চিরবসন্তের পাহাড়ি জনপদ আগমলোক

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

বিদেশে ঈদ ভ্রমণ-৪

চিরবসন্তের পাহাড়ি জনপদ আগমলোক

সজল জাহিদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:২৫ ২৭ মে ২০১৯   আপডেট: ১১:৩৩ ২৭ মে ২০১৯

পাহাড়ি জনপদ আগমলোক মুগ্ধ করে সবাইকে

পাহাড়ি জনপদ আগমলোক মুগ্ধ করে সবাইকে

দার্জিলিং যে বার প্রথম গিয়েছিলাম, হিমেল হাওয়া পুরো পাগল করে দিয়েছিলো। জায়গাটির সৌন্দর্য নিয়ে কোনো কথাই বোধহয় যথেষ্ট নয়। তুষারময় শৃঙ্গ থেকে সবুজ পাহাড়ের প্রশান্তি, এ এক সুন্দরের সাম্রাজ্য। দার্জিলিং পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শৈলশহর। এর সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য অঢেল। লাল রডোডেনড্রন, সাদা ম্যাগনোলিয়া, পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে সবুজ চা গাছের বাহার, বনাঞ্চল, ঘরে এসে পড়া মেঘরাজি- সবমিলিয়ে দার্জিলিংকে পাহাড়ের রানি করে তুলেছে। ভোরের কাঞ্চনজঙ্ঘা এই রানির মাথার মুকুট। এখানে এলেই টয় ট্রেনের বাঁকে হারিয়ে যাওয়া প্রেমকে খুঁজে পাওয়া যায়।

এরপরই যাওয়া হলো সিকিমে। এ যেন বরফের রাজ্য! সিকিমে হিমালয় পর্বতমালার পাশাপাশি আরো আছে লেক, ঝরনা, হাজারো মনেস্ট্রি, প্যাগোডা ইত্যাদি। এই সৌন্দর্যের কারণে সিকিমকে বলে স্বর্গ। সেই কিশোর বয়সে 'গ্যাংটকে গন্ডগোল' পড়ার সময়ই ওখানে যেতে মনটা আনচান করতো। কিন্তু তখন কি আর চাইলেই যাওয়া যায়! এখন সময় বদলেছে, সুযোগও হয়েছে। কিস্তু আজ আপনাদের শোনাবো আগামলোক এর গল্প। এখানে এখনো বাংলাদেশিদের খুব বেশি পায়ের ধুলো পড়েনি। অথচ সেটা সিকিমের কাছেই।

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে সিল্করুটের প্রবেশদ্বার লিংতাম। পুলিশ চেকপোস্টের একটু আগে বাম দিকে একটি রাস্তা উঠে গেছে। সামনেই পড়বে ডাকলাইন লিংতাম। খুব বেশি কিছু নেই এখানে, ১০/১২টা বাড়ি আর একটি মাঝারি মানের হোটেল। তবে জায়গাটা বেশ গোছালো। সেখান থেকে পাহাড়ি জনপদ আগমলোক-এর দিকে।

এখানে সাইকেল রাইড বেশ জনপ্রিয়, ভয়ঙ্করও বটে!

আগামলোকের সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হয় না। যেন নিঃস্তব্ধতার সঙ্গে মিশে রয়েছে প্রকৃতির অমোঘ টান। তবে আপনি যদি হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা বা বরফের আশা করে থাকেন, তবে এ জায়গা আপনার জন্য না! এখানে এসে সাদা বরফের রাজ্যে হারিয়ে যেতে পারবেন না, কিন্তু মনের শান্তি মিলবে সেটা গ্যারান্টি! সাদা মেঘই নয়, অনেক কিছুই নেই এখানে। শীতের কাপড়ের দোকান, উন্নতমানের হোটেলসহ অনেক কিছু। তবে দোকান গ্রামবাসীদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সম্ভার নিয়ে খোলা থাকে কয়েকটি দোকান। বিশেষ কোনো জিনিস যদি কিনতেই হয় লিংতাম আসার আগে, ৯ কিলোমিটার দূরের রঙ্গলি থেকে কিনবেন।

বরফপ্রেমীদের যেতে হবে লিংতাম থেকে সিল্ক রুটের পথে কুপুপ পর্যন্ত। আগমলোক থেকে পদমচেন হয়ে ৭-৮ ঘণ্টায় বরফে মোড়া পথে ঘুরে আসতে পারেন জুলুক, নাথাং ভ্যালি, পুরোনো বাবা মন্দির হয়ে কুপুপ। গাড়ি লিংতাম থেকেই পাবেন। সুদূর অতীতে এই পথেই ভারতবর্ষের ব্যবসায়িদের সঙ্গে বাণিজ্য চলত মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িদের। যদি সিল্করুট যেতে চান, শীতের কাপড় সঙ্গে অবশ্যই নিবেন। তবে জায়গাটিতে যেতে হলে রঙ্গলি থেকে অনুমতি নিতে হয়।

আগমলোকের চারদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। প্রায় ৬০০০ ফুট উচ্চতায় থাকা জায়গাটি আপনাকে নিশ্চিত মুগ্ধ হতে বাধ্য করবে। প্রচুর পর্যটক আজকাল সিল্ক রুট যাচ্ছেন। তারা বরফ দেখার নেশায় বুঁদ। তাই তারা আগমলোকের একটু নিচে দিয়ে সিল্করুটের পথে চলে যান, ছুঁয়েও দেখেন না সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে বসে থাকা ধ্যানমগ্ন আগমলোককে। অথচ তাদের আসা যাওয়ার পথের পাশেই পড়ে আছে এক অজানা আনকোরা অসামান্য সুন্দর এই জনপদ।

খিউ খোলা নামে ছোট্ট অথচ রূপসী এক নদী

যারা সত্যিই ঢেউ খেলানো উচুঁ উচুঁ সবুজ পাহাড়, বন্য প্রকৃতি ও সরল মানুষজনের সঙ্গে নিবিড় ভাবে কয়েকদিন অবকাশ যাপন করতে চান, তাদের জন্য আগমলোকের চেয়ে ভালো জায়গা আর হতেই পারে না! ডাকলাইন লিংতাম থেকে আগমলোকের দূরত্ব মাত্র দেড় কিলোমিটার। পিচ ঢালা রাস্তা ধরে পথে ঘুরে বেড়ান পাহাড়ের গায়ে ছবির মতো এঁকে দেয়া গ্রামগুলোতে।

এই জায়গায় আসার আগে সুপ্রাচীন গাছ ও অর্কিডে ঘেরা ঘন অরণ্য দেখার সময় নিয়ে আসবেন। সেখানে দেখতে পাবেন সরল পাহাড়ি মানুষদের সরল জীবন যাপন। আগমলোক-এর চারদিকে উচুঁ উচুঁ সবুজ ভরা পাহাড়ের সারি। মাথার উপর নীল আকাশ। পাহাড়ের ধারেই খিউ খোলা নামে ছোট্ট অথচ রূপসী এক নদী কলকল করে বয়ে চলেছে লিংতাম উপত্যকার বুক চিরে। তার তীর ধরে হেঁটে চলা, এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা।

আগামলোক এমন এক জায়গা, সেখানে নেই শীত, নেই গ্রীষ্ম। শুধু তাই নয় বর্ষাকালও নেই। এটিকে বলা যায় চিরবসন্তের দেশ। তাই এখানে আসতে পারেন সারা বছর। সাইকেল চালিয়ে চলে যেতে পারেন ঝরনার কাছে। আরো আছে পাখি। লিংতাম থেকে আগমলোক যাওয়ার পথে হাজার হাজার পাখির কলকাকলি আর প্রজাপতিদের সম্মেলনে মনে হবে স্বর্গ বুঝি এখানেই। আগমলোক থেকে সিঙ্গালিলা রেঞ্জ, ভুটানের পাহাড় সমেত নিচের ডাকলাইন এবং লিংতামের নয়নাভিরাম উপত্যকার দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।

ঝরনাগুলো ছোট হলেও সুন্দর

এখানে রয়েছে অসামান্য সুন্দর একটি মনাস্ট্রি। মনাস্ট্রির দেওয়ালে ম্যুরালের কাজ আপনাকে আকর্ষণ করবে। আগমলোক মনাস্ট্রির চারপাশের পরিবেশ যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। আগমলোকের সানরাইজ পয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাবরু, রাতং প্রভৃতি শৃঙ্গরাজির মাথায় সূর্য রশ্মির প্রথম চুম্বন আপনাকে মোহিত করবে। সব কিছু ঘুরে দেখনোর জন্য রয়েছে গাইডও। তবে একদম নামমাত্র খরচে পেয়ে যাবেন কাউকে না কাউকে।

আগমলোকে থাকার জন্য কয়েকটি হোটেল ও হোস্টেল রয়েছে। তবে আমরা ছিলাম হোটেল পালভেউ রিট্রিটতে। ডাকলাইন লিংতাম থেকে আগমলোক যাওয়ার পথে বাম দিকে পড়বে ছিমছাম হোটেলটি। খুব সুন্দর করে সাজানো লাউঞ্জ আর আটটি ঘর। লাউঞ্জে একটি অ্যাকোয়াস্টিক গিটার ঝঙ্কার তোলার অপেক্ষা করে আছে। পালভেউ রিট্রিটের ঘরে ঢুকলে বাইরে বেরোতে ইচ্ছে করবে না। কারণ, প্রতিটি ঘর থেকেই পাহাড়ের প্যানোরামিক ভিউ ও রোহিতের সদাহাস্য কর্মীদের দেয়া ধূমায়িত সেকেন্ড ফ্ল্যাশ দার্জিলিং চা। বিভিন্ন মেজাজ ও বিভিন্ন রুচির পর্যটকের জন্য বইয়ের ব্যবস্থা রেখেছেন রোহিত। বইয়ের সংগ্রহ দেখে যে কোনো পর্যটকের চোখ  কপালে উঠবে।

হোটেল পালভেউ রিট্রিট

হোটেলকর্মীদের খাবার পরিবেশনের ধরন দেখে আপনার নিজেকে রাজা মনে হতে পারে। দার্জিলিং ও সিকিমের ট্যুরিস্ট স্পটের হোটেলগুলোতে এক ঘেয়ে মেন্যু নিশ্চয়ই বছরের পর বছর ধরে খেয়ে আসছেন, যেমন ব্রেকফাস্টে পুরি-সবজি চা। লাঞ্চে আন্ডাকারি, ডাল, ভাত, সবজি, পাঁপড়। বিকেলে অনিয়ন পকোড়া ও চা। ডিনারে রুটি চিকেনের মতো এক ঘেয়ে মেন্যু।

ডাকলাইন লিংতাম ও আগমলোক যেকোনো সময় ঘুরে আসতে পারেন। সামনের ঈদে গেলেও মন্দ হয় না!

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে