Alexa জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন পৃথিবী

ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৪ ১৪২৬,   ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪০

নি য় মি ত ক লা ম

জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন পৃথিবী

 প্রকাশিত: ১৭:৩৭ ১৯ জুন ২০১৯  

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

জলবায়ু পরিবর্তনশীল। এই জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ। যেমন- পৃথিবীর কক্ষপথে ব্যাপক পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরির অগ্নোৎপাত, সৌরশক্তির তারতম্য। 

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য এগুলোই মূল কারণ নয়। এর সঙ্গে রয়েছে আরো অনেক কিছু। বিশেষ করে মানবসৃষ্ট কারণগুলোই এখন প্রধান নিয়ামক হিসেবে আমাদের সামনে চলে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে এর প্রভাব এখন ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে জলবায়ু নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা পূর্বানুমান করে বলেছিলেন বর্তমান জলবায়ুর চিত্র কেমন হতে পারে। বিজ্ঞানীদের সেই অনুমান সঠিক হয়েছে। এখন বর্তমানে জলবায়ু যেমন আচরণ করছে ঠিক তেমনই ধারণা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেই অনুমানের ক্ষেত্রে তারা যেসব বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছিলেন তা হলো- ক্রমবর্ধমান কয়লা, তেল ও গ্যাস অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। এটা সত্যি, আধুনিক জীবন ব্যবস্থায় এসব জ্বালানিই প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এর বিরূপ প্রভাবও লক্ষ্যণীয়। এই প্রক্রিয়ায় পরিবেশে তাপ শোষণকারী গ্যাস জমা হয়ে পরিবেশকে প্রভাবিত করছে প্রতিদিন। এর প্রভাবে প্রতিনিয়ত পরির্বতন হচ্ছে জলবায়ুর। বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর আবহাওয়া।

এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। ১৯৬০ সালে মানে প্রায় ৬০ বছর আগে বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ছিল ৩১৩ পিপিএম। প্রায় ৬০ বছর পর প্রায় একশ ভাগ বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০৭ পিপিএমে। এটা অবশ্যই আমাদের এই বসবাসের পৃথিবীর জন্য উদ্বেগের বিষয়। বর্ধিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউজ গ্যাসের মাত্রাকে মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এক্ষেত্রে। উদ্বেগের আরো বিষয় রয়েছে; প্রতিনিয়ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান হারে জমা হচ্ছে; তাতে জলবায়ুর পরিবর্তন আরও নেতিবাচক হতে থাকবে। এর প্রভাব পড়বে জনজীবনে, বিশ্বজুড়ে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে উষ্ণতা বা তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মেরুদেশের বরফ গলে যাওয়ায় বাড়ছে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা। এছাড়া এর সঙ্গে রয়েছে প্রতিবছর অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, তাপমাত্রার আকস্মিক এবং ব্যাপক ওঠানামার বিষয়গুলো। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের। প্রকৃতির এই খেয়ালীপনায় শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই জনজীবন নানাভাবে প্রভাবিত ও বিঘ্নিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, নিন্মচাপ ও জলোচ্ছ্বাস আমাদের জীবনকে বিস্রস্ত করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের এই স্বাভাবিক চিত্রটি এখন অনেকখানি বদলে গেছে। শুধু বাংলাদেশ বললে ভুল হবে। বিশ্বের অনেক দেশেই এর প্রভাব বিদ্যমান। আর এর বিরূপ প্রভাবে অসময়ে অত্যাধিক তাপমাত্রা, অতি বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্তর বৃদ্ধি ইত্যাদি বহুমুখী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উপরন্তু বাংলাদেশের ইদানিংকালের জলবায়ুতে দৃশ্যমান পরিবর্তনও দৃশ্যমান। 

ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী শিল্পায়নের জন্য কার্বন নিঃসরণ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। বিশ্বকে বাঁচাতে এর জন্য প্রয়োজন কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ হচ্ছে সবুজের বৃদ্ধি। অথ্যাৎ বিশ্বব্যাপী ব্যাপক বনায়ন। কেবল কার্বন নিঃসরণ হ্রাসই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও এই বনায়নের কার্যকর ভূমিকা অপরিসীম। এরইমধ্যে বিশ্বের ধনী ও উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে অনেক সচেতন ও অগ্রগামী ভূমিকা নিয়ে তাদের কাজ শুরু করেছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশও নানা উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে কেবল সরকার নয়, এগিয়ে আসতে হবে আমাদের দেশের শিল্পপতিদেরও। কেননা, প্রতিটি শিল্পকারখানায় কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ হ্রাসের পাশাপাশি কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ কতৃপক্ষকে নিতে হবে। এক্ষেত্রে শিল্পকারখানার মালিকদের এসব বন্ধ করার জন্য বাধ্য করতে হবে। সবুজ ও পরিবেশবান্ধব কারখানা তৈরি, ডেলাইট সেভিং, উপকরণের পুনর্ব্যবহার এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। 

সর্বোপরি জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে পরিত্রাণের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে আরও ব্যাপক হারে বৃক্ষ রোপনের বিকল্প নেই। সবুজের আবরণে ঢেকে দিতে হবে বিশ্বকে। কেননা, ব্যাপক বনায়ন পারে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে আমাদের অনেকটা রক্ষা করতে। তাই ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বনায়নের বিকল্প নেই। তবে এ কাজ শুধু রাষ্ট্র ও বিভিন্ন সংস্থার নয়। ব্যক্তি পর্যায়েও অবদান রাখতে হবে সবাইকে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারে সবাইকে আরও বেশি সাশ্রয়ী হতে হবে। সর্বোপরি সবাইকে বেশি বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। তবে রক্ষা পাবো জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে।    

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর