জ্ঞানহীনকে জ্ঞানী বানাতে। বই পাঠই পারে একটি সমাজকে শিক্ষিত করে তুলতে। পিতা-মাতা যদি ছোট্ট বয়স থেকে সন্তানদের পাঠের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে সে কখনো সমাজের বখাটেদের সঙ্গে মিশবে না।

কারণ, বখাটে বা ছন্নছাড়া কারা হয়? মূর্খতা যাদের মগজে বাসা বাঁধে তারাই সমাজের বখাটে ও অপরাধ প্রবণ হয়। এর বিপরীতে যাদের মগজে মধ্যে বই পাঠ মিশে যায়, তাদের কোনো কাজ না থাকলে বই পড়ে। এর বিপরীতে অন্যরা বই পড়ায় গুরুত্ব দেয় না। অথচ বইয়ের গুরুত্ব দিতে হয়। 

মাওলানা মুনীরুল ইসলাম এর লেখা থেকে উদ্বৃতি করছি, বই পড়ার গুরুত্ব আমরা বুঝতে পারি দার্শনিক ওমর আল খৈয়াম এর একটি উক্তি থেকে। মাওলানা বলেন, ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু একটি বই অনন্ত যৌবনা- এমনিভাবে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন দার্শনিক মনীষীরা অনেক মূল্যবান উক্তি করেছেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমাকে মারতে চাইলে চাকু ছুরি কিংবা কোনো পিস্তলের প্রয়োজন নেই, বরং আমাকে বইয়ের জগৎ থেকে দূরে রাখো।’ নর্মান মেলর বলেন, ‘আমি চাই যে বই পড়া অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়।’ টলস্টয় বলেন, ‘জীবনে তিনটি জিনিস খুবই প্রয়োজন। তা হলো বই, বই এবং বই।’

বর্তমানে আমাদের কাছে বই থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু মোবাইল ফোন, আইপ্যাড, ল্যাপটপ, দামি খেলনাসহ অনেক কিছু। বই যে সদা প্রসঙ্গ ও অনুগামী এটা এখন অনেকটা কল্পনার বিষয়। এখনকার ছেলে-মেয়েদের যদি বলা হয় হাঁটতে ঘুরতে তোমরা বই পাঠ করবে; তারা অবাক হয়! এটা কি কথা? অথচ উন্নত বিশ্বে দেখা যায়; ট্রেন, বাস, রেলস্টেশনে যেখানেই সময় পাচ্ছে তারা বই পড়ছে। সেখানে বড় বড় শপিং মলে নানা রকম শোরুমের পাশাপাশি বইয়েরও মনকাড়া শোরুম থাকে।

শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হলো, পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো বই আমাদের সন্তান কিংবা ছাত্রদের পড়তে দিতে চাই না। পড়াশোনার ক্ষতির কথা বলে তাদেরকে বই কেনা থেকে বিরত রাখা হয়। এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে এসে ছোটবেলা থেকেই তাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

চলছে ভাষার মাস। বইয়ের মাস। আসুন বইপাঠের শপথ করি। পাঠের মধ্যে ইসলামী বই যোগ করি। আমাদের জ্ঞানকে ধর্মীয় চেতনায় শানিত করি। তাহলে এই ফেব্রুয়ারির আবেদন আমাদের বাস্তব জীবনে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে