জলপথ ট্রাজেডি শুধু প্রাকৃতিক কারণে নয়
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=191585 LIMIT 1

ঢাকা, শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২৩ ১৪২৭,   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

জলপথ ট্রাজেডি শুধু প্রাকৃতিক কারণে নয়

 প্রকাশিত: ১৭:৩৭ ২ জুলাই ২০২০  

বীরেন মুখার্জী

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

করোনাকালীন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাছে দেশের মানুষের। এরই মাঝে ঘটে চলেছে প্রাণঘাতি দুর্ঘটনা। দেশে নানান দুর্ঘটনায় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কিছুতেই রোধ হচ্ছে না।

গত সোমবার সকালে ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয়, মানুষ কতটা অসহায়। মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী ছোট ‘লঞ্চ মর্নিং বার্ড’কে ‘ময়ূর-২’ নামের একটি বড় লঞ্চ ধাক্কা দিলে মর্নিং বার্ড ডুবে যায়। এ ঘটনায় ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর কয়েকটি দৈনিক এবং অনলাইনে গত কয়েক বছরের নৌদুর্ঘটনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এসব প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ বছরে ৭০০টি লঞ্চডুবিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ২০ হাজার মানুষ। ২০১৯ সালে নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৮২০টি। এতে মারা ৬৮৫ জন এবং উদ্ধার হন ৬৬৮ জন। ২০১৭ সালে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রকাশিত প্রতিবেদন ৫০ বছরে দেশে নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২০ হাজার ৫০৮ জন। আর ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ ২ হাজার ১৭৭ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে। গত ১৪ বছরে ৫৩৫টি বড় নৌদুর্ঘটনায় ছয় হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল বলে নদী নিরাপত্তাবিষয়ক সামাজিক সংগঠন ‘নোঙর’ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘নদী বাঁচান, দেশ বাঁচান, মানুষ বাঁচান’ বিষয়ে মানববন্ধনে ২০১৯ সালে তথ্য তুলে ধরেছিল। একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের কাছে এর চেয়ে ভয়াবহ তথ্য আর কি হতে পারে!

এক সময় নৌ-পথের দুর্ঘটনার জন্য শুধু প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করা হতো। কিন্তু সংশ্লিষ্টরাই বলছেন, লঞ্চডুবি শুধু প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে নৌ-দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো হলো- লঞ্চের নকশাজনিত ত্রুটি, লঞ্চ চালকের অদক্ষতা, মাস্টার-সুকানির গাফিলতি, ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ-তিনগুণ যাত্রী বহন, নিরাপত্তা আইন অমান্য করা, বাতি বা সার্চলাইট না থাকা, চলার পথে দুই লঞ্চের মধ্যে প্রতিযোগিতা, বেপরোয়া চালানো, আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে না জানা, পর্যাপ্ত লাইফবয়া না থাকা, লঞ্চে ‘কার্বন-ডাই-অক্সাইড সিলিন্ডার’ না রাখা, লঞ্চের কারিগরি ত্রুটি, ফিটনেস না থাকা, উৎসবকালীন সম্ভাব্য দুর্ঘটনার প্রতিরোধে পূর্বপ্রস্তুতি না থাকা এবং সতর্কতামূলক চিহ্ন ছাড়া মাছ ধরার জাল পেতে রাখা। উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০০০ সালে মেঘনা নদীতে ‘এমভি জলকপোত’ ও ‘এমভি রাজহংসী’ নামের দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৬২ যাত্রী। ২০০২ সালে চাঁদপুরের ষাটনল সংলগ্ন মেঘনায় সালাহউদ্দিন-২ নামের ডুবে ৩৬৩ যাত্রী মারা যান। ২০০৩ সালে ‘এমভি নাসরিন-১’ চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতে দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে ১২৮ পরিবারের প্রধানসহ সরকারিভাবে ৬৪১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে লাশ উদ্ধার করা হয় প্রায় ৮০০। ২০০৪ সালের ‘এমভি লাইটিং সান’ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৮১ এবং ও ‘এমভি দিগন্ত’ ডুবির ঘটনায় শতাধিক যাত্রীর মৃত্যু ঘটে। ২০০৬ সালে মেঘনা সেতুর কাছে ‘এমএল শাহ পরাণ’ লঞ্চ দুর্ঘটনায় ১৯ জন মারা যায়। ২০১৪ সালে মুন্সীগঞ্জের কাছে মেঘনা নদীতে এমভি মিরাজ-৪ ডুবিতে ২২ যাত্রীর মৃত্যু হয়। একই বছরে পদ্মায় স্মরণকালের ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনায় আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ। উদ্ধার করা হয় ২১ লাশ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মেঘনা নদীর চাঁদপুর সংলগ্ন মাঝ কাজীর চর এলাকার মাঝ নদীতে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে দুই যাত্রী নিহত এবং আটজন আহত হয়। এভাবে তথ্য দিতে থাকলে শুধু মৃত্যুর পাল্লাই ভারী হবে। কিন্তু এমন ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কতটা বেদনার এবং আশঙ্কাজনক তা আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টরা কতটুকু কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করেছে, সেটিই বিবেচ্য। 
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, সংগত কারণেই এটা ভুলে যাওয়া যাবে না, দেশের যোগাযোগ, যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় একটা মাধ্যম হচ্ছে নৌপথ। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে বলার অপেক্ষা রাখে না- জলপথে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হলেও নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। যা আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। কেননা, নৌপথে বড় জাহাজ ছাড়াও ছোট ছোট প্রচুর যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মনীতি মানা হয় না এমন অভিযোগ আছে। অধিক মাল ও যাত্রী নিয়ে প্রতিযোগিতাসহ নানা ধরনের অনিয়মের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। এবারের দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও প্রাথমিক ধারণায় অসতর্কতার বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে সংশ্লিষ্টদের এটা মনে রাখা দরকার, যথাযথ পদক্ষেপ নিশ্চিত না হলে কিংবা আইনবিধি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে না।

