ছেলের মৃত্যুশোক ভুলতে বেওয়ারিশ মরদেহের দায়িত্ব নেন তিনি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৭ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৫ ১৪২৬,   ১৪ শা'বান ১৪৪১

Akash

ছেলের মৃত্যুশোক ভুলতে বেওয়ারিশ মরদেহের দায়িত্ব নেন তিনি

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৯ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৩:৪৪ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মোহাম্মদ শরিফ। স্থানীয়রা তাকে ‘শরিফ চাচা’ নামেই ডাকেন। কারো সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সবার আত্মার আত্মীয় তিনি। পেশায় ডোম নন, তারপরও মরদেহ সৎকার করেন তিনি। শুধু মানবিকতার টানে অচেনা, অজানা মানুষের মরদেহের প্রতি একটা কর্তব্যের টানে জড়িয়ে পড়েন শরিফ চাচা। 

ভারতের উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদের বাসিন্দা ফৈজাবাদে কান পাতলেই শোনা যাবে চাচা শরিফের আশ্চর্য কাহিনি। বেওয়ারিশ, ক্ষতবিক্ষত মরদেহ, যার দাবিদার কেউ নয়, সেই দেহই পরম মমতায় সৎকার করে চলেছেন তিনি। 

ফৈজাবাদে সাইকেল মেরামতের ছোটখাটো দোকান আছে চাচার। এটাই তার পেশা, রুজি-রুটি। অভাবের সংসার। তাতে সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা কমেনি। কিসের দায়, কিসের কর্তব্য তার সঠিক জবাব বোধহয় চাচার কাছেও নেই। শুধু মানুষের প্রতি মানুষের যে স্বাভাবিক কর্তব্যটুকু থেকে যায় তাকেই আঁকড়ে ধরে পথ চলছেন ফৈজাবাদের শরিফ চাচা।

২৮ বছর আগে অযোধ্যার দাঙ্গায় বৃদ্ধ মোহাম্মদ শরিফের ছেলে নিহত হন। ছেলের মরদেহ আর খুঁজে পাননি তিনি। এরপর থেকে সব বেওয়ারিশ মরদেহ সৎকারের প্রতিজ্ঞা করেন মোহাম্মদ শরিফ। ২৮ বছর ধরে তা রক্ষা করেও চলছেন। 

বিবিসির এক প্রতিবেদনে মোহাম্মদ শরিফ জানান, উত্তর ভারতের অযোধ্যায় বৃদ্ধ মোহাম্মদ শরিফকে সবাই ডাকেন শরিফ চাচা বলে। এ পর্যন্ত তিনি কতোগুলো বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করেছেন, কত শবদেহ চিতায় পুড়িয়েছেন, তার হিসাব নেই। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার বেওয়ারিশ মরদেহের জানাজা পড়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, একদিন এক পুলিশ অফিসারকে নদীতে একটি লাশ ছুঁড়ে ফেলতে দেখলাম। আমি দেখে বিচলিত হয়ে পড়লাম। সেদিন আমি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলাম, আজ থেকে আমিই হবো বেওয়ারিশ মরদেহের অভিভাবক। আমি বেওয়ারিশ মরদেহের সৎকার করবো।

মোহাম্মদ শরিফ বলেন, আমার মনে হয়, অন্যদের লাশ যেভাবে নদীতে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, আমার ছেলের মরদেহও হয়তো সেভাবে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল। আমি ঠিক করেছিলাম নিজের জেলায় কোনো বেওয়ারিশ মরদেহ আমি নদীতে ছুঁড়ে ফেলতে দিবো না। তাই যখনই পুলিশ আমাকে বেওয়ারিশ মরদেহ নেয়ার জন্য খবর দেয়, আমি সব কাজ ফেলে ছুটে যাই।

কেউ হয়তো সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। কেউ রেল দুর্ঘটনায়। কেউ নিজের বাড়ি থেকে দূরের কোন জায়গায় মারা গেছেন। তীর্থযাত্রী, অভিবাসী, সন্তান পরিত্যক্ত বৃদ্ধ- এরকম নানা মানুষের মরদেহ। হাসপাতালে মারা যাওয়া দরিদ্র মানুষ, যাদের মরদেহ সৎকারের কেউ নেই। শরিফ চাচা সেসব মরদেহই সৎকার করেন। শুধু তাই নয় মোহাম্মদ শরিফ হিন্দুদের মরদেহ হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাহ করেন। আবার মুসলমানদের মরদেহ দাফন করেন। 

অযোধ্যা ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের প্রধান অনুজ কুমার ঝা জানান, তারা অসংখ্য বেওয়ারিশ মরদেহ মোহাম্মদ শরিফের হাতে তুলে দিয়েছেন। তবে মোহাম্মদ শরিফের পরিবারের ধারণা, তিনি হয়তো প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বেওয়ারিশ মরদেহের সৎকার করেছেন। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যমে এই সংখ্যা ২৫ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে বলা হচ্ছে।

শরিফ চাচা বলেন, আমার ছেলে যখন নিখোঁজ হয়ে গেল, তখন আমি তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। একমাস ধরে খুঁজেছি পাগলের মতো। পুলিশ আমাকে বলেছিল, তার মরদেহ পচে গিয়েছিল। আমরা ওর মরদেহ দেখিনি। শুধু তার কাপড় পেয়েছিলাম।

মোহাম্মদ শরিফ আরো বলেন, হিন্দু-মুসলিম, সবাই আমাকে সাহায্য করে। মানুষ আমাকে খাবার দেয়। সম্প্রতি আমার চোখের অপারেশন হয়েছিল। এক অপরিচিত মানুষ এসে আমাকে ২০ হাজার রুপি দিয়ে গেছে।

এই অসাধারণ কাজের জন্য তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ দেয়া হয়েছে এবং এরপরই মোহাম্মদ শরিফ পরিচিতি লাভ করেন। তবে এই সম্মান তিনি এমন সময় পান যখন তার জীবন শেষপ্রান্তে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস