Alexa চরকাই রেঞ্জে গাছ চুরির মহোৎসব

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৩ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৯ ১৪২৬,   ২০ জ্বিলকদ ১৪৪০

চরকাই রেঞ্জে গাছ চুরির মহোৎসব

সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০১:২৯ ১৮ জুন ২০১৯   আপডেট: ০১:৩২ ১৮ জুন ২০১৯

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ ও বিরামপুরের চরকাই রেঞ্জের বনভূমি থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগাসাজোশে প্রতিনিয়ত শাল গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাছ চুরির পর দিন দিন বনের জমি দখল করা হওয়ারও অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী।   

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নবাবগঞ্জ জাতীয় উদ্যানের দায়িত্ব থেকে নিশিকান্ত মালাকারকে রেঞ্জার করা হলেও রহস্যজনক কারণে বিভাগীয় বনকর্মকর্তা নিশিকান্ত মালাকারকে নবাবগঞ্জের বিট কর্মকর্তা দায়িত্বে রেখেছেন। চরকাই রেঞ্জার নিশিকান্ত মালাকারের অনুগত লোকজন  যারা নিয়মিত মাসোয়ারা দেয় তাদের অবৈধভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। মাসোয়ারা  না পেলে উচ্ছেদ করা হয়।

সম্প্রতি নবাবগঞ্জে হরিনাথপুরে  মোটা অংকের উৎকোচ না পেয়ে ইউএনওকে ভুল বুঝিয়ে উচ্ছেদ অভিযানে গেলে এলাকাবাসী নিশিকান্ত মালাকারকে গনধোলাই দেয়। এ ঘটনায় পুলিশ রবার বুলেট  ছোঁড়ে। পরে এলাকাবাসী এ ঘটনায় নিশিকান্ত মালাকারসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালাতে মামলা দায়ের করেন। এছাড়াও দুই রেঞ্জের বনের আশে পাশে প্রায় শতাধিক অবৈধ করাতকল স্থাপন করা হয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজোশে চিহ্নিত ভূমি দস্যুসহ অবৈধ করাতকলের মালিকেরা  এসব গাছ চুরি আর ভূমি দখলের সাথে জড়িত। গাছ চুরির প্রতিবাদ করায় মিথ্যে মামলায় হয়রানী করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

দিনাজপুর বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চরকাই রেঞ্জ বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট উপজেলার পাঁচটি বিটে মোট বনভূমির পরিমাণ ৭ হাজার  ৪১৭.৮৯ একর। এর মধ্যে চরাকাই সদরে রয়েছে ১ হাজার ৩১৪.০৩ একর প্রয়াগপুর বিটে রয়েছে ৮১৭.৮০ একর, ভাদুরিয়া বিটে রয়েছে ২ হাজার ১৩৩.৭১ একর, হরিপুর বিটে রয়েছে ১হাজার ৭৬৭.৬৩ একর, নবাবগঞ্জ বিটে রয়েছে ১ হাজার ৩৮৪. ৯১ একর বনভূমি। এর মধ্যে ২০১০ সালের ৪ নভেম্বর বিরামপুরের চরকাই রেঞ্জের নবাবগঞ্জ বিটের ৫১৭.৬১হেক্টর সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়ে নবাবগঞ্জ জাতীয় উদ্যান ঘোষনা করা হয়।

এর মধ্যে চরকাই বিটের ১৫৬ দশমিক ৩৩ একর, প্রয়াগপুর বিটের ১৯৭ দশমিক ৫৪ একর, ভাদুরিয়া বিটের ৯৬২ দশমিক ১১ একর, হরিপুর বিটের ৯৩৪ দশমিক ৮৯ একর এবং নবাবগঞ্জের বিটের ১০৭ দশমিক ৯০ একর জমি বেদখল অবস্থায় রয়েছে।

এলাবাসীর অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকে চরকাই রেঞ্জের নবাবগঞ্জের জাতীয় উদ্যান, মাড়াশ, বড়জালালপুর,  পাদুমপুর, পত্নিচাঁন, বামনগড়, রগুনাথপুর, খোলশাগাড়ি,  কুষ্টিয়াপাড়া, খিড়িপুকুর, গিলাইঝুঁকি, হরিনাথপুর,  বিরামপুরের টাটাকপুর, সোনাঝুড়ি, খানপুর, পোড়াদহ, প্রয়াগপুর, ধানজুড়ি, মধ্যপাড়া রেঞ্জের নবাবগঞ্জের মাহতাবপাড়া  ঘুরে দেখা গেছে  করাত দিয়ে কাটা গাছের গোড়া।  কাটা গাছ রয়েছে শত শত শালসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। এছাড়াও  মাটি খুঁড়ে অনেক গাছের গোড়াও তুলে নেওয়া হয়েছে।

গত রোববার দুপুরে এলাকাবাসীর অভিযোগে সরেজমিনে জাতীয় উদ্যানের মাড়াষ মৌজা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে অসংখ্য শাল গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ গাছই কুড়াল দিয়ে কাটা হয়েছে। গাছ গুলো কেটে নেওয়ার পর গাছের গোড়াগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে।

সরেজমিনে বনটিতে গিয়ে গিয়ে দেখা গেছে বনের উত্তর পশ্চিম অংশে টাটাকপুর নয়াপাড়া এলাকায় প্রায় এক একর মতো জায়গার গাছ পুরোটাই কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এছাড়াও টাটাকপুর গ্রামের উত্তর পাশে প্রায় ১০ একর মতো বাগানের গাছ কেটে উজাড় করা হয়েছে। এছাড়াও বনের মাঝ থেকেও পুরোনো শত শত গাছ কেটে নিয়ে গেছে। গাছ গুলো কেটে নিয়ে যাওয়ার পর যাতে কোন চিহ্ন না থাকে এ জন্য দুর্বৃত্তরা গাছের গোড়াগুলো তুলে নিয়ে ওই জায়গাটি মাটি চাপা দিয়ে রেখেছে।

নবাবগঞ্জের মাড়াষ গ্রামের উজ্জ্বল হোসেনসহ কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামবাসী অভিযোগ করে জানান, প্রায় মাস দেড়কে থেকে জাতীয় উদ্যানের রেঞ্জার নিশিকান্ত মালাকারের ইন্ধনে ওয়াচার জিয়া কর্মকর্তাদের যোগসাজোশে প্রতি রাতেই শালগাছ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক শাল গাছ চুরি করা হয়েছে। এছাড়াও শাল্টিমুরাদপুর এলাকায় প্রতি রাতেই বনবিভাগের লোকদের যোগসাজোশে চুরি হচ্ছে গাছ, উজাড় হচ্ছে বন।  

দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, গাছ চুরিতে  স্থানীয়ভাবে বাঁধা দিতে গেলে বন বিভাগের লোকজন মামলার হুমকি দিতে থাকেন। গত মাস দেড়েক থেকে গাছ চুরি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে বাধ্য হয়ে বিষয়টি তারা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের  জানান। অভিযোগ পেয়ে দিনাজপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা  তদন্তে আসলেও আজ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি কোন ব্যবস্থা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চরকাই রেঞ্জ কর্মকর্তা নিশিকান্ত মালাকার  মুঠোফোনে জানান, গাছ চুরি এবং অবৈধ দখলদারের  সাথে তাঁর ইন্ধনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আমাকে জড়িয়ে কিছু গ্রামবাসী এমন অভিযোগ করতে পারে তবে এ সব অভিযোগের ভিত্তি নেই ।   

দিনাজপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান  বলেন, নবাবগঞ্জ বিট কর্মকর্তা নিশি মালাকার পদোন্নতি পেয়ে চরকাই রেঞ্জ কর্মকর্তা হয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে ফরেস্ট বিভাগে ভালো কর্মকর্তা না থাকায় নিশিকান্ত মালাকারকে নবাবগঞ্জের বিট কর্মকর্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছে। গাছ চুরির সঙ্গে যেই জড়িত থাকলে তদন্ত পূর্বক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম