ছোট্ট ভ্যাটিকান সিটির ব্যতিক্রমী যত নিয়ম

.ঢাকা, বুধবার   ২৪ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ১১ ১৪২৬,   ১৮ শা'বান ১৪৪০

ছোট্ট ভ্যাটিকান সিটির ব্যতিক্রমী যত নিয়ম

রাজ চৌধুরী

 প্রকাশিত: ১৩:২৪ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৩:২৪ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ভ্যাটিকান সিটি। পোপের দেশ, ক্যাথলিক চার্চের রাজধানী, অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শনসমূহের সংগ্রাহক এই দেশটিই পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট দেশ। দেশটি এতোই ছোট যে আপনি চাইলে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটে হেঁটেই এর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরতে পারবেন। দেশটির আয়তন ৪৪ হেক্টর (১১০ একর)। সখানে বসবাসরতদের সংখ্যাও খুব বেশি না এক হাজারের মত হবে। কিন্তু এতো ছোট দেশ পৃথিবীর বুকে কীভাবে আসলো? খুবই সংক্ষিপ্ত উত্তর – মুসোলিনির কারণে। আর বড় করে উত্তর দিতে গেলে ইতালি ও ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের পুরো ইতিহাস বলতে হবে। যা অত্যন্ত জটিল৷ তাই একটি সহজ মধ্যম আকারের উত্তর দেয়া যেতে পারে।

ক্যাথলিক পোপেরা এক সময় একটা দেশ চালাতো যার নাম ছিলো পেপাল স্টেট। বর্তমানে ইতালির রোমের অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিলো সেটি। তারা ৭৫৪ থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত দেশটিতে নিজেদের শাসন চালায়। তৈরি করে সেইন্ট পিটার্স বেসিলিকা নামক বড় একটি চার্চ। শুধু তাই নয়, তারা সেখানে এক পাহাড়ের পাশে একটি দেওয়াল নির্মাণ করেন যা পরবর্তীতে ভ্যাটিকান নামে পরিচিত হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ইতালি ভেবেছিলো যে রোম তাদের দেশের জন্য উপযুক্ত একটি রাজধানী হবে তাই তারা সেটা দখল করতে চাইলো। তাই ইতালি সেই পেপাল স্টেট জয় করে নিজেদের করে নেয়৷ তখনকার পোপ সেই পাহাড়ের পাশে থাকা দেওয়ালটির পিছনে গিয়ে অবস্থান নেয়। পোপ ইতালির শাসন মানা তো দূর ইতালিকে দেশ হিসেবেই মানতে চাননি। তখন দেশে ধর্মের কারণে যেনো গৃহযুদ্ধ শুরু না হয় সেজন্য ইতালি তখন পোপকে  চাপ দেয়া বন্ধ করে এই ভেবে যে, পোপ অভিযোগ করা বাদ দিবেন।

কিন্তু এভাবেই চলতে থাকে আরো ষাট বছর। এর মধ্যে ৫ জন পোপ পরিবর্তন হলেও এই ঘটনার কোনো সঠিক সমাধান হয়নি।এতো কিছুর পর ইতালির প্রধানমন্ত্রী হন মুসোলিনি। পোপ তখনো রোমের ক্যাথলিকদের কাছে নিজেকে বন্দী করার অভিযোগ করতে থাকেন। তখন মুসোলিনি এতোকিছু দেখে ক্ষান্ত হয়ে যান। তাই সেই সমস্যা সমাধানের জন্য মুসোলিনি রাজনৈতিক চাল চালেন। তিনি পোপের সঙ্গে কয়েকটি শর্তে সুরাহায় আসেন। শর্তগুলো ছিলো ইতালি ভ্যাটিকান ছেড়ে দিবে আর ক্ষতিপূরণ হিসেবে পোপকে কিছু অর্থও দিবে। এর বদলে পোপ ইতালিকে দেশ হিসেবে মেনে নিবেন এবং রাজনীতিতে কোনো ভূমিকা রাখবেন না। শর্ত মেনে নেয়ার পর জন্ম হয় ভ্যাটিকান সিটির। দেওয়ালে ঘেরা দেশটির রাষ্ট্র হিসেবে সবই আছে। নিজস্ব সরকার থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন, ব্যাংক থেকে শুরু করে নিজস্ব লাইসেন্স সব আছে।

দেশ হিসেবে ভ্যাটিকান সিটি অন্যান্য দেশগুলো থেকে আলাদা। ভ্যাটিকান সিটির সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হচ্ছেন পোপ। তার জন্য আছে আলাদা সিংহাসন যেখানে বসে পোপ তার কার্য পরিচালনা করেন। তার প্রত্যেক বিশপই আলাদা আলাদা আসন পান কিন্তু রোমের বিশপ হচ্ছেন পোপ তাই তার আসনও সকলের চেয়ে আলাদা। এটিই হচ্ছে দ্য হোলি সি। এই দ্য হোলি সি শুধু একটি সিংহাসনই না, এটি একটি ইনকোর্পোরেটেড কোম্পানিও। প্রত্যেকবার যখন পোপ মারা যান বা অবসর নেন তখন তার আসন পাওয়ার জন্য বিশপদের মধ্যে গেম অব থ্রোনসের মত এক অবস্থা হয় যে কে হবে পরবর্তী পোপ।ভ্যাটিকান সিটির একজন রাজা আছেন এবং দেশটিতে রাজতন্ত্র চলে।

রাজার পুরো ক্ষমতা আছে দেশ পরিচালনা করার। আর এই রাজা আর কেউ না, ইনি হলেন পোপ নিজেই। এজন্য ভ্যাটিকানের রাজার কথা কম শোনা যায়। আর এই রাজার জন্যই ভ্যাটিকান সিটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে পারে না।কারণ শুধু গণতান্ত্রিক দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হতে পারে।মজার বিষয় হচ্ছে জাতিসংঘ দ্য হোলি সি’কে কোম্পানি সদস্য হিসেবে নিলেও ভ্যাটিকান দেশকে এর সদস্যপদ দেয় নি।আর এই দ্য হোলি সি ভ্যাটিকান এর জনগণকে পাসপোর্ট দেয়। এটি অন্য সব দেশ থেকে আলাদা। কারণ শুধু মাত্র ভ্যাটিকানেই পাসপোর্ট দেয়ার দায়িত্ব দেশের উপর না দিয়ে একটি কোম্পানির উপর দেয়া। পোপ একই সঙ্গে রাজা ও ধর্মীয় নেতা এই দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী বলেই হয়ত ভ্যাটিকান দেশটির নিয়মে ভিন্নতা রয়েছে!

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস