চা এর ইতিহাস

ঢাকা, শুক্রবার   ২১ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৭ ১৪২৬,   ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

চা এর ইতিহাস

 প্রকাশিত: ১২:৪৯ ১০ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১২:৪৯ ১০ অক্টোবর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

চীন দেশের প্রচলিত একটি পৌরাণিক গল্প- সেখানে বাস করতেন শেন মং নামের এক কৃষক। ঘুরে বেড়িয়ে নতুন ফসল আবিষ্কার করা ছিল তার নেশা। গল্পটি এতটাই পুরাতন যখন বর্তমান প্রচলিত খাদ্য শস্য যেমন- ধান, গম, যব ইত্যাদির প্রচলন ছিল না। তো কৃষক মহাশয় একদিন খাবার উপযোগী শস্য এবং লতাপাতা আবিষ্কারের জন্য বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। অপরিচিত কোন শস্য বা লতাপাতা পেলে সেগুলো চেখে দেখছিলেন। যদিও সবগুলোই খাবার উপযোগী ছিল না। এভাবে সারাদিন যাবত ফসল আবিষ্কার অভিযানে নিজের অজান্তেই শরীরে ৭২ এরও বেশি প্রকারের বিষ প্রবেশ করিয়ে ফেলেন।

সন্ধ্যায় একটি গাছের তলায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মং। বিষক্রিয়া দ্রুত তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। বসে বসে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। তারপর হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটি অপরিচিত পাতা এসে মুখে পড়ল। অবচেতন মনে পাতাটি চিবুতে লাগলেন। এবং সেই ভেষজ পাতার গুণে শরীর থেকে বিষক্রিয়া বিদায় নিল, পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন তিনি। চীনারা দাবি করে, সেই পাতাটি ছিল মূলত চা পাতা। আর এভাবেই হয় সর্বপ্রথম চা এর আবিষ্কার। কিন্তু সত্যি বলতে এটি নিছক গল্প মাত্র। আমরা জানি বিষক্রিয়া কমানোর কোনো ক্ষমতা চায়ের নেই। কিন্তু গল্পটি থেকে বোঝা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই চীনে চায়ের কদর কত বেশি! তবে, চা গাছ আবিষ্কারের আসল ইতিহাসটা কেমন?

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ বিশ্লেষণ করে পাওয়া যায়, চীনে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে চায়ের চাষ শুরু হয়। আরো সুনির্ধারিত ভাবে বলতে গেলে মিশরের ফারাওরা যখন গিজা পিরামিড তৈরি করেন, তারও দেড় হাজার বছর আগে থেকে চীনে চায়ের চাষ হয়। চমৎকার বিষয় হলো, সেই প্রাচীন কালের চা গাছ এবং এখনকার চা গাছের মধ্যে বিন্দুমাত্র কোন তফাৎ নেই। তবে চা খাওয়ার রীতি তখন ছিল একদমই ভিন্ন। চা তখন ব্যবহার হত এক ধরনের শাক হিসেবে। চা খাদ্য থেকে পানীয়ের রূপ পায় 'মাত্র' পনেরশো বছর পূর্বে। যখন মানুষ বুঝতে পারে জল ও তাপের সমন্বয়ে এই সবুজ সুগন্ধি পাতা থেকে অনন্য এক ফ্লেভারযুক্ত পানীয় তৈরি করা সম্ভব।

পানীয় হিসাবে চায়ের প্রস্তুত প্রণালীর ওপরও চলে দীর্ঘদিন গবেষণা। চা পাতাকে তাপ দিয়ে এক বিশেষ ধরনের কেক তৈরি করে, সেটিকে পাউডারের মত চূর্ণ করে গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে মো নামের এক ধরনের পানীয় তৈরির সংস্কৃতি চালু হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মো'র জনপ্রিয়তা পুরো চীনে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে, চীনে একটি স্বতন্ত্র চা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এমনকি গল্প ও কবিতার বিষয় হিসেবে চা স্থান পায়। চিত্রশিল্পীদের জন্য চা একটি শিল্পমাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। চা এর উপর ফেনা তৈরি করে তারা অসাধারণ সব চিত্রকর্ম তৈরি করতেন, অনেকটা এখন কফির ওপরে যেমন ক্রিমআর্ট দেখি; তেমনটা।

খ্রিস্টীয় নবম শতকে এক জাপানী সন্ন্যাসী সর্বপ্রথম জাপানে চা গাছ নিয়ে আসেন। চায়ে জাপানীরা এতই মজে গিয়েছিল যে তারা নিজস্ব চা উৎসবের আয়োজন করে। চতুর্দশ শতাব্দীতে মিং রাজবংশের শাসনামলে চীনের সেরা তিন রপ্তানি পণ্য ছিল পোর্সেলিন, রেশম ও চা। ষোড়শ শতকে ডাচরা প্রচুর পরিমানে চীন থেকে চা নিয়ে অাসলে ইউরোপে এর ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। পৃথিবীব্যাপী চায়ের ব্যাপক বিস্তৃতির জন্য অনেকেই একজন পর্তুগিজ ভদ্রমহিলাকে কৃতিত্ব দেন, তিনি রানী ক্যাথেরিন অফ ব্রাগানজা। রানী ক্যাথেরিন ছিলেন চায়ের অসম্ভব ভক্ত, ১৬৬১ সালে তার সঙ্গে বৃটেনের রাজা দ্বিতীয় চার্লসের বিয়ে হয়। এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারে চায়ের প্রবেশ ঘটে।

এরপর বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশরা বিশাল উপনিবেশ সৃষ্টি করার পাশাপাশি সেসব স্থানে চায়ের প্রচলনও ঘটায়। ইউরোপে চা এর জনপ্রিয়তা এতই বৃদ্ধি পায় যে, সপ্তদশ শতকে কফির থেকে ১০ গুণ বেশি দামে চা বিক্রি হতো বলে রেকর্ড রয়েছে! কিন্তু তখনো চীন ছাড়া অন্য কোথাও চায়ের চাষ হতো না। ইউরোপীয় বণিক শ্রেণীর মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা লেগে যেত তারা কত বড় জাহাজে চীন থেকে চা আনতে পারে! ব্রিটিশরা প্রথমে রুপার বিনিময়ে চীন থেকে চা নিয়ে আসতো। কিন্তু পরবর্তীতে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে তারা আফিম ব্যবহার শুরু করে। এই বিষয়টি চীনে সমস্যা সৃষ্টি করে, কারণ প্রচুর মানুষ আফিমে আসক্ত হয়ে যায়। এজন্য ১৮৩৯ সালের দিকে এক চীনা কর্মকর্তার নির্দেশে আফিম ভর্তি সকল ব্রিটিশ জাহাজ ধ্বংস করে দেয়া হয়।

এই ঘটনা থেকেই মূলত ইতিহসখ্যাত আফিম যুদ্ধের সূত্রপাত! চি়ং রাজবংশের সময় এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশরা চাইনিজদের হারিয়ে হংকং দখল করে নেয়। যুদ্ধে জিতে ব্রিটিশরা চীনাদের ওপর অন্যায়ভাবে নানা ব্যবসায়ীক শর্ত আরোপ করে, যা দীর্ঘ দিনের জন্য চীনের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেয়। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে চীনের অর্থনীতির আবার জাগরণ ঘটে, এর মাঝে চীন ছিল অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু একটি দেশের নাম। এবং এর সবকিছুর শুরু হয়েছিল কোত্থেকে মনে আছে তো? শরীর-মন চাঙ্গা করতে চায়ের যেমন কোনো বিকল্প নেই, যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে সমৃদ্ধ একটি দেশের অর্থনীতিতে ধস নামানোও কিন্তু চায়ের ক্ষমতার মধ্যে পড়ে!

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড