Alexa ছুটিহীন এক শিক্ষকজীবন

ঢাকা, রোববার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

ছুটিহীন এক শিক্ষকজীবন

 প্রকাশিত: ১৬:২৭ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৬:২৭ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শিক্ষক জীবনে কর্তব্যপরায়ণতার বিরল নজির রেখেছেন যশোরের অভয়নগরের ধোপাদি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক সত্যজিত বিশ্বাস। যিনি পিতার লাশ বাড়ি রেখে ক্লাসে এসে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করিয়েছেন। বিয়ের দিনও ক্লাস নিয়েছেন। ছুটি নেননি অসুস্থতার মধ্যেও।

দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে শিক্ষকতা করা এমন মানুষের স্কুলে আসতে এক মিনিটও দেরি হয়নি। অথচ দীর্ঘ সাত কিলোমিটার কাচা রাস্তায় বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়া আসা করেছেন জীবনের বড় একটি সময়। বর্ষার দিনে হাঁটু কাদা মাড়িয়ে চরম কষ্ট-দুর্ভোগে স্কুলে আসতে হয়েছে তাকে। এখন রাস্তাটি পাকা হওয়ায় তিনি নিজ গ্রাম মণিরামপুরের কুচলিয়া বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসেন।

অবিশ্বাস্য সেই সব তথ্য জানিয়েছেন তার ২৮ বছরের সহকর্মী অভয়নগরের ধোপাদি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, শিক্ষক সত্যজিত বিশ্বাস স্কুলে কোন দিন দেরি করে আসেননি। কর্মরত জীবনে কোনো দিন ছুটিও নেননি। তিনি বলেন, ‘একদিন শিক্ষার্থীরা সত্যজিত স্যারকে নিয়ে হৈ চৈ করছে। শিক্ষকের মাথায় পানি দিচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। আমি তাকে ছুটি নিতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি ছুটি নেননি।

অসুস্থতার মধ্যে ছুটি না নেওয়ার বিষয়টি ব্যতিক্রম হতে পারে। কিন্তু পিতা মাধব চন্দ্র বিশ্বাসের মৃত্যুর দিনও তিনি (সত্যজিত) স্কুলে এসে ক্লাস নেন। অবিশ্বাস্য সেই কথা সত্য বলে স্বীকার করেছেন সত্যজিত নিজেই। তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর দিনও আমি স্কুল থেকে ছুটি নেইনি। তিনি বলেন, বাবা সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আমার হাতের উপরই মারা গিয়েছিল। সকাল ৮টা পর্যন্ত বাবার মরদেহের পাশে ছিলাম। অন্যদের সৎকারের আয়োজন করতে বলে স্কুলে গিয়েছিলাম। স্কুলে ১২টা পর্যন্ত ক্লাস নিয়ে এসে সৎকারের শেষ অংশে অংশ নিয়েছিলাম।

সত্যজিৎ জানান, বিয়ের দিনও আমি ছুটি নিইনি। তিনি বলেন, ঐতিহ্য অনুযায়ী আমাদের বিয়ে হয় সন্ধ্যায়। ক্লাস নিয়েই সেদিন বিয়ে করতে গিয়েছিলাম। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে পর দিনই স্কুলে যাই। ক্লাস শেষ করে শ্বশুর বাড়ি থেকে নববধূকে নিয়ে বরযাত্রীদের সাথে বাড়ি ফিরেছিলাম।

শুরুতে বিরক্ত হলেও স্বামীর এই কর্তব্যপরায়ণতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে খুব বেশি সময় লাগেনি আরতি বিশ্বাসের। তিনি নিজেও বুঝতে পারে তার স্বামী ভালো কাজের সঙ্গেই রয়েছেন। এখন স্ত্রীর পুরোপুরি সমর্থন থাকে তার সব কাজে। স্ত্রী মানলেও সত্যজিতের কিছু আত্মীয় মেনে নিতে পারেননি। তারা মনে করেন, নিজের বিয়েতে ছুটি না নেওয়া একমাত্র পাগলের পক্ষেই সম্ভব।

কিন্তু কিসের অনুপ্রেরণায় এমন দায়িত্ববোধ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিরাট কিছু অর্জনের জন্য কখনই কিছু করিনি। সত্যি বলতে এটা নিয়ে কখনো সেভাবে ভাবিনি। আমি এই স্কুলের বিজ্ঞান ও গণিতের একমাত্র শিক্ষক। ছুটি নিলে ছাত্রদের ক্লাস নেওয়ার কেউ থাকবে না।’

অসুস্থতা, পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠান বা ঝড়-বৃষ্টির কারণে কর্মস্থলে যাওয়ায় বিঘ্ন ঘটতেই পারে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও ঘড়ি ধরে স্কুলে গেছেন দুই সন্তানের জনক সত্যজিৎ। তিনি বলেন, বর্ষার দিনে ব্যাগের মধ্যে প্যান্ট, জামা ও জুতা নিয়ে স্কুলে গিয়ে পড়তেন। প্রতিদিন সকাল ৭টার দিকে তিনি স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হতেন। অন্তত আধা ঘণ্টা আগে পৌঁছে যেতেন।

সেসব কষ্টের দিনের কথা স্মরণ করে চোখ আর্দ্র হয়ে ওঠে সত্যজিতের। চোখ মুছে বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক হয়ে গেছে। ওদের না দেখলেই বরং আমার কষ্ট হয়।’

সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক এখন তিনি। দুই সন্তানকে সুশিক্ষিত করতে পেরেছেন। ছেলে অভিজিৎ বিশ্বাস পরিসংখ্যানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। আর মেয়ে প্রিয়ংকা বিশ্বাস লেখাপড়া করছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান  ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পশুপালন বিভাগে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর