Alexa জঘন্য সুরের হয়েও বিখ্যাত শিল্পী ‘ফ্লোরেন্স ফস্টার’

ঢাকা, রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২ ১৪২৬,   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

জঘন্য সুরের হয়েও বিখ্যাত শিল্পী ‘ফ্লোরেন্স ফস্টার’

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩৫ ২৯ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪২ ২৯ অক্টোবর ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

গান মানুষের চিত্তকে রঞ্জিত করে। গান শুনতে ভালোবাসেন না এমন মানুষ বোধ হয় কমই আছেন। সময়ে অসময়ে কাজের ফাঁকে পছন্দের শিল্পীর গান শুনেন অনেকেই।

এটি সৃষ্টিকর্তার অসামান্য দান। যুগে যুগে অনেক শিল্পী এসেছেন যারা তাদের সুরেলা কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। এমনকি তাদেরকে স্মরণ করা হয় তাদের সুমধুর কণ্ঠে গানের জন্যই। তবে বিচিত্রভাবে অনেকেই টিকে আছেন ইতিহাসের পাতায় তাদের বেসুরো গায়কির জন্য।

ফ্লোরেন্স ফস্টারফ্লোরেন্স ফস্টার জেনকিন্স একসময় পুরো নিউ ইয়র্কে বিখ্যাত হয়ে যান। তবে ইতিবাচক নয়, নেতিবাচক দিক থেকে। নেতিবাচক না বলে বলতে হবে ঠাট্টার দিক থেকে। শিল্পী হিসেবে একসময় পত্রিকায় চলে যায় ফ্লোরেন্সের নাম। পত্রিকায় রিভিউ বের হয়- “ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য অপেরা শিল্পী হলো এই গায়িকা”।  

১৮৬৮ সালের ১৯ জুলাই পেনসিলভানিয়াতে জন্মগ্রহণ করা ফ্লোরেন্স ফস্টার ছিলেন প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক। তার বাবা চার্লস ডরেন্স ফস্টার ছিলেন সেখানকার সম্ভ্রান্ত ধনী ব্যক্তি। সঙ্গীতের প্রতি প্রবল সহানুভূতি ছিল তার। শিশুকালেই পিয়ানো বাজানোয় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এমনকি হোয়াইট হাউজেও পিয়ানোর পারফরমেন্স করেছিলেন তিনি। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাদারফোর্ড বি হেইজ। তবে হাতের সমস্যার কারণে সেটি চালিয়ে যেতে পারেননি।

ফ্লোরেন্স ফস্টারসারা জীবনই সঙ্গীতের প্রতি মায়া ছিল তার। হাই স্কুলের পড়া সম্পন্ন হলে তিনি ইউরোপে এসে সঙ্গীতে শিক্ষালাভ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন পরিবারের কাছে। পরিবার থেকে কোনো ভাবেই তাকে সম্মতি দেয়া হয়নি। এতে থেমে যাননি তিনি। নিজেই গান গাওয়া শুরু করেন। নিজের কণ্ঠ যে জঘন্য, সেটা নিজে থেকে বোঝার ক্ষমতা ছিল না তার। অর্থ-সম্পদ ছিল, সেটা দিয়ে দামী অডিটোরিয়াম ভাড়া করেন, দর্শক কিনে আনেন। গান গেয়ে উপরে উপরে মিথ্যা প্রশংসা পান, কিন্তু ভেতরে ভেতরে হন হাসির পাত্র। তবে সেসবের কোনো কিছুই কানে যায় না তার। সঙ্গীত পরিবেশন চালিয়েই যান ফ্লোরেন্স।

ফ্লোরেন্সকে এ ব্যাপারে সার্বক্ষণিক সাহায্য করেছেন তার স্বামী ফ্রাঙ্ক থর্নটন। ১৮৮৫ সালে তারা পালিয়ে বিয়ে করেন। তবে পরের বছর ফ্লোরেন্স সিফিলিসে আক্রান্ত হন। তিনি জানতে পারেন এই সিফিলিস এসেছে তার স্বামীর কাছ থেকে। সিফিলিস একটি যৌনবাহিত রোগ; বহুগামিতা ও অনিরাপদ যৌনসঙ্গম হলো সিফিলিসের কারণ। এমতাবস্থায় ফ্লোরেন্স তার স্বামীর কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে ডিভোর্সের আবেদন করেন।

ফ্লোরেন্স ফস্টারএরপর ১৯০০ সালের দিকে তিনি মায়ের সঙ্গে নিউ ইয়র্ক শহরে চলে আসেন। ১৯০৯ সালে সেইন্ট ক্লেয়ার বেফিল্ড নামের একজন ইংরেজ অভিনেতার সঙ্গে তার সখ্যতা হয়। তার সঙ্গেই ‘জটিলতাপূর্ণ সম্পর্ক’ নিয়ে বাকি জীবন পার করেন। সে বছরই ফ্লোরেন্সের বাবা মারা যাওয়ায় অনেক সম্পত্তির মালিক হন তিনি। এরপর বাকি জীবন সঙ্গীতচর্চা করার রাস্তা অনেক সহজ হয়ে যায় তার। সম্পদ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের জন্য ম্যানেজার হিসেবে রেখে দেন সেইন্ট ক্লেয়ারকে। সম্ভবত এই অর্থই ক্লেয়ারকে সারা জীবন সিফিলিসে আক্রান্ত ফ্লোরেন্সের পাশে রাখতে সাহায্য করেছিল। সঙ্গীত ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকে ফ্লোরেন্স জড়িত হয়ে যান বিভিন্ন সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক সংস্থার সঙ্গে। অর্থ দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করতে থাকেন তাদের। সংস্কৃতিমণ্ডলে ধীরে ধীরে বিখ্যাত এবং সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকেন তিনি।

ফ্লোরেন্স ফস্টার তিনি নিজের গানের মাধ্যমে তৎকালের হতাশায় ডুবন্ত মার্কিনীদের মনোরঞ্জন  করেছেন। এজন্য অঞ্চলের সেরা গানের শিক্ষককে রাখলেন গান শেখার জন্য। ভাড়া করা হলো পেশাদার পিয়ানোবাদককে। শিক্ষক শেখান, ফ্লোরেন্স চর্চা করেন, পাশে থাকা মানুষজন হতভম্ব হয়ে থাকেন। এ কেমন গলা? কিন্তু উচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া শিক্ষক বা পিয়ানোবাদক কেউই তার খারাপ কণ্ঠ নিয়ে কিছু বলেন না। তার যে এখনই গান গাওয়া ছেড়ে দেয়া উচিত। সেটাও বলতে পারেন না। হয়তো তারা টাকার জন্য বলেন না কিংবা ফ্লোরেন্সের মন ভেঙে যাবে, সেজন্য বলেন না। এমনকি তার স্বামীও বলেননি যে তার কণ্ঠ খারাপ। অভিভাবকের মতো তাকে উৎসাহ ও সাহায্য-সহযোগিতা করে গেছেন। স্বামী জানেন, সঙ্গীতের প্রতি তার স্ত্রীর কতটা অনুরাগ।

ফ্লোরেন্স ফস্টারশিক্ষক, পিয়ানোবাদক, স্বামী সহ সকলেই খেটে যান ফ্লোরেন্সের জন্য। নিজেদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেন না তারা। কিন্তু বিধি বাম, গলার কোনো উন্নতি কিছুতেই হয় না। গান তো আর ভালো মানের হয়ে বের হয় না।

একসময় ফ্লোরেন্সের ইচ্ছে হলো, সবার সামনে পারফর্মেন্স করবেন। স্বামী দেখলেন, এখন তো বিপদ! একবার মানুষের সামনে গাইলে তো তার অক্ষমতা আর গোপন থাকবে না। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারেন তিনি। এখন গাইতে দিলে বাঁধবে বিপত্তি। আবার গাইতে না দিলেও বাঁধবে অন্য ধরনের বিপত্তি। স্বামী সেইন্ট ক্লেয়ার তাকে খুব ভালোবাসতেন। সবকিছুর উর্ধ্বে রাখতেন ফ্লোরেন্সকে। তাই বুদ্ধি করে তাকে গাইতে দিলেন তিনি। অন্যদিকে তলে তলে পরিচিত কিছু মানুষ ভাড়া করলেন যারা দর্শক হিসেবে তার গান শুনবে। গান যেমনই হোক, তারা হাতে তালি দেবে এবং আহা-উহু উচ্চারণের মাধ্যমে ফ্লোরেন্সের প্রশংসা করে যাবে।

ফ্লোরেন্স ফস্টারএভাবে ব্যাপারটা শেষ হয়ে যেতে পারতো, তবে তা হয়নি। ঐ যে টাকা খাওয়া মানুষ প্রশংসা করে গেছে। তাতে আরো আত্মবিশ্বাসী ও অদম্য হয়ে উঠেন ফ্লোরেন্স ফস্টার। আরো বড় পরিসরে সঙ্গীত পরিবেশন করতে লাগলেন তিনি। স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেই যোগাযোগ করতে লাগলেন সঙ্গীত সংক্রান্ত লোকদের সঙ্গে। যেহেতু তিনি সঙ্গীতপ্রেমী, তাই সঙ্গীতের অলিগলি সবই চেনেন। আর যেহেতু সঙ্গীত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থাকে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন। তাই তারাও তাকে সহায়তা না করে পারলো না। এভাবে ফ্লোরেন্স প্রকাশ করে ফেললেন নিজের এলবাম। ভাড়া করে ফেললেন কার্নেগি হলের মতো অত্যন্ত অভিজাত অডিটোরিয়াম। যেখানে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে পারফর্মেন্স দেখতে পারে।

ফ্লোরেন্স ফস্টারএসময়ে সেইন্ট ক্লেয়ার বেফিল্ড গোপনে অন্য একটি নারীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছিলেন। যেহেতু  ফ্লোরেন্স শারীরিক দিক থেকে অসুস্থ ছিলেন। তাই সক্ষম পুরুষ হিসেবে অন্য একটি নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তার। কিছুদিন অবকাশ যাপনের পর তিনি যখন ফিরলেন। তখন দেখলেন অবস্থা আর নিয়ন্ত্রণে নেই। কার্নেগি হল ভাড়া হয়ে গেছে এবং বিনামূল্যের টিকিটও ঘোষণা করা হয়ে গেছে।

ফ্লোরেন্স ফস্টার মনে করতেন, তার গান মানুষ আসলেই পছন্দ করে। বানোয়াট প্রশংসা তো আছেই, পাশাপাশি রেডিওর অনুষ্ঠানে শ্রোতারা ফোনে অনুরোধ করতো তার গান বাজানোর জন্য। তাতে ফ্লোরেন্স ধরে নিতেন তার গান আসলেই মনোহর। তা না হলে রেডিওতে বাজানোর জন্য অনুরোধ কেন আসবে? বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ মজা করার জন্য ফোন দিয়ে অনুরোধ করত।

রেডিওতে যখন তার গান বাজতো, তখন শ্রোতারা রেডিওর পাশে একত্র হয়ে অট্টহাসিতে মেতে উঠতো। ফ্লোরেন্সের গান ছিল তাদের হাসি-ঠাট্টার খোরাক। স্বামী এসবের সবই বুঝতো, কিন্তু কিছুই জানাতো না স্ত্রীকে। স্ত্রীকে তার নিজের ভালোবাসার জগত নিয়ে শান্তিতে থাকতে দিয়েছিল সে সারা জীবন।

ফ্লোরেন্স ফস্টারযাই হোক, সেইন্ট ক্লেয়ার এসে দেখলেন, কার্নেগি হল ভাড়া হয়ে গেছে। তখন ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, উৎসাহ দেবার জন্য সৈনিকদেরকে ফ্রিতে টিকিটও দেয়া হয়ে গেছে। এমন অবস্থাতে স্বামী কী করবেন? তাদেরকে তো আর অর্থ খাইয়ে সামাল দেয়া যাবে না। এখন উপায়? তিনি মাথা ঠাণ্ডা রাখলেন। অনুষ্ঠান হয়ে গেল, সবাই হাসি-তামাশা করলো। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ফ্লোরেন্স বুঝতে পারলেন না এসবের মানে।

পরদিন সকালে পত্রিকায় তার অনুষ্ঠানের রিভিউ ছাপা হলো। নির্ঘাত সেখানে মান-সম্মানের বারোটা বাজবে। তাই সেইন্ট ক্লেয়ার আগে থেকেই টাকা দিয়ে সাংবাদিক ও রিভিউয়ার কিনে রেখেছিলেন। তবে সকল পত্রিকার সাংবাদিকদের বাগে আনতে পারেননি তিনি। তাই কোনো কোনো পত্রিকায় ইতিবাচক আর কোনো কোনো পত্রিকায় নেতিবাচক পর্যালোচনা হলো। ইতিবাচক পত্রিকাগুলো কিনে বাসায় ফ্লোরেন্সের কাছে দিলেন ক্লেয়ার। আর নেতিবাচকগুলো যা আছে, স্টল থেকে সব কিনে ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। যেন কোনোভাবেই ফ্লোরেন্সের চোখে না পড়ে। শুধু নিজের এলাকাই নয়, আশেপাশের সকল এলাকার স্টলের পত্রিকা এভাবে কিনে গুম করে ফেললেন ক্লেয়ার।

ফ্লোরেন্স ফস্টারএতেও শেষ রক্ষা হলো না। সারা দেশের পত্রিকা তো আর কিনে ফেলতে পারেননি তিনি। কেউ না কেউ তো পড়েছে। তাদের মাঝে কেউ তো এ সম্পর্কে ফ্লোরেন্সের সঙ্গে আলাপ করতে পারে। এরকমই আলোচনা থেকে ফ্লোরেন্স বুঝে গেলেন। কিছু একটা গোলমালতো আছে। কোনো একভাবে তিনি জানতে পারলেন ঘটনা, দেখলেন পত্রিকা। তাতে এত বেশি কড়া সমালোচনা ছিল যে, তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। আসলে কড়া সমালোচনা করে সমালোচক কোনো দোষ করেননি। তার দিক থেকে এটাই সঠিক কাজ ছিল। তবে এই সমালোচনা দেখে ফ্লোরেন্স মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং অসুস্থ হয়ে যান। আর এই অসুস্থতাতেই তার মৃত্যু ঘটে।

ফ্লোরেন্সের কণ্ঠ খারাপ হলেও, সঙ্গীতের প্রতি ছিল তার নিখাদ ভালোবাসা। এই ভালোবাসা তার নেতিবাচকতাগুলোকে দূর করে দেয়। তার চেয়েও বড় কথা হলো, নিজের ভালোবাসার জগতে তিনি বিচরণ করে গেছেন। নিজের কণ্ঠের বাস্তবতা উপলব্ধি করে জীবনের শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন- “মানুষ হয়তো বলবে আমি গাইতে জানি না, কিন্তু তারা কখনোই বলতে পারবে না, আমি গাইনি”।

ফ্লোরেন্স ফস্টারসত্যিই জগত কত বিচিত্র। তার সময়ে, তার আগে এবং তার পরে অনেকেই অপেরা গান গেয়েছেন। তাদের প্রায় সকলেই ভালো মানের। তবে বেশিরভাগকেই মানুষ ভুলে গেছে। অনেকেই কার্নেগি হলে পারফর্মেন্স করেছেন। প্রায় সকলেই ভালো করেছেন। এখানেও বেশিরভাগকেই মানুষ ভুলে গেছে তাদের। তবে সব দিক থেকে খারাপ ফলাফল করার পরেও, মানুষ মনে রেখেছে ফ্লোরেন্স ফস্টারকে।

ফ্লোরেন্সকে নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক বই। তাকে নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি হয়েছে। এমনকি সিনেমাও নির্মাণ হয়েছে। সেই সিনেমায় অভিনয় করেন মেরিল স্ট্রিপের মতো কিংবদন্তী মেধাবী অভিনেত্রীরা। অতি সম্মানজনক অস্কার পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয় তার জীবন অবলম্বনে তৈরি করা সিনেমা।

চাইলে আপনিও দেখতে পারেন তাকে নিয়ে তৈরি ডকুমেন্টারি ফ্লোরেন্স ফস্টার জেনকিন্সঃএ ওয়ার্ল্ড অব হার ওন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