চোখের সামনে ‘নাই’ হয়ে যায় টাকা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৭ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৪ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪১

Akash

চোখের সামনে ‘নাই’ হয়ে যায় টাকা

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৪৮ ৭ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৯:০১ ৭ মার্চ ২০২০

সম্প্রতি দেশি-বিদেশি জাল মুদ্রাসহ আটক চার প্রতারক। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সম্প্রতি দেশি-বিদেশি জাল মুদ্রাসহ আটক চার প্রতারক। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কিছু বুঝে উঠার আগেই ‘নাই’ হয়ে যাবে টাকা- এটা কোনো জাদু নয়, বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙ্গানোর নামে গড়ে উঠা চক্রের হাতের কারসাজি। শুধু তাই নয়, এক বান্ডিল সৌদি রিয়াল কম দামে কিনে বাসায় গিয়ে দেখলেন ভেতরে সব সাদা কাগজ।

বিদেশ যাওয়ার সময় খুচরা কিছু ডলারের প্রয়োজন পড়ল। কিনে নিলেন মতিঝিলের ভ্রাম্যমাণ ডলার বিক্রেতাদের কাছ থেকে। বিদেশ গিয়ে জানতে পারলেন সেগুলো জাল ডলার। এটা বৈদেশিক মুদ্রা প্রতারক চক্রের কাজ। তাই এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ বৈদেশিক মুদ্রা কেনা-বেচা চক্রের সঙ্গে লেনদেন না করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙ্গানোর নাম করে জাল নোট গছিয়ে দেয়া ও হাতের কারসাজিতে টাকা কম দেয়ার মতো প্রতারণার ঘটনা ঘটছে রাজধানীতে। 

রাজধানীর মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকায় বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙ্গানোর নামে গড়ে উঠেছে একটি প্রতারক চক্র। চক্রের সদস্যরা ওৎ পেতে থাকে ব্যাকগুলোর আশপাশে। 

বিদেশ ফেরত সাধারণ মানুষ ওই এলাকায় বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙ্গাতে ব্যাংকে প্রবেশের আগেই তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায় চক্রের সদস্যরা। দেয়া হয় ব্যাংক রেটের চেয়েও অধিক বিনিময় মূল্যেও প্রস্তাব। অনেকে তাদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে পা দেয় তাদের প্রলোভনে। 

প্রতারক চক্রের প্রস্তাবে সাড়া দিতেই চক্রের একাধিক সদস্য ঘিরে ধরে ওই ব্যাক্তিকে। তারা মুদ্রা ভাঙ্গাতে আসা ব্যাক্তির কাছে প্রথমে জানতে চায় তিনি কোন দেশের কত টাকা ভাঙ্গাবেন। এরপর ক্যালকুলেটরে হিসাব করে বাংলাদেশি টাকা হস্তান্তর করে ওই ব্যাক্তির কাছে। বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য তারা আগেই ওই ব্যাক্তির কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ করে না। মুদ্রা ভাঙ্গাতে আসা ব্যাক্তির হাতে বাংলাদেশি টাকা দেয়ার পর তাকে বলা হয়- ‘আপনি টাকা গুণে দেখেন ঠিক আছে কিনা।’  টাকা গুণে ঠিক আছে বলার পর চক্রের আরেক সদস্য ‘দেন আবারো গুনে দেই’ বলে তার হাত থেকে টাকা নিয়ে নেন। আর তখনই হাতের কৌশলে ওই ব্যাক্তির সামনেই মুহূর্তেই বেশ কিছু টাকা সরিয়ে ফেলেন তারা।

চক্রের সদস্যরা ওই ব্যাক্তির সামনে এভাবে টাকা গুণে দেখাবে যে তিনি দেখবেন টাকা ঠিকই আছে। ‘টাকা ঠিক আছে’ বলার পর ওই ব্যাক্তির কাছে টাকা হস্তান্তর করা হবে। এরপর তার কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে দ্রুতই সেই স্থান ত্যাগ করে চক্রের সদস্যরা। সেই ব্যাক্তি যখন বাসায় গিয়ে টাকা গুণবেন তখন দেখবেন সেখানে বেশ কিছু টাকা কম। কিন্তু ততক্ষণে তার আর কিছুই করার থাকে না।

এরকমই প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন লন্ডন প্রবাসী আব্দুল হাকিম। তিনি তার ছোট ভাইকে ৫শ’ পাউন্ড ভাঙ্গানোর জন্য পাঠান ব্যাংকে। তার ভাই অধিক লাভের আশায় ব্যাংকের বাইরে থেকে পাউন্ডগুলো ভাঙ্গান। বাসায় আসার পর দেখতে পান সেখানে ১০ হাজার টাকা কম আছে। যদিও প্রতারক চক্রটি তার সামনেই ৬৫ হাজার টাকা গুণে দেখিয়েছিল। এর আগে তিনি নিজেও ৬৫ হাজার টাকা গুণে দেখেন।

টাকা কম দেয়া ছাড়াও এই চক্র বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে আসা সাধারণ মানুষের সঙ্গেও জাল বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে প্রতারণা করছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে দেশি জাল টাকা চেনা কখনো কখনো সম্ভব হলেও অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই বিদেশি জাল নোট চেনা সম্ভব না। আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে প্রতারক চক্রটি। 

বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙ্গাতে আসা মানুষদের তারা যেমন ব্যাংক রেটের চাইতেও বেশি মূল্য প্রস্তাব করেন তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে আসা ব্যাক্তিদের তারা প্রস্তাব দেন ব্যাংক রেটের চাইতেও কম রেটে মুদ্রা বিক্রির। 

সাধারণ মানুষ তাদের প্রলোভনে পা দিলে তারা আসল বৈদেশক মুদ্রার সঙ্গে নকল মুদ্রা মিশিয়ে দেন।

সম্প্রতি র‌্যাব-৩ এর কাছে এরকম একটি অভিযোগ আসে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত বুধবার র‌্যব অভিযান চালায় মতিঝিলের দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রধান শাখার সামনের রাস্তায়। দেশি-বিদেশি জাল মুদ্রাসহ আটক করা হয় চারজনকে। আটককৃতরা হলেন- চঞ্চল মীর ওরফে সৈয়দ আলী, মো.  আব্দুল জব্বার, মোসাদ্দেকুর রহমান ও নূর সাইদ মিঠু। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১০টি জাল ইউ এস ১০০ ডলার, বাংলাদেশি এক হাজার টাকার জাল নোট ১০টি, ব্রিটিশ জাল নোট ৫ পাউন্ড ১০টি, ৫ ইউরো জাল নোট ২০টি, ওমানের ১০০ বাইশা জাল নোট ১০টি উদ্ধার করা হয়। 

অভিযানে অংশগ্রহণকারী র‌্যাব-৩ এর অপারেশন ইনচার্জ উপ পরিদর্শক আবু নোমান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বিদেশগামী অনেকের খুচরা বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। প্রথমে তাদেরকে টার্গেট করে চক্রের কোনো সদস্য। পরে ওই ব্যাক্তিকে নিয়ে আসা হয় চক্রের অন্য এক সদস্যের কাছে। টার্গেট করা ব্যাক্তিকে বলা হয়, তারা এসব বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের কাছ থেকে। তাদের কথায় বিশ্বাস করে বিদেশগামীরা বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করেন। এরপর বিদেশ গিয়ে ওইসব মুদ্রা ব্যবহার করতে গিয়ে নানান ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হন তারা। দিলকুশা কেন্দ্রিক জাল মুদ্রা বিক্রি চক্রের সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১২ জন। জাল বৈদেশিক মুদ্রার উৎসগুলো সম্পর্কে তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি। 

শুধু মতিঝিলই নয়, রাজধানীর অভিজাত এলাকাতেও চলছে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির নামে প্রতারণা। গত মঙ্গলবার মহাখালী থেকে সেন্টু মুন্সি ও দেলোয়ার মোল্লা নামে এরকম দুই প্রতারককে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। 

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন জানান, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে রিয়াল কিংবা অন্য কোনো বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে প্রতারণা করে আসছিল। এক্ষেত্রে চক্রের সদস্যরা দামী গাড়িকে টার্গেট করতেন। গাড়ির আরোহীর কাছে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার বান্ডিল দেখিয়ে খুব কম দামে তা বিক্রির প্রস্তাব দিতো তারা। মূলত তাদের মুদ্রার বান্ডিলে প্রথম ও শেষ নোটটি থাকতো আসল। ভেতরে থাকতো নোটের আকৃতির সাদা কাগজ। দ্রুততার সঙ্গে খুব কৌশলে তারা এসব নোটের বান্ডিল হাতবদল করে টাকা নিয়ে সটকে পড়তেন। তাই প্রলোভনে পড়ে এ ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা কেনা-বেচা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। 
 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএএম