Alexa জাগ্রত দেবীর পায়ে বলি দেয়া হতো মানুষ!

ঢাকা, শনিবার   ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২২ ১৪২৬,   ০৯ রবিউস সানি ১৪৪১

জাগ্রত দেবীর পায়ে বলি দেয়া হতো মানুষ!

দেলোয়ার হোসেন, জামালপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:২৮ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২১:০৬ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

কোনো এক রাতের প্রাচীন এক বেলগাছের তলায় মাটি ফুঁড়ে বের হয় দেবী দয়াময়ীর মূর্তি। ঠিক ওই রাতেই ওই এলাকার জমিদার ভবানী শঙ্কর সেন স্বপ্নযোগে আদিষ্ট হন দেবী মূর্তির আবির্ভাবস্থলে মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য। এরপর থেকেই জাগ্রত এ মন্দির হাজারো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। জাগ্রত দেবীর পায়ে বলি দেয়া হতো মানুষ। এমনই জনশ্রুতি রয়েছে এ মন্দিরকে ঘিরে। 

বলছি, জামালপুর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় নিদর্শন শ্রী শ্রী দয়াময়ী মন্দির সম্পর্কে। দয়াময়ী মন্দিরকে ঘিরে অনেক অলৌকিক ঘটনার কথা প্রচলন রয়েছে। শহরের বৃদ্ধ অজিত সোম জানান, আগে এ মন্দিরে জাগ্রত দেবীর পায়ে জ্যান্ত মানুষ বলি দেয়া হতো। এখন আর তা হয় না। তবে পাঠা বলির প্রচলন রয়েছে এখনো। 

জনশ্রুতি আছে, পাকিস্তান আমলে একবার মন্দিরে ডাকাত পড়েছিল। মন্দিরের পুরোহিত ডাকাতদের হাত থেকে এর মালামাল রক্ষায় দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন। দয়াময়ী মহাদেব্যা মাতার জাগ্রত শক্তির কারণে ধরা পড়ে ডাকাতরা। তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এ মন্দিরকে জাগ্রত বলে দাবি করেন।

শহরের ৮০ বছরের বৃদ্ধ নারায়ণ চন্দ্র জানান, আদিকাল থেকে জামালপুর দয়াময়ী মহাদেব্যা মাতার জাগ্রত শক্তির মাহাত্মের নানা অলৌকিক কাহিনী শুধু বাংলাদেশে নয় পার্শ্ববর্তী ভারতেও প্রচলিত রয়েছে। এক সময় মনের আশা পূরণের লক্ষ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে অসংখ্য ভক্ত ছুটে আসতেন এ মন্দিরে। ভক্তরা মন্দিরে ছাগ শিশু (পাঠা) বলি দিয়ে পূজা দিতো দেবীর পায়ে। 

মন্দিরের ভেতরের চিত্রপ্রতি বছর মাঘের সপ্তমীতে এখানে মেলা বসে। মেলায় কয়েক হাজার নারী-পুরুষের ভিড় হয়। কলকাতা থেকে নামিদামি যাত্রাদলসহ দেশ-বিদেশের সাধু-সন্ন্যাসীদের মিলনমেলা ঘটে মেলা প্রাঙ্গণে। এছাড়া সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রতিদিনই এখানে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোও এখানে নানাভাবে উদযাপিত হয়। দূর্গাপূজার সময় লাখ লাখ ভক্তের সমাগম হয় মন্দিরটিতে। আবার চৈত্রমাসে ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান উৎসবের পর মন্দির ও তার আশপাশে চার দিনব্যাপী মেলা হয়। 

আরেক বৃদ্ধ অজিত সোম জানান, আগে এ মন্দিরে জাগ্রত দেবীর পায়ে জ্যান্ত মানুষ বলি দেয়া হতো। এখন আর তা হয় না। তবে পাঠা বলির প্রচলন রয়েছে এখনো। 

মন্দিরটি যেভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে 

দয়াময়ী মন্দির

প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে, নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমানে গৌরিপুর রামগোপালপুরের জমিদারের জাফরশাহী পরগণার জায়গীরদার শ্রীকৃষ্ণ রায় চৌধুরী। সেসময় নবাবরা শাসনকাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এলাকাভেদে জায়গীর নিয়োগ দিতেন। জায়গীরদারদের কাজ ছিল এলাকাভিত্তিক শাসন। তাদেরই একজন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ রায় চৌধুরী। 

এলাকার এক বাসিন্দা কৃষ্ণ কর্মকার জানান, লোকমুখে শোনা যায় – শ্রীকৃষ্ণ রায় চৌধুরীর ঔরসজাত সন্তান রাজা যোগেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর সহধর্মিণী ছিলেন রাধারঙ্গিনী দেবী চৌধুরানি। তিনি স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে স্বামীকে মন্দিরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার অনুরোধ করেন। স্ত্রীর অনুরোধে রাজা যোগেন্দ্র কিশোর রায় পরবর্তীতে মন্দিরের মূল অবকাঠামো ঠিক রেখে ব্যাপক উন্নয়ন করেন এবং এর নামকরণ করেন দয়াময়ী মন্দির। পরে এটি দেবতাদের নামে উৎসর্গ করে (দেবোত্তর) এস্টেট হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন রানী শ্রীমতি নারায়ণী রায় চৌধুরী। 

মন্দিরের অবকাঠামো 

জামালপুর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ১৪ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির। এ জেলার দর্শনীয় কারুকার্য্যপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি অন্যতম। প্রায় তিন একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত দয়াময়ী দেবী মন্দির। দেবীর মূল মন্দিরের মেঝের ক্ষেত্রফল ৩০০ বর্গফুট। মন্দিরের সামনেই ছাদ দেয়া বেশ বড় একটি ভবন। বিভিন্ন উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠানে এ ভবনটি ব্যবহৃত হয়। 

মন্দিরের ভেতরের প্রতীমা ঘর

এর পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি শিব মন্দির। শিব মন্দিরের উপরিভাগ গম্বুজাকৃতির। দেবীমন্দিরের প্রধান ফটকের কাছেই রয়েছে আলাদা দুটি কক্ষ। এগুলো নির্মিত হয়েছিল মন্দিরের প্রহরীদের থাকার জন্য। মন্দিরের পূর্ব দিকে রয়েছে বেশ বড় একটি দিঘি। মন্দির স্থাপনের পর প্রতিষ্ঠাতা জমিদার ভবানীশঙ্কর সেন দয়াময়ী দেবী মন্দিরের নামে ১৫ একর জমি রেকর্ড করে দিয়েছিলেন।  

সুষ্ঠু তদারকির অভাবে এ সম্পত্তি অনেক আগেই বেদখল হয়ে গেছে বলে জানা যায়। এমনকি মন্দিরের বিশাল ভবনের ইট, পাথর, দরজা-জানালার মূল্যবান কাঠ লুটপাট হয়ে গেছে। বর্তমানে নিরাপত্তাজনিত কারণে মন্দিরে বিগ্রহানীর অলংকার ও মূল্যবান তৈজসপত্রাদি ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের ট্রেজারিতে জমা রাখা হয়েছে। এছাড়া মন্দিরের নামে দেবোত্তর সম্পত্তির নিজস্ব কাচারি, প্রয়োজনীয় দস্তাবেজ ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার অধিগ্রহণ করে নিয়েছে। 

১৯৯৫ সালের এ মন্দিরের অভূতপুর্ব উন্নয়ন হয়েছে। ওই বছর দয়াময়ী মন্দির, অন্নপূর্ণা, শিব বিগ্রহ, নাট মন্দির ও ভোগ ঘরসহ মন্দির কমপ্লেক্সের দ্বিতল ভবনের ২৭টি কক্ষ পুনঃনির্মাণ করা হয়। এ মন্দিরে শিব, কালি, নাট, মনসাদেবীসহ রয়েছে একাধিক দেবদেবীর মূর্তি।

মন্দিরের বেহাল দশা

সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দয়াময়ী দেবী মন্দির আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে চলেছে। নদীর পাড়ে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটি। মন্দিরের সিংহ দরজা অনেক আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে পাঠা বলির ঘর, কালি মন্দির, শিব মন্দির ও একমাত্র দীঘিটি। কালের বিবর্তনে ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে এ মন্দিরের ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। প্রাচীন নিদর্শন এ মন্দিরটি ধেশের অমূল্য প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ।

জাগ্রত মন্দিরে মানুষের ভিড়যেভাবে যাবেন 

মন্দিরটি দেখার জন্য প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী ও দর্শনার্থীরা এখানে ছুটে আসেন। এটি সকাল ৬টায় খোলা হয় এবং রাত ১০টায় বন্ধ করা হয়। এখানে বর্তমানে চারজন পুরোহিত ও ১২ জন কর্মচারী রয়েছেন। 

ঢাকা থেকে বাসযোগে যেতে পারেন জামালপুর। মহাখালী থেকে ‘রাজীব’ পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে। ভাড়া আনুমানিক ৩০০ টাকা। সেখান থেকে ইজিবাইক বা রিকশা করে সহজে যেতে পারবেন মন্দিরে। এছাড়া, ঢাকা থেকে ট্রেনযোগে সহজেই যেতে পারবেন জামালপুর। কমলাপুর থেকে জামালপুরের ট্রেন রয়েছে সকাল ৭টা ২০ ও ৮টা ২০ মিনিটে। এছাড়া, বেলা ৩টায় ও ৫টায়। শ্রেণিভেদে ভাড়া ১৪০ থেকে ৪০০ টাকা। রেলস্টেশন থেকে ইজিবাইক কিংবা রিকশা করে সহজেই পৌঁছে যাবেন দয়াময়ী মন্দিরে। 

থাকার ব্যবস্থা: থাকার জন্য জামালপুরে পাবেন বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল।

খাওয়া: খাবারের জন্যও জামালপুরে রয়েছে বেশ কিছু হোটেল ও রেস্টুরেন্ট।

ডেইলি বাংলাদেশ/সুইটি/নিশি