এমভি মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের দিকে আসছিল। শ্যামবাজারের কাছে নদীতে চাঁদপুর থেকে আসা ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে গিয়ে যে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় তা নজিরবিহীন। মর্মন্তুদ এ ঘটনার পর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেছেন, দুই লঞ্চের কর্মীদের অসতর্কতায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফলে দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখে এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প থাকা উচিত নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এটা মনে রাখা সঙ্গত যে, অসতর্কতা কিংবা অবহেলায় যদি এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে, মানুষ চলে যায় না ফেরার দেশে, তবে এর চেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা আর কী বা হতে পারে! 
লঞ্চদুর্ঘটনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম নয়। প্রতিবছরই ঘটছে এমন প্রাণঘাতি দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে যথারীতি তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা থামেনি। উপরন্তু অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ বা ফিটনেসবিহীন যান, নির্মাণ ত্রুটি, ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ কিংবা মাল বহন ইত্যাদি নানা ধরনের অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে বিভিন্ন সময়েই, যা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। এই যে, প্রায় প্রতিবছর দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষের প্রাণ যাচ্ছে; এরপরও লঞ্চ মালিক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সচেতন হয়েছে এমন নজিরও নেই। দুর্ঘটনা হয়তো একেবারেই শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু সতর্ক ও সচেতন থাকলে প্রাণহানি রোধ করা যায় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এবার দেখা যাক, দুর্ঘটনাকালীন সময়ে জানমালের ক্ষতির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রতিক‚ল আবহাওয়া বা কারিগরি ত্রæটির কারণে যদি দুর্ঘটনা আসন্ন মনে হয়, সে ক্ষেত্রে দুর্যোগ মোকাবিলায় চালক এবং স্টাফদেরই নেতৃত্ব দিতে হবে, তাই তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি দুর্ঘটনা ঘটে যায় তাহলে প্রাণহানির ঝুঁকি কমাতে জাহাজের প্রত্যেক আরোহীর জন্য ভেসে থাকার সরঞ্জাম (বয়া বা লাইফ জ্যাকেট) থাকতে হবে যাতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত যাত্রীরা ভেসে থাকতে পারেন। এই লাইফ জ্যাকেটগুলো প্রতিটি সিটের সঙ্গে থাকতে হবে যাতে প্রয়োজনীয় সময়ে মুহূর্তের মধ্যেই যাত্রীরা লাইফ জ্যাকেট পরিধান করতে পারেন।

এটা দেখা যায় যে, বর্তমানে অনেক লঞ্চেই কয়েকটি বয়া থাকে যেগুলো অনেকটা ‘শোপিসের’ মতো সাজিয়ে রাখা হয়। কয়েকশ যাত্রী বহনকারী একটি জাহাজে ২০ কী ৩০ টি বয়া একদিকে যেমন মোটেই পর্যাপ্ত নয়, অন্যদিকে নাগালের বাইরে থাকার কারণে এগুলো সহজে ব্যবহার করাও সম্ভব হয় না। লঞ্চডুবি ঘটলে যাত্রীদের বড় একটি অংশ লঞ্চ থেকে বের হওয়ারই সুযোগ পান না। এ জন্য প্রতিটি জাহাজে অসংখ্য জরুরি বহির্গমন পথ থাকা জরুরি। সেগুলোতে এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা করা যেতে পারে যাতে বিপদ আসন্ন উপলব্ধি করলে জাহাজের প্রধান চালকের একটি সুইচের চাপে সবগুলো দরজা খুলে যাবে। তাহলে লঞ্চডুবির ক্ষেত্রে যাত্রীরা ডুবন্ত লঞ্চ থেকে বের হয়ে অন্তত লাইফ জ্যাকেট বা বয়ার সাহায্যে ভেসে থাকতে পারেন। তবে একটি লঞ্চের চলাচলের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে শুরু থেকে শেষ অবধি প্রতিটি স্তরেই নিয়মনীতি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা আবশ্যক। এ জন্য পরিস্কার নীতিমালা থাকা জরুরি। এক্ষেত্রে বিআইডবিøউটি-এর আইন ও নীতিমালা রয়েছে কিন্তু এর বেশিরভাগ অর্ডিন্যান্স, অ্যাক্ট বা রুল অনেক পুরোনো এবং সময়োপযোগী নয় বলে জানা যায়। এছাড়াও বিদ্যমান আইনে ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া যাত্রী পরিবহন করা, প্রশিক্ষিত চালক বা ইঞ্জিনিয়ার ব্যতীত জাহাজ চালানো অথবা ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন করার জন্য যে ধরনের শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করা আছে তা সময়োপযোগী নয়। এগুলো সময়োপযোগী করা বাঞ্ছনীয়। এছাড়া পরিবহন মালিক কিংবা চালকের গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটা বন্ধ করতে হলে কঠোর শাস্তির বিধানও করতে হবে।

সর্বশেষ কথা হচ্ছে, শুধু আইন বা নীতিমালা তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না, তার প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। না হলে প্রতিবছরই নদীর পারে স্বজন-হারানোদের আহাজারির চিরাচরিত দৃশ্যই প্রতীয়মান হবে, যা কারো প্রত্যাশা হতে পারে না। নৌ-দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্টরা এমন পদক্ষেপ নিশ্চিত করুক, যাতে বুড়িগঙ্গার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটিই শেষ দুর্ঘটনা হয়।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর