জনসংখ্যা কমাতে জন্মের পরপরই ১০০ শিশুকে গণকবর দেয়া হয়!

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭,   ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

জনসংখ্যা কমাতে জন্মের পরপরই ১০০ শিশুকে গণকবর দেয়া হয়!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:২২ ২৮ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৬:২৭ ২৮ এপ্রিল ২০২০

ছবি: শিশুর কঙ্কাল

ছবি: শিশুর কঙ্কাল

ইসরায়েলের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের তীরে প্রাচীন সমুদ্র বন্দর আশকিলন। সেখানে ইংল্যান্ডের এক প্রত্নতাত্ত্বিক দল রোমান সভ্যতার নিদর্শন নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিলেন। ১৯৮৮ সালে একটি নর্দমা সন্ধান করতে গিয়ে তারা অনেক ছোট ছোট হাড় আবিষ্কার করেন। 

শিশুর শরীরের হাড়প্রাথমিকভাবে হাড়গুলো মুরগির হাড় বলে মনে করেছিলেন তারা। পরবর্তীতে তারা বুঝতে পারেন এগুলো মানব শিশুর হাড়। সমাধিতে ১০০ টিরও বেশি মানব শিশুর হাড় পাওয়া যায়। ইংল্যান্ডের চিল্টার্ন প্রত্নতত্ত্বের একজন প্রত্নতাত্ত্বিক এবং পরিচালক ইয়ার্স বলেন, ১৮০০ বছর আগে রোমান সভ্যতার সময়কালে শিশুগুলোকে সমাধিস্থ করা হয়। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত মানব শিশুর সবচেয়ে বড় সমাধি হিসেবে বিবেচিত হয় এটি।

১৯১২ সালে প্রথম হাম্বলডিনে এমন সমাধি আবিষ্কৃত হয়। তবে তখন এটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি গবেষকরা। তবে ব্রিটেনে ২০ শতকের গোড়ার দিকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ব্রিটিশ জনগণের ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করার দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। সেসময় তারা আশকিলনের এই সমাধিটি আবিষ্কার করেন। আর তখনই মানব কঙ্কাল সরকারি উপদেষ্টা সংস্থা ইংলিশ হেরিটেজসহ জীববিজ্ঞানীরা নড়ে চড়ে বসেন। 

প্রাচীন আশকিলনের ধ্বংসাবশেষএরপর এই সমাধি নিয়ে শুরু হয় গবেষণা। ফরেনসিক নৃতত্ত্ববিদ অধ্যাপক প্যাট্রিসিয়ান স্মিথ শিশুর দেহাবশেষ পরীক্ষা করেছেন। তিনি পরীক্ষা করে দেহাবশেষের শিশুদের কোনো অসুস্থতা বা রোগের লক্ষণ পাননি। ধারণা করা হয়, এসব শিশু জন্মের পরপরই এবং কিছু জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে মারা গিয়েছিল। রোমান সময়ে জনসংখ্যার হার কমাতে শিশুদের হত্যা করা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। 

সেসময় জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য তেমন কোনো পদ্ধতি তারা ব্যবহার করত না। তাই শিশু জন্মের পর পরই তাদের হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে দেয়া হত। এছাড়াও সেই সময়কার বিশ্বাস অনুসারে, দেবতারা শিশুদের রক্ষা করবে। এর উপর নির্ভর করে শিশুদের জঙ্গলে ফেলে আসা হত বা মাটি চাপা দেয়া হত। রোমান সভ্যতায় শিশু হত্যার চেষ্টা করার সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনী রোমুলাস এবং রেমাসের গল্প। 

কাল্পনিক মঙ্গল গ্রহের দুই শিশু পুত্র রোমুলাস এবং রেমাসযুদ্ধদেবতাকে সন্তুষ্ট করতে মঙ্গল গ্রহের দুই শিশু পুত্র রোমুলাস এবং রেমাসকে জঙ্গলে ফেলে আসা হয়। এরপর নেকড়েদের দল তাদের উদ্ধার করে লালন পালন করে। তারাই পরে রোম শহরটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ কাহিনীর কোনো সত্যতা নেই। তবে এটি সেসময়কার একটি বিশ্বাস ছিল। গবেষণায় আরো কিছু বিষয় উঠে আসে। যা আপনাকে অবাক করে দেবে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শিশুগুলোর কোনোটিই মৃত জন্ম নেয়নি। অর্থাৎ এদের হত্যা করে সমাধি দেয়া হয়। 

এই সমাধিটি আশকিলনের বাথ হাউজের নিচে নর্দমায় পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, ওই এলাকায় পতিতাদের বসবাস ছিল। আর এগুলো তাদের সন্তান। তবে এটি নিছক অনুমান হিসাবেই রয়ে গেছে। কারণ তত্ত্বটিতে আর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষণায় আরো উঠে আসে, এই শিশুগুলোর কোনো জন্ম ত্রুটিও ছিল না। শিশুগুলো ৩৮ থেকে ৪০ সপ্তাহ পর্যন্ত মায়ের গর্ভে ছিল। জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে এদের হত্যা করা হয়। 

রোমান বাথ হাউজের ধ্বংসাবশেষহতে পারে মা নিজেই হত্যা করেছে অথবা জোর করে নিয়ে অন্যরা হত্যা করেছে। এছাড়াও রোমান যুগে পতিতা এবং শ্রমিকদের শিশু হত্যা বেশ স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। রোমান-যুগের বাচ্চাদের গণহত্যার একমাত্র উদাহরণ আশকিলনের এই সমাধি নয়। এছাড়াও আরো অনেক এমন সমাধি রয়েছে। ১৯১২ সালে ইংল্যান্ডের বাকিংহামশায়ার কাউন্টি যাদুঘরের কিউরেটর আলফ্রেড হেইনেজ ককস একটি সমাধি আবিষ্কার করেছিলেন। 

হাম্বলডিনে খননের সময় তারা এই সমাধিটির সন্ধান পান। এখানে তারা ৩০০টি ছবি, বিভিন্ন প্রত্নসম্পদ, মৃৎশিল্প খুঁজে পান। সেই সঙ্গে সেখানে ১০৩টি দেহাবশেষ পাওয়া যায়। যার মধ্যে ৯৭টি শিশু, তিনটি একটু বড় শিশু এবং বাকি তিনটি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির। এখানে ৩৫টি শিশুর দেহবশেষ ছিল সিগারেটের প্যাকেটের মতো ছোট বক্সে। এগুলো অনেকটা অক্ষত অবস্থায় ছিল। 

জীববিজ্ঞানী ডাঃ সাইমন মেয়েস হ্যাম্বেডেন রোমান শিশু হাড় পরীক্ষা করেছেনইয়ার্স মনে করেন, বক্সে থাকার কারণে এগুলো অনেকটা অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ১৯টির ডিএনএ পরীক্ষা করতে সক্ষম হন তারা। যার মধ্যে ১৪ টি ছেলে এবং পাঁচটি মেয়ে শিশু ছিল। এই ভয়াবহ অনুসন্ধানে এই শিশুদের কীভাবে এবং কেন হত্যা করা হয়েছিল সে সম্পর্কে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। তবে গবেষকরা তার কূল কিনারা আজো করতে পারেননি।   

প্রত্নতাত্ত্ববিদ জিল ইয়ার্স বিশ্বাস করেন, হ্যাম্বেডেন সাইটটি পতিতালয়ের আরেকটি উদাহরণ। যেখানে পতিতারা অবাঞ্ছিত শিশুদের জন্ম দিত। আর দারিদ্র্যতার কারণে তারা বেশিরভাগ সময় জন্মের পরপরই শিশুদের হত্যা করেছিল। সেসময় যেহেতু গর্ভনিরোধের তেমন কোনো পদ্ধতি ছিল না। তাই জনসংখ্যা কমাতে তখন শিশু হত্যা করা হত বলে ধারণা করা হয়। এছাড়াও ঐতিহাসিকদের মতে, রোমান যুগে পতিতা এবং শ্রমিকদের শিশু হত্যা বেশ স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। 

সূত্র: লাইভসাইন্স, অ্যানসাইন্টঅরিজিন, ডেইলিমেল

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস