.ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৩ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৯ ১৪২৬,   ১৭ শা'বান ১৪৪০

তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র

জমি অধিগ্রহণে অনিয়ম, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ

রুদ্র রুহান, বরগুনা প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৫২ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

বরগুনার তালতলীতে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে জায়গা ছেড়ে দিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনশতাধিক পরিবার। মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে এমন প্রতিশ্রুতি এখন অধরা। প্রতারণার শিকার ওইসব পরিবারের অভিযোগ, নিয়মানুসারে বসতির চারগুণ ও জমির তিনগুণ ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবায়ন হয়নি এর কোনোটিই।

প্রায় এক হাজার একর জমিতে নির্মাণ হচ্ছে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউপির বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে চার কিলোমিটার এলাকায় চলছে প্রকল্পের কাজ। 

কড়া নিরাপত্তায় ঘিরে রাখা হয়েছে প্রকল্প এলাকা। এ প্রকল্পে বাঁধের উপর বসবাসকারীরা ছেড়েছেন জায়গা। এসব ভূমিহীন মানুষ যে যেভাবে পারছে গড়ছে মাথা গোজার ঠাই। কেউবা খোলা আকাশের নিচে পাখির মতো খড়কুটোয় বাঁধছে বাসা। কেউ কেউ আবার খুঁটি পুঁতে সামান্য ছাপড়ায় রাত কাটাচ্ছেন। রান্না খাওয়া-দাওয়া সবই খোলা আকাশের নিচে। বাঁধের ঢালে ফসলের মাঠজুড়ে এভাবেই তিন শতাধিক পরিবারের বসতি। 

অসহায় এসব পরিবার সরকারের নির্দেশনা মেনে ছেড়েছেন জায়গা। কিন্তু ক্ষতিপুরণের অর্থ  পাওয়া নিয়ে তাদের অভিযোগের যেন অন্ত নেই। নিয়মানুসারে বসতির চারগুণ ও জমির তিনগুণ ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা থাকলেও, এখানে তার কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। তৃতীয় একটি পক্ষ মধ্যস্থতা করে এসব কাজ করছেন বলে জানায় বাসিন্দারা। 

নিশানবাড়িয়া ইউপি সুবাহানপাড়ার দুলাল জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড আবাসস্থল ছাড়ার কোনো নোটিশ দেয়নি। তবে চেয়ারম্যান দুলাল ফরাজি ও ইউপি সদস্য রফিক জোমাদ্দারসহ কয়েকজন সহযোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইসোটেকের সঙ্গে আঁতাত করেই এমনটা করেছেন বলে  অভিযোগ।

দুলাল আরো জানান, মাত্র চার পাঁচজনকে নোটিশ দেয়া হয়। ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল ফরাজী আইসোটেকের সঙ্গে মধ্যস্থতা করে পরিবারগুলোকে ডেকে এক লাখ থেকে ৫০ বা ২০ হাজার দিয়েছেন। তিনশ টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রেখে যাকে যেভাবে সম্ভব তাই দেয়া হয়েছে। আর যারা বেঁকে বসেছেন, তাদের হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে বসতি ছেড়ে বাঁধের ঢালে আশ্রয় নেন এসব মানুষ।

রেকর্ডি সম্পত্তির মালিকরাও শিকার হয়েছেন জালিয়াতির। ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল ফরাজীর সহযোগী জাহাঙ্গীর, সোহরাফ, সেলিম ও কালাম নামের কয়েক ব্যক্তি ভুয়া দাগ খতিয়ান তৈরি করে জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় টাকা। জমি ও অর্থ, সব হারিয়ে মূল মালিকরা এখন দিশেহারা। এমনই একজন ওই এলাকার সুলতান। চার একর জমি ছিল তার মালিকানায়। তার সব জমি জালিয়াতি করে আইসোটেকের কাছে বিক্রি করেছে জাহাঙ্গীর চক্র। মূল মালিক হারিয়েছেন জমি, পাননি একটি টাকাও। টাকার জন্য ছুটে রেড়িয়েছেন নানা দরবারে। কিন্তু কেউ শোনেনি অসহায়ের কথা। 

স্থায়ী বন্দোবস্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে জমি ভোগদখল করছেন প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ। স্থানীয় ভূমি অফিসের সহযোগীতায় তাদের প্রত্যেকের জমিই ভুয়া দাগ খতিয়ানে বিক্রি করছে দালাল চক্র। 

ক্ষতিগ্রস্ত আল আমিন জানান, তার ভোগদখল করা তিন একর জমি আইসোটেকের কাছে বিক্রি করেছে দালাল চক্র। প্রতিবাদ করায় এক রাতের মধ্যে একাধিক মামলা দেয়া হয় তার বিরুদ্ধে। মিনহাজ উদ্দিন বিশ্বাস ও জামাল বিশ্বাসের নামেও বন্দোবস্ত ছিল ছয় একর জমি। এসব জমিও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে।

দালাল চক্রের হোতা জাহাঙ্গীর আইসোটেকের প্রতিনিধি হয়ে ডিসি কার্যালয় থেকে জমি অধিগ্রহণের অনুমতি নেয়। পরে আমতলী ও তালতলী ভূমি অফিসের সঙ্গে আঁতাত করে ৭৫ টি ভূয়া দলিলের মাধ্যমে ওইসব জমি আইসোটেকের কাছে বিক্রি করে। এসব দালালদের নিজস্ব সিম কার্ড সরবরাহ করে আইসোটেক। ওইসব নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন লোকজনকে ফোনে কোম্পানির পরিচয়ে প্রতারিত করে তারা। এছাড়া জমির ন্যয্যমূল্যর প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাগজপত্র হাতিয়ে জাল দলিলের মাধ্যমে আইসোটেকের নামে সেসব জমি হস্তান্তর করে। 

অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। তবে মুঠোফোনে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, মানুষ যাতে ন্যায্যমূল্য পায় সে লক্ষ্যে তিনি কাজ করেছেন।তার দাবি জমির ভোগদখলকারীদের ন্যায্যমূল্য পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল ফরাজী। তিনি ব্যস্ততার কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুজ্জামান তনু বলেন, সব ক্ষেত্রেই জনস্বার্থ অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে তিনি প্রকল্পের কাজে সহযোগিতা করছেন। তবে দুলাল ফরাজী ও তার সহযোগী জাহাঙ্গীর চক্রের ফাঁদে পড়ে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ বঞ্চিত হয়েছে বাসিন্দারা। দখলে থাকা প্রকৃত কার্ডধারীরা প্রতারিত হয়েছেন। তারা ন্যায্যমূল্য তো পাননি, উল্টো মামলা হামলারও শিকার হয়েছেন। 

এ প্রসঙ্গে বরগুনার ডিসি কবীর মাহমুদ বলেন, সরকারি জমিতে বসবাসরতদের বিকল্প আবাসনের কাজ চলছে। কাজ সম্পন্ন হলেই তাদের সাময়িক অসুবিধা দূর হবে। জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি। 

বরগুনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের যেসব জমি আছে, তার কিছু অংশ আইসোটেক ইলেট্রিফিকেশন কোম্পানি লিমিটেডকে লিজ দেয়া হয়েছে। আর প্রকল্পের মধ্যে যে জমি পড়েছে তাও লিজ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্প এলাকায় যারা অবৈধভাবে পাউবোর জমি দখল করে আছেন, তাদের জমি ছেড়ে দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণ বা উচ্ছেদের ব্যাপারে অনিয়মের প্রসঙ্গে তিনি কিছুই জানেন না বলে মন্তব্য করেন।

আইসোটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মঈনুল আলম বলেন, নিয়মানুসারে ওই এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে শিগগিরই বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। তাদের আবাসনে স্কুল, মসজিদ, হাসপাতাল, কমিউনিটি সেন্টারসহ আরো অনেক সুবিধা থাকবে। বৈদেশিক অর্থায়নে নির্মিতব্য এ প্রকল্পে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।

২০২২ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। নির্মাণ শেষে ওই কেন্দ্র থেকে ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। যার আড়াইশ মেগাওয়াট যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে। যা দক্ষিণাঞ্চলসহ গোটা দেশের বিদ্যুত চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর