বাঙালির বাতিঘর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭,   ১১ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

বাঙালির বাতিঘর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

 প্রকাশিত: ১৯:১৬ ১৪ মে ২০২০   আপডেট: ১৯:১৯ ১৪ মে ২০২০

পরিচিতি ও কাব্যচর্চা দুই বাংলায়। মূলতঃ কবি হলেও উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও পাঠকমহলে জনপ্রিয়। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই কলকাতায়। কর্পোরেটের চাকরি ছেড়ে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ বেশ দেরিতেই। কিন্তু অগ্রগমন দ্রুত। এরইমধ্যে ১০ টি গদ্য ও উপন্যাস এবং ৪ টি কবিতা সংকলন প্রকাশিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলতাফ, হুমায়ূন ও বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবন অবলম্বনে লেখা উপন্যাস ‘মহানির্মাণ’।

বিদ্বত্ত্বঞ্চ নৃপত্বঞ্চ নৈব তুল্যং কদাচন
স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্বান্ সর্বত্র পূজ্যতে

(অর্থ :- পাণ্ডিত্য ও রাজত্ব কখনোই সমান হতে পারে না। কারণ রাজা কেবলমাত্র নিজের রাজ্যেই সম্মান পান কিন্তু কী স্বদেশে কী বিদেশে বিদ্বানের সম্মান সর্বত্র।)  

নিভে গেল বাঙালি জাতির এক বাতিঘর। অদেখা ভুবনে চলে গেলেন বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ও  ভারতের পদ্মভূষণ ড. আনিসুজ্জামান। বাংলাদেশের প্রখ্যাত এই শিক্ষাবিদ ও লেখক ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতার পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বিশিষ্ট এই লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে তার কর্মজীবন শেষ করে অবসরে যান। ২০১৪ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ পেয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। নিজের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে নানা সফলতা পেয়েছেন এ গুণী শিক্ষক।

দেশপ্রেম, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সততা দিয়ে সব কাজেই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন আনিসুজ্জামান। যাপিত জীবনে অত্যন্ত পরিশ্রমী আনিসুজ্জামান লেখনী ও কথাবার্তায় পরিমিত ও আকর্ষণীয়। তার জাদুবিস্তারী বাগ্মিতা, বিনয় ও নম্রতা মুগ্ধ করেছে, প্রাণিত করেছে অসংখ্য মানুষকে। আলাপচারিতা ও নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'আমি বন্ধু ও আড্ডাপ্রিয় মানুষ। এ জন্য অনেক কাজ করতে পারিনি। অথচ করা উচিত ছিল। তবে যেটুকু করতে পেরেছি, মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা কম নয়।'

প্রবীণ শিক্ষাবিদ, ইমেরিটাস প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান এত সব বিষয় নিয়ে লিখেছেন, এত সব সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন যে তাকে নিয়ে কিছু লেখা প্রকৃতপক্ষেই যথার্থ নয়। মাত্র ১৫ বছর বয়সের কিশোর থেকে এখন পর্যন্ত দীর্ঘ বছর ধরে তিনি কাজ করে চলছেন। তার ওই বহুমাত্রিক কাজের পরিধি যেমন সুবিশাল, তেমনি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। তার বিচিত্র অভিজ্ঞতা, জ্ঞানভাণ্ডার নিজের মধ্যে লুকিয়ে না রেখে ছড়িয়ে দিয়েছেন, প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন পুস্তক রচনা করে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ করেছেন। একজন অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান প্রকৃত আনিসুজ্জামান হয়ে উঠেছিলেন গত শতকের ষাটের দশকেই। তখন থেকেই অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর বিস্তৃত হতে থাকে তার বহুমাত্রিক কাজের পরিধি। সমাজ, রাজনীতি, গবেষণা, সম্পাদনাসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেন নিজেকে। এসব কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন অসংখ্য। পেয়েছেন দেশ-বিদেশ থেকে মানুষের ভালোবাসা। সম্প্রতি পেয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা 'পদ্মভূষণ'। ভারতের তৃতীয় বেসামরিক সর্বোচ্চ সম্মাননা এটি। এ অর্জন শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্যই গৌরবের নয়, সমগ্র এশিয়া মহাদেশের মানুষের জন্যও গৌরবের বিষয় এটি।

শিক্ষার মহান ব্রত নিয়ে মাত্র ২২ বছর বয়সে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। পরে নিজের চিন্তাচেতনা, সৃজন-মননকে ওই শিক্ষকতার মধ্যেই আবদ্ধ রাখেননি অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, নিজের কর্মদক্ষতাকে ছড়িয়ে দেন নানা দিকে, নানা প্রান্তে। এর আগে শিক্ষকতার শুরু থেকেই নিষ্ঠাবান শিক্ষক হিসেবে নজর কাড়েন, জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন ওই অল্প বয়সেই। এরও আগে কিশোর বয়স থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। শিক্ষকতায় যুক্ত থাকার সময় থেকেই বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজ-রাজনীতি নিয়ে রচনা করেন অনবদ্য সব গবেষণা ও সম্পাদনামূলক বই।

অত্যন্ত পরিশ্রমী এই মানুষটি কথায়-কাজে যেমন বিনয়ী, তেমনি সংযত। নিজের সাফল্য নিয়ে, কাজ নিয়ে তার মধ্যে কোনো অহমিকা নেই। 'পদ্মভূষণ' অর্জনের পর নিজের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বিনয়ের সঙ্গে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেছিলেন, 'আমার কোনো অতৃপ্তি নেই। আমি যা পেয়েছি, তাতেই অনেক খুশি। যদি কিছু না পেতাম, তবু খুশি। মানুষের মাঝে থাকতে চাই, আমার কোনো কাজ নিজেকে যেন অহংকারী করে না তোলে তার জন্য সবার দোয়া চাই।'

সমাজের প্রতি দায়বোধ, দেশ ও জাতির প্রতি ভালোবাসা ও মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ তার তৈরি হয়েছিল ছোটবেলায়ই। মাত্র ১৫ বছরের কিশোর তখন। অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ওই বয়সেই সম্পৃক্ত হয়েছিলেন সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা আন্দোলনে। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উত্তাল হয়ে পড়েছিল বাংলা মায়ের দামাল সন্তানরা। আন্দোলনের ওই বছর জানুয়ারিতে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ঠিক হয়, সংগঠনের পক্ষ থেকে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে গণমানুষকে সম্পৃক্ত করার জন্য, সচেতন করার জন্য একটা পুস্তিকা প্রকাশিত হবে। এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় বিপ্লবী নেতা মোহাম্মদ তোয়াহার ওপর। কিন্তু তিনি সময়াভাবে লিখতে পারেননি। তখন তা লেখার দায়িত্ব দেয়া হয় কিশোর আনিসুজ্জামানকে। সবে ম্যাট্রিক পাস করে জগন্নাথ কলেজে আইএ প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন তিনি। ঠাটারীবাজারে বাড়ির কাছে ছিল তৎকালীন যুবলীগের অফিস। যুবলীগের সম্পাদক ছিলেন অলি আহাদ। আনিসুজ্জামানকে তিনিই পুস্তিকা লেখার প্রস্তাব দেন। তার কাছ থেকে পুস্তিকা লেখার প্রস্তাব পেয়ে অভিভূত এবং যারপরনাই বিস্মিত আনিসুজ্জামান। কিন্তু পরের ইতিহাস জানা সবারই। ভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকাটি রচনা করেন ওই কিশোরই। পুস্তিকাটির শিরোনাম ছিল 'রাষ্ট্রভাষা কী ও কেন?' সেদিনের ওই কিশোর লেখকই আজকের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী, লেখক, অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ওপর এটাই ছিল প্রথম পুস্তিকা।

বিরল প্রতিভার অধিকারী ড. আনিসুজ্জামান ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতার নিকটে বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ডা. এ টি এম মোয়াজ্জেম পেশায় ছিলেন বিখ্যাত  হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। ডা. মোয়াজ্জেম লেখালেখিও করতেন। মা সৈয়দা খাতুন গৃহিণী হলেও তারও ছিল লেখালেখির অভ্যাস। দাদা শেখ আবদুর রহিম ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। শেখ আবদুর রহিম ১৮৮৮ সালে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী লিখেছিলেন। এটি ছিল কোনো বাঙালি মুসলমানের লেখা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম জীবনী। বলা যায়, শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ছিল তাদের পরিবার।

নিজের দাদা শেখ আবদুর রহিম ও তৎকালীন মুসলিম সমাজ সম্পর্কে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান লিখেছেন, 'আমার দাদা শেখ আবদুর রহিম উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের প্রথমে গ্রন্থকার ও সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম বাংলায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী লেখেন। এ ছাড়া অনেক সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। আমার দাদা যখন সাংবাদিকতা করেছেন, তখন এক ধরনের মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন। তখনকার মুসলিম সমাজে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।'

ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করেন আনিসুজ্জামান। সাফল্য কিংবা খ্যাতি তাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি সাধারণ জীবন থেকে, বিচ্যুত করতে পারেনি আদর্শ থেকে। কিশোর থেকে যুবা, যুবা থেকে বৃদ্ধ- প্রত্যেকেই যেন তার বন্ধু, আপনজন। মানুষের পাশে দাঁড়াতে কখনো পিছপা হননি, কখনো দূরে সরে যাননি। যখনই তাকে কেউ ডেকেছেন, সাড়া দিয়েছেন, পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করেছেন। মানুষের দুঃখের সঙ্গী, আনন্দেরও সঙ্গী তিনি। দেশ ও জাতির সংকটে, সম্ভাবনায়ও এগিয়ে এসেছেন তিনি। দেশপ্রেম, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সততা দিয়ে সব কাজেই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন আনিসুজ্জামান। যাপিত জীবনে অত্যন্ত পরিশ্রমী আনিসুজ্জামান লেখনী ও কথাবার্তায় পরিমিত ও আকর্ষণীয়। তার জাদুবিস্তারী বাগ্মিতা, বিনয় ও নম্রতা মুগ্ধ করেছে, প্রাণিত করেছে অসংখ্য মানুষকে। আলাপচারিতা ও নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'আমি বন্ধু ও আড্ডাপ্রিয় মানুষ। এ জন্য অনেক কাজ করতে পারিনি। অথচ করা উচিত ছিল। তবে যেটুকু করতে পেরেছি, মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা কম নয়।'

গবেষক ও চিন্তক হিসেবে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। ষাটের দশকে বাঙালি মুসলমানদের চিন্তাধারার স্বরূপ উন্মোচন করে রচনা করে গেছেন একের পর এক গবেষণাগ্রন্থ। অসামান্য স্মরণশক্তি, তীব্রগতিতে রেফারেন্স অনুসন্ধান, গভীর ও জটিল বিষয়কে সরল ও সাধারণভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা তার রচনাকে বিশিষ্ট করেছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। গবেষণা করেছেন ভাষা নিয়ে, শিল্প ও সমাজ নিয়ে। তার পেশা শিক্ষকতা হলেও প্রকৃত নেশা লেখালেখি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম। তার রচিত ও সম্পাদিত বহু বাংলা ও ইংরেজি বই সমাদৃত হয়েছে। তার প্রথম বই 'মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য' এ অঞ্চলের সাহিত্যের ইতিহাসের ওপর লেখা অসামান্য গ্রন্থ। এটি তার পিএইচডি অভিসন্ধর্ভের ওপর ভিত্তি করে লেখা। এটিই বোধ হয় তার সর্বাধিক পরিচিত বই। এ ছাড়া আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে লেখা বইগুলোর গুরুত্ব তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুর ও বাণীর প্রসার, সমাজে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যাপ্তি ও গভীরতা উঠে এসেছে তার অসংখ্য রচনায়। দেশে রবীন্দ্রচর্চার ধারা যার মাধ্যমে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে, বিকশিত হয়েছে, তাদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তিনিই। এ ছাড়া তার মননশীল রচনা, গবেষণা ও প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছে আমাদের ঐতিহ্য ও প্রকৃত মানস। তার প্রবন্ধ-গবেষণাগ্রন্থের মধ্যে 'মুসলিম বাংলার সমসাময়িকপত্র' (১৯৬৯), 'মুনীর চৌধুরী' (১৯৭৫), 'স্বরূপের সন্ধানে' (১৯৭৬), 'আঠারো শতকের বাংলা চিঠি' (১৯৮৩), 'মুহম্মদ শহীদুল্লাহ' (১৯৮৩), 'পুরোনো বাংলা গদ্য' (১৯৮৪), 'মোতাহার হোসেন চৌধুরী' (১৯৮৮), 'আমার একাত্তর' (১৯৯৭), 'মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর' (১৯৯৮), 'আমার চোখে' (১৯৯৯), 'বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে' (২০০০), 'পূর্বগামী' (২০০১), 'কাল নিরবধি' (২০০৩) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও তার যৌথ সম্পাদনায় একটি সুবিশাল আকরগ্রন্থ 'আইন-শব্দকোষ'। ১৩১০ পৃষ্ঠার এই বইটিতে ছয় হাজারেরও বেশি ভুক্তি রয়েছে। এসব ভুক্তিতে শুদ্ধ ও সঠিক বাংলায় তারা তুলে ধরেছেন আইনের খুঁটিনাটি সব বিষয়। এ ছাড়া তার গবেষণা ও সম্পাদনামূলক কাজের পরিধি বহু বিস্তৃত। এসব কাজ একটি জাতিকে, একটি ভাষাকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি আমাদের জাতীয় মনন ও সৃজনকে করেছে সংহত ও দৃঢ়।

শিক্ষাক্ষেত্রে, শিল্প-সাহিত্যক্ষেত্রে, সাংগঠনিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। এ জন্য পেয়েছেন দেশ-বিদেশ থেকে পুরস্কার ও সম্মাননা। পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৬); স্ট্যানলি ম্যারন রচনা পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৮); দাউদ পুরস্কার (১৯৬৫); বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭০); অলক্ত পুরস্কার (১৯৮৩); একুশে পদক (১৯৮৫); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬); বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৮৬); বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার (১৯৯০); দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক (১৯৯৩) ও অশোককুমার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৪)। সম্মাননার মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক  ডি.লিট (২০০৫)। ২০১৪ সালে শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ভারত সরকার প্রদত্ত তৃতীয়  সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মভূষণ পদক, ২০১৫ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশ  সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার, ২০১৭ সালে বিপুলা পৃথিবী  বইয়ের জন্য আনন্দবাজার পত্রিকা কর্তৃক প্রদত্ত আনন্দ পুরস্কার, ২০১৮ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক, ২০১৯ সালে সার্ক কালচারাল সেন্টার থেকে সার্ক সাহিত্য পুরস্কার, ২০১৯ সালে শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য খান বাহাদুর আহছানউল্লা স্বর্ণপদক।  

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এক সাহসী নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তার কাছে এ জাতির ঋণের শেষ নেই, কৃতজ্ঞতারও শেষ নেই।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর