Alexa চীনের মানুষরূপী সাদা সাপ (পর্ব ১)

ঢাকা, শুক্রবার   ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২২ ১৪২৬,   ০৯ রবিউস সানি ১৪৪১

চীনের মানুষরূপী সাদা সাপ (পর্ব ১)

মেহেদী হাসান শান্ত  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪৫ ১৩ জুলাই ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

এক ইউনানী চিকিৎসক দারুণ সমস্যায় পড়লেন। মাত্রই তিনি নিজের মালিকানাধীন একটি ওষুধের দোকান খুলেছেন। তবে ওষুধ সরবরাহের জন্য তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে আগে যে চিকিৎসকের অধীনে কাজ করেছেন তার ওপর। কিন্তু আগের চিকিৎসক তাকে চক্রান্ত করে সবসময় পচা ওষুধি গাছ বুঝিয়ে দিয়েছেন। শু শিয়ান নামক ওই চিকিৎসক যখন এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজছেন, তখনই হঠাৎ করে তার দোকানে রোগী উপচে পড়তে লাগল।

শহরে ইতোমধ্যেই প্লেগের উপদ্রব ছড়িয়ে পড়েছে, এদিকে শু শিয়ানের কাছে নেই কোনো ওষুধ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় চিকিৎসক তখন যেন চিন্তার অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন। এমন সময়ে শিয়ানের স্ত্রী (যার নাম ছিল বাই সু ঝেন) পচা ঔষধি গাছ থেকেই ওষুধ তৈরির একটি রেসিপি নিয়ে এলেন স্বামীর কাছে। বাই সু ঝেনের ওষুধ সেবন করে শহরের সব প্লেগ আক্রান্ত রোগীরা সুস্থ হয়ে উঠলেন। এমনকি শু শিয়ানের আগের চাকরিদাতাও তার পরিবারের চিকিৎসার জন্য তার শরণাপন্ন হলেন। 

এর কিছুদিন পরে ফা হাই নামক এক সন্ন্যাসী শু শিয়ানের কাছে এলেন। সন্ন্যাসী শিয়ানকে জানালেন, তার পরিবারে লুকিয়ে আছে এক শয়তান। সেই শয়তান আর কেউ নয়, শিয়ানের স্ত্রী বাই সু ঝেন। একথা শুনে শু শিয়ান হেসে উঠলেন। তার সহৃদয়বান, গুণবতী স্ত্রীকে কীভাবে কেউ শয়তান বলতে পারেন তা তার মাথায় এলো না। কিন্তু ফা হাই নাছোড়বান্দা। তিনি তার বক্তব্য প্রমাণ করেই ছাড়বেন। তাই তিনি শু শিয়ানকে বললেন, চৈনিক পঞ্চম মাসের পঞ্চম দিনে তার স্ত্রীকে বিশেষ ‘রিয়ালগার মদ’ খাওয়াতে। কারণ ওইদিন শয়তানের শক্তি সবচেয়ে দুর্বল হয়ে যায়! 

ফা হাই আরো ব্যাখ্যা করলেন, যদি বাই সু ঝেন শয়তান না হয়ে থাকেন তবে তার কোনো ক্ষতিই হবে না। তবে শু শিয়ানের এই অদ্ভুত পরীক্ষার প্রতি কোনো আগ্রহ জন্মাল না। নিজের সতীসাধ্বী স্ত্রীকে তিনি কেনই বা উড়ে এসে জুড়ে বসা এক সন্ন্যাসীর কথায় পরীক্ষা করতে যাবেন! তাই তিনি সন্ন্যাসীকে ভদ্রভাবে বিদায় দিয়ে দিলেন।  

কিন্তু ফা হাইয়ের বলে যাওয়া দিনটি আসার পর শু শিয়েন চাইলেন স্ত্রীকে একটু পরীক্ষা করে দেখতে। তাই তিনি সন্ন্যাসীর দিয়ে যাওয়া মদ স্ত্রীকে খেতে দিলেন। সেই রিয়ালগার মদ ঠোঁটে লাগানোর সাথে সাথেই স্ত্রী বাই সু ঝেন দৌড়ে তাদের শোবার ঘরে চলে যান এবং স্বামীকে বলতে থাকেন তিনি খারাপ বোধ করছেন। স্ত্রীর এই তাৎক্ষণিক অসুস্থতায় উদ্বিগ্ন হয়ে শু শিয়ান দ্রুত গিয়ে কিছু ওষুধ বানিয়ে নিয়ে আসেন। 

তবে ওষুধ নিয়ে ঘরে ফিরে তিনি যা দেখলেন তার জন্য শু শিয়ান একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি দেখলেন, তার বিছানায় বউয়ের বদলে শুয়ে হিসহিস করছে এক প্রকাণ্ড বড় সাদা সাপ। টকটকে লাল জিহবা বের করে সাপটি ফোসাচ্ছিল। এই অবস্থা দেখে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে তখনই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন শু শিয়ান। 

যখন শু শিয়ানের স্ত্রী বাই সু ঝেন নিজেকে সামলে নিয়ে সাপ থেকে মানুষে রূপান্তরিত হলেন, ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। তার স্বামী তখন মৃত। আসলে বাই সু ঝেন ছিলেন অমর এক সাপ, যার ছিল আধ্যাত্মিক সব জাদুকরী ক্ষমতা। মানুষের রূপ ধারণ করতে তিনি সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন এবং তার স্বামীর ভাগ্যোন্নয়ন করেছিলেন। তবে তিনি তার জাদুকরী বিদ্যা দিয়ে স্বামীকে বাঁচাতে পারলেন না। 

শু শিয়ানকে বাঁচাতে বাই সু ঝেন অন্য একটি পন্থা বেছে নিলেন। সন্ধান করে একটি উদ্ভিদ বের করলেন যেটি মানুষের আয়ু বহু বছর বাড়িয়ে দিতে পারে এবং মৃতকেও জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে। দক্ষিণ মেরুর নিষিদ্ধ পাহাড় কুন লুনের এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে ছিল সেই উদ্ভিদ। বাই সু ঝেন মেঘের ওপর চড়ে সেই পাহাড়ে যাত্রা করলেন। এরপর পায়ে হেঁটে সেই পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে ‘মরণশীলদের জন্য নয়’ লেখা একটি গেটের কাছে পৌঁছুলেন। সেখানে ছিল রূপার তৈরি একটি সেতু। 

সেতুর ওপারে পাখি ও হরিণের রূপ ধরে বৃদ্ধ লোকটির দু’জন নিরাপত্তারক্ষী দাঁড়িয়ে থেকে উদ্ভিদটি পাহারা দিচ্ছিলেন। বাই সু ঝেন তখন তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ব্যবহার করে এক সন্ন্যাসীর রূপ ধারণ করলেন। তিনি নিরাপত্তারক্ষীদের বললেন দেবতাদের এক সভায় বৃদ্ধ লোকটিকে আমন্ত্রণ জানাতে অনেক পথ অতিক্রম করে তিনি এসেছেন। যখন এই বার্তাটি নিয়ে নিরাপত্তারক্ষীরা ভেতরে বৃদ্ধের কাছে গেল, সুযোগ বুঝে বাই সু ঝেন ওই গাছের কিছু পাতা ছিঁড়ে নিয়ে পালালেন।  

কিছুক্ষণ পরেই নিরাপত্তারক্ষীদের বুঝতে বাকি রইল না যে, তারা ধোঁকা খেয়েছেন। তার বাই সু ঝেনের পিছু নিলেন। ঝেন তখন কাশি দিয়ে নিজের ভেতর থেকে একটি জাদুর বল বের করে এক নিরাপত্তারক্ষীর দিকে ছুঁড়ে মারলেন। একজনকে হটানো গেলেও পাখির বেশধারী অন্য নিরাপত্তা রক্ষী রাই সু ঝেনের বেশ কাছে চলে এলে উপায়ন্তর না দেখে তিনি উদ্ভিদের পাতাগুলো নিজের জিহ্বার নিচে রাখলেন। মুহূর্তে দু’জনই নিজেদের আসল রূপ সাপ ও সারস পাখিতে পরিণত হলেন। তখন বৃদ্ধ লোকটি ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন।  

বৃদ্ধ সাপরূপী সু ঝেনকে জিজ্ঞেস করলেন, অমর হওয়া সত্ত্বেও সে কেন ঐ গাছের পাতা চুরি করতে গেল? তখন স্বামী শু শিয়েনের প্রতি ভালোবাসার কথা সু ঝেন বৃদ্ধকে খুলে বললেন। সু ঝেন বললেন, যদিও তার স্বামী জেনে গেছে সে একটি শয়তান এবং আর হয়তো তার সঙ্গে থাকতে চাইবেন না, তবুও স্বামীকে সে জীবন ফিরিয়ে দিতে চায়। সু ঝেনের এই ভালোবাসার কারণ জানতে চাইলে সে বলে, বহুকাল আগে আমি যখন একটা ছোট্ট সাপ ছিলাম, তখন আমাকে এক রাখাল মেরে ফেলতে চেয়েছিলো। তখন শু শিয়ান এসে আমাকে বাঁচান। যদিও আমি অমর, কিন্তু তিনি তো তা জানতেন না। শু শিয়ানের আগের জন্মের সেই প্রতিদান আমি এই জন্মে দিতে চাই।’

সু ঝেনের গল্পে আকৃষ্ট হয়ে বৃদ্ধ সেই বৃক্ষের পাতাসহই তাকে স্বামীর কাছে যেতে দিলেন। দ্রুত সেই জাদুকরী বৃক্ষের পাতা নিয়ে সু ঝেন মেঘের ওপর চড়ে স্বামীর কাছে গেল ও তার জীবন ফিরিয়ে আনল। চোখ খুলে শু শিয়ান আগের কিছু মনে না রেখে চোখের সামনে স্ত্রীকে দেখতে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন এবং জড়িয়ে ধরলেন। চীনে প্রচলিত অতি বিখ্যাত সাদা সাপের কল্প কাহিনীর প্রথম অংশ এটুকুই। এরপর কি হলো? ফা হাই কি নতুন কোনো চক্রান্ত নিয়ে এলো? নাকি শু শিয়ান ও সু ঝেন আজীবন সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকল? জানতে হলে অপেক্ষায় থাকতে হবে দ্বিতীয় পর্বের। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস