.ঢাকা, বুধবার   ২০ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৫ ১৪২৫,   ১৩ রজব ১৪৪০

জাপায় ফের ষড়যন্ত্র, দ্বন্দ্ব সৃষ্টির পাঁয়তারা

কাজী লুৎফুল কবীর ও সোহেল রাহমান

 প্রকাশিত: ১৫:২১ ১৪ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ০১:৪৯ ১৫ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

 

বিরোধী দলের শক্ত অবস্থানে থেকে ক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে সক্রিয় হতে চায় জাতীয় পার্টি (জাপা)। সে লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে তারা। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পরাজিত একটি শক্তি ও সুবিধা লোভীরা পার্টির ভেতর বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে নেমেছে। আর তা বুঝতে পেরে পার্টির চেয়ারম্যানও নড়েচড়ে বসেছেন। সংসদ এবং দলের যোগ্য পদে বসাতে চান তার বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজনদের। সে প্রক্রিয়ায় কাজও শুরু করেছেন এরশাদ। শিগগিরই মহাসচিব পদে আনতে চান পরিবর্তন।

সহিংসতার পরিবর্তন ঘটিয়ে টানা দু’দুবার বিরোধী দলের ভূমিকায় এরশাদের জাপা। ২০১৪ সালে সহিংস রাজনীতির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে প্রথমবার বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করে সাবেক রাষ্ট্রপতির দলটি। সংসদে দীর্ঘদিন চলমান বিরোধী দলের সংস্কৃতি পাল্টে দিয়ে নতুন ধারার প্রচলন ঘটায় তারা। টেবিল চাপড়া-চাপড়ি, ফাইলপত্র ছোঁড়াছুড়ি, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ ও সংসদ বর্জনের অপসংস্কৃতি পায়ে ঠেলে বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেন জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ।

সেই ধারায় এবার পূর্ণাঙ্গ বিরোধী দলের ভূমিকায় সক্রিয় হয়েছে জাপা। তবে বিরোধী নেতায় এসেছে পরিবর্তন। দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, ৯ বছর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকা এরশাদ হলেন একাদশ সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা। আর বিরোধী উপনেতার দায়িত্ব পেয়েছেন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক খ্যাত জাপার কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জিএম কাদের)। যাকে নিয়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকরা দেখেন নতুন স্বপ্ন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মধ্যদিয়ে আগামীতে ক্ষমতায় আসার বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে এরশাদের জাতীয় পার্টি। তবে তারা বলছেন, দলের ভেতর লুকিয়ে থাকা দুষ্ট ও ব্যক্তিস্বার্থ লোভী চক্র সেই পথে বাধা হতে পারে। সংসদের বাইরে থাকা শক্তির এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে পার্টির ওই চক্রটি। জনগণের পক্ষে সক্রিয় থেকে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগটি হাতে ধরে নষ্ট করতে পারে তারা।

ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতা ও ভুল কাজের যৌক্তিক সমালোচনার মাধ্যমে জনগণের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে পারলেই তৈরি হতে পারে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রেক্ষাপট। আর তাতেই একটি দলের ব্যর্থতায় ক্ষমতার হাল ধরতে পারে আরেকটি দল। সে হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষতা, শান্তি ও সততার দৌড়ে এগিয়ে আছে জাতীয় পার্টি। তাই জাপার তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যন্ত আরো দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করে শক্ত অবস্থানের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

এদিকে জাপার মধ্যম সারির কয়েকজন নেতা জানান, বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থান নিয়ে তারা অখুশি। দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতা ও এমপির কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, পার্টি ও সংসদে নিজেদের ভালো অবস্থান না থাকায় তারা মনোক্ষুণ্ন। এছাড়া সাবেক মহাসচিব চুপচাপ থাকায় তার মনের অবস্থা বোঝা যাচ্ছে না বলেও দাবি করেন অনেকে। তবে মাঠ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে হাতেগোনা কিছু নেতা বাদে সবাই আশাবাদী। ২৮ বছর পর জাপা আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেল বলে মনে করেন নেতাকর্মীরা।

এদিকে নির্বাচনের পর মতামতের সুযোগ না রেখে স্পিকার বরাবর চিঠি দিয়ে এরশাদ নিজেকে বিরোধী দলীয় নেতা এবং সহোদর জি এম কাদেরকে সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা করায় সমালোচনা মেতেছে দলের একটি অংশ। এতে এরশাদ ও রওশনের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে বলে প্রচারণা চালাচ্ছে ওই অংশটি। এ কারণে সংসদে এরশাদের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করে পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও সদ্যবিদায়ী বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ সংসদ সচিবালয়ে চিঠি দেবেন বলেও প্রচার করছে স্বার্থান্বেষী ওই মহলটি। আর তাতে সমর্থন যোগাচ্ছেন মন্ত্রী না হতে পারা কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য। বিরোধী উপনেতাসহ বেশ কিছু পদের প্রত্যাশায় ছিলেন দীর্ঘদিন সুবিধাভোগী ওইসব নেতা। রওশন এরশাদকে রাজনীতিতে সরব রাখতে না পারায় কাঙ্ক্ষিত পদ-পদবী বঞ্চিত হতে হয়েছে বলে মনে করেন ওই নেতারা। তাই নতুন মিশনে নেমেছে তারা। তাদের অনেকের ধারণা পরবর্তীতে জি এম কাদেরকেই সংসদে বিরোধী নেতা বানাতেই উপনেতা করেছেন এরশাদ।

জাপাকে শক্তিশালী করতে কি উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, এমন প্রশ্নে জি এম কাদের বলেন, রাজনীতিতে কিছু কৌশলগত বিষয় আছে, সে বিষয়গুলো যে পার্টি সঠিকভাবে বুঝবে, তারাই দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তিনি বলেন, ১০ বছর আগের ধারণা রাজনীতিতে এখন অচল। ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি আর ভাগবাটোয়ারার রাজনীতির দিন শেষ। তিনি আরো বলেন, জাপা যে রাজনীতি করে মানুষের মনে এখনো টিকে আছে, সেই উন্নত ধারার রাজনীতির দিন আসছে সামনে। 

জিএম কাদের বলেন, দেশ উন্নত হচ্ছে। মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে। তাদের নেতৃত্ব দিতে হলে, জ্ঞান অর্জনের বিকল্প নেই। ব্যক্তি বা শুধু দলের স্বার্থে রাজনীতি করে কেউ টিকবে না। মেধাবী, সৎ ও জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজনীতিতে আসতে হবে।

বিরোধী দলীয় উপনেতা বলেন, আজকের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম সততা, উন্নয়ন ও শান্তিতে বিশ্বাসী। এখন দেশের ১৬ কোটি মানুষই জ্ঞানী। জাপা সেভাবেই রাজনৈতিক কাঠামো সাজাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি দাবি করেন, জাপার অবস্থান দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াবে। বিশ্বমানের রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় জাপা যোগাযোগ সম্পর্ক উন্নয়ন বাড়িয়েছে। জনগণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যই জাপাকে সেই পথে এগিয়ে নেবে।

জাপায় চক্রান্ত বা বিভ্রান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, জাপায় কোনো বিভক্তি নেই। কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রের সুযোগ নেই। নেতাকর্মীরা চায় চেইন অব কমান্ডের মধ্যে থেকে পার্টিকে শক্তিশালী করতে।

মহাসচিব বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও পার্লামেন্টারি পার্টির সদস্যরাসহ সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচন এবং সংসদে বিরোধী দল হওয়াসহ সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি জোরালোভাবে দাবি করে বলেন, পার্টিতে চেয়ারম্যান, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও জি এম কাদেরের মধ্যে কোনো বিভক্তি বা দ্বন্দ্ব নেই।

মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, চেয়ারম্যান, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও কো-চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করছি। পার্টির মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে জাপাকে দুর্বল করা যাবে না।

এদিকে ফের মহাসচিব পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে জাপায়। পার্টির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দলের নির্বাহী পরিচালকের এই পদে এবারো এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের উপরই ভরসা রাখতে চান জাপা চেয়ারম্যান। পার্টির সিনিয়র নেতা ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন এরশাদ। তিনি মনে করেন, তার চোখের ভাষা বোঝেন হাওলাদার। আর দল পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয়ও দিয়েছেন হাওলাদার।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে তুমুল বির্তক তৈরি হলে ভোটের আগ মুহূর্তে হাওলাদারকে সরিয়ে মহাসচিব করা হয় এরশাদের ভাগ্নে বলে পরিচিত মশিউর রহমান রাঙ্গাকে। নতুন মহাসচিব নিয়োগের বেশ কয়েকদিন পর এরশাদ সিঙ্গাপুর থেকে রুহুল আমিন হাওলাদারকে পুনরায় বড় দায়িত্ব দেন। চেয়ারম্যানের অবর্তমানে হাওলাদার সাংগঠনিকভাবে তাই ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবেন, ঘোষণা দিয়ে বিশেষ সহকারী করেন এরশাদ।

এতে কিছুটা উদ্যোগীও হয়ে ওঠেন হাওলাদার। কয়েকদিনের হতাশা ও নিরবতা ভেঙ্গে সক্রিয় হন তিনি। নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন সাবেক এই মহাসচিব। কিন্তু এরশাদের সহোদর জিএম কাদেরকে দলের ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান ঘোষণায় ফের কর্মহারা হন হাওলাদার। বর্তমানে অনেকটা নীরবে-নিভৃতে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। সরকারি অর্থ পাওনার অভিযোগে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় অনেকদিন পর এবার সংসদের বাইরে আছেন রুহুল আমিন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চেয়ারম্যানের বেশ কয়েকজন ব্যক্তিগত স্টাফ ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, কৌশলী এরশাদ পুনরায় মহাসচিব পদে হাওলাদারকে বসানোর পথ খুঁজছেন। কারণ এরশাদের ইশারা ইঙ্গিত একমাত্র হাওলাদারই ভালো বোঝেন। তাছাড়া এরশাদের বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজনও তিনি। এর আগেও একবার হাওলাদারকে সরিয়ে বাবলুকে মহাসচিব করা হয়। কিন্তু তা টেকেনি কয়েক মাসের বেশি। পরে বাবলুকে সরিয়ে পুনরায় মহাসচিব পদে আনা হয় হাওলাদারকেই।

এরশাদের নতুন চিন্তা-ভাবনার বিষয়ে পার্টির শীর্ষ কয়েকটি সূত্র জানায়, পুরাতন পথেই নতুন করে হাঁটছেন জাপা চেয়ারম্যান।  এরইমধ্যে মশিউর রহমান রাঙ্গাকে সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নিযুক্ত করা হয়েছে। সেই ধারায় ফের মহাসচিব পদে আনতে চান হাওলাদারকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস.আর/এসআই/এলকে