Alexa চোগলখুরি: শক্রতার আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে

ঢাকা, সোমবার   ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ১ ১৪২৬,   ১৬ মুহররম ১৪৪১

Akash

চোগলখুরি: শক্রতার আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৫২ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২০:৫৪ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

মানুষের পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ, সন্দেহ সংশয় বাধানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে প্রকাশ করাই হচ্ছে চোগলখুরি। এ ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত্য, এটা হারাম।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে সূরা আল কালামের ১০, ১১ নম্বর আয়াতে বলেন, 

وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَّهِينٍ

‘যে অধিক শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।’

هَمَّازٍ مَّشَّاء بِنَمِيمٍ

‘যে পশ্চাতে নিন্দা করে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে ফেরে।’

আরো পড়ুন>>> প্রকৃত মুসলমানের পরিচয়

সহীহ বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে, ‘চোগলখোর জান্নাতে যাবে না।’ অপর হাদিসে আছে যে, একবার রাসূল (সা.) দু’টি কবরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, ‘এই দু’টি কবরের অধিবাসীদ্বয় আজাবে ভুগছে। তবে কোনো বড় ধরনের গুনাহের জন্য তারা আজাবে ভুগছে না। একজন পেশাব করে ভালোভাবে পবিত্র হত না। আর অপর জন চোগলখুরি করে বেড়াত। অতঃপর তিনি খেজুরের দু’টি কাঁচা ঢাল নিয়ে উভয়ের কবরে একটি করে গেড়ে দিলেন এবং বললেন, ঢাল দুটো না শুকানো পর্যন্ত হয়ত ওদের আজাব কম থাকবে।’

এই হাদিসে ‘কোনো বড় ধরনের গুনাহের জন্য তারা আজাবে ভুগছে না’ এ উক্তির অর্থ এই যে, তাদের ধারণায় তাদের কৃত গুনাহ তেমন বড় ধরণের ছিল না। এ জন্য কনো কোনো রিওয়াতে আছে যে, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তবে অবশ্যই তা বড় গুনাহ ছিল।’ 

সহীহ, বুখারী, মুসলিম ও মুওয়াত্তায়ে ইমাম মালিক হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমরা সবচেয়ে অধম লোক দেখতে পাবে সেই ব্যক্তিকে, যে বিভিন্ন জনের কাছে গিয়ে নিজেকে বিভিন্ন আকারে প্রকাশ করে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ায় দু’মুখো করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাকে দু’টো আগুনের জিহ্বা দেবেন। দো’মুখো আচরণ দ্বারা বুঝায় দু’জনের সঙ্গে দু’রকমের কথা বলা। 

ইমাম গাজ্জালী (রহ) বলেছেন, ‘দো’মুখো লোক বলতে সাধারণত, চোগলখোরকে বুঝানো হয়ে থাকে, একজনকে গিয়ে বলে, অমুক তোমার সম্পর্কে এরুপ কথা বলেছে। সংশ্লিষ্ট দু‘পক্ষের যে কোনো পক্ষ অথবা তৃতীয় কোনো পক্ষ যে গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করা অপছন্দ করে, সেটার প্রকাশ করাই চোগলখুরি, চাই তা কথা, লেখা ইশারা ইংগিত বা অন্য যে কোনো মাধ্যমে করা হোক না কেন, এবং প্রকাশিত বিষয়টি কথা, কাজ বা কোনো দোষক্রটি যা-ই হোক না কেন।

মোটকথা হলো ‘চোগলখুরি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কেউ অথবা তৃতীয় কেউ অপছন্দ করে এমন কোনো গোপন তথ্য ফাঁস করা। মানুষের যে অবস্থাই নজরে পড়ুক না কেন, তা অন্য কারো কাছে প্রকাশ করাই যদি সমাজের উপকার না হয় বা তা দ্বারা সমাজকে কোনো গুনাহ থেকে রক্ষা করা না যায়, তাহলে তা থেকে বিরত থাকা উচিত।’

ইমাম গাজ্জালী আরো বলেছেন, ‘যার কাছে কেউ কারো সম্পর্কে চোগলখুরি করে এবং বলে যে, অমুক তোমার সম্পর্কে এই এই কথা বলেছে। তার উচিত ছয়টি কাজ করা, প্রথমত: তাকে অবিশ্বাস করবে। কেননা সে একজন চোগলখোর ও ফাসেক। সে বিশ্বাস যোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত: তাকে ওই কাজ থেকে বিরত থাকতে বলবে, কাজটি তীব্র সমালোচনা করবে এবং সদুপদেশ দেবে। তৃতীয়ত: তাকে মন থেকে ঘৃণা করবে, কেননা সে আল্লাহর কাছে ঘৃণিত। আর আল্লাহর ঘৃণিত ব্যক্তিকে ঘৃণা করা ওয়াজিব। চতুর্থত: যে ব্যক্তির সম্পর্কে চোগলখোর খারাপ সংবাদ দিয়েছে, তার  সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে খারাপ ধারণা পোষণ করবে না। কেননা আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা বেশি বেশি ধারণা পোষণ থেকে বিরত থাকবে। কেননা কিছু কিছু ধারণা গুনাহ হয়। পঞ্চমত: তার বর্ণিত সংবাদকে এতটা গুরুত্বও দেবে না যে, সত্য সত্য তদন্ত করতে আরম্ভ করে দেবে। কেননা আল্লাহ বলেন,  ‘তোমরা গোয়েন্দাগিরি করো না।’ ষষ্ঠত: চোগলখোরকে দেয়া উপদেশ নিজেই যেন  লংঘন না করে। চোগলখোর যা বলেছে, তা নিয়ে সে নিজে যেন অন্যের সঙ্গে আলোচনা না করে।

বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি হজরত ওমর ইবনু আব্দুল আজিজকে কারো সম্পর্কে একটি খারাপ খবর দিল। তিনি বলেন, তুমি যদি চাও তাহলে তোমার ওপর এই আয়াত প্রযোজ্য হবে, ‘তোমাদের কাছে কোনো ফাসেক যদি কোনো খবর নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা নিয়ে তদন্ত চালাও।’ আর যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তাহলে তোমার ওপর এই আয়াত প্রযোজ্য হবে,‘যে পশ্চাতে নিন্দা করে, যে একের কথা অপরের কাছে লাগায় ‘ আর যদি তুমি চাও, তোমাকে মাফ করে দিই সে বললো, আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহ ক্ষমা করুন। আমি আর এ কাজ করব না।’

হজরত হাসান বসরি বলেন, ‘যে ব্যক্তি তোমার কাছে অন্যের কথা লাগায়, জেনে রেখ, সেও তোমার কথা অন্যের কাছে লাগায়।’

এক ব্যক্তি জনৈক বিশিষ্ট আলেমের নিকট এসে অপর একজনের নামে বিভিন্ন দুর্নাম আরোপ করতে লাগল। তখন ওই আলেম বলেন, ‘তুমি আমার কাছে তিনটি অপরাধ করেছ। প্রথমত: আমার এক দ্বীনী ভাই এর প্রতি আমার মনে ক্ষোভ ও বিদ্বেসের সৃষ্টি করেছ। দ্বিতীয়ত: তার কারণে আমার মনকে দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত করেছ। তৃতীয়ত: তুমি আমার কাছে বিশ্বস্ততা হারিয়েছ। কোনো কোনো মনীষী বলতেন, ‘যে ব্যক্তি কারো গালি তোমার নিকট পৌছায়, সে যেন নিজেই তোমাকে গালি দেয়’

এক ব্যক্তি হজরত আলী (রা) এর নিকট এসে বললো, অমুক আপনার নামে দুর্নাম রটিয়েছে ও গালি দিয়েছে। তিনি বললেন, আমাকে তার কাছে নিয়ে চল। সে তাকে ওই ব্যক্তির কাছে নিয়ে গেল। লোকটি ভেবেছিল, হজরত আলী তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেবেন। কিন্তু তিনি তাকে গিয়ে বললেন, ‘ওহে ভাই! তুমি যা বলেছ, তা যদি সত্য হয়, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।’

কোনো কোনো তাফসীরকার সূরা লাহাবের যে জায়গায় আবু লাহাবের স্ত্রী’কে ‘হাম্মালাতাল হাতাব’ বলা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, এর শাব্দিক অর্থ বহনকারিণী। সে একজন চোগলখোর ছিল। চোগলখুরি স্বাভবটাকে কাষ্ট বলা হয়েছে, কেননা কাষ্ট যেমন আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে, তেমনি চোগলখুরি দু’জনের মধ্যে শক্রতার আগুন জ্বালাতে সাহায্য করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে