প্রেম-বিরহ মিলেমিশে একাকার চবির ‘কাটা পাহাড় সড়ক’

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

প্রেম-বিরহ মিলেমিশে একাকার চবির ‘কাটা পাহাড় সড়ক’

রুমান হাফিজ, চবি  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২৯ ২৯ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১১:১৮ ৩০ মার্চ ২০২০

এই কাটা পাহাড় সড়ক যেন অসংখ্য যুগলের সম্পর্ক জোড়া লাগা ও ভেঙ্গে যাওয়ার নিরব সাক্ষী।

এই কাটা পাহাড় সড়ক যেন অসংখ্য যুগলের সম্পর্ক জোড়া লাগা ও ভেঙ্গে যাওয়ার নিরব সাক্ষী।

দুই পাহাড়ের মাঝখানে পাকা রাস্তা। এই রাস্তার দুই পাশে ড্রেনে ২৫০ প্রজাতির ব্যাঙের সুর পাওয়া যায়। শাটল থেকে পা ফেলতেই এক অদ্ভুত শিহরণ। অনেক সময় পাহাড়ের চূড়ায় চোখ পড়লেই দেখা মিলবে হরিণ আর কাঠ বিড়ালীর দৌড়াদৌড়ি। এসব দেখে আনন্দে একটু লুটোপুটি না খেলেই নয় শিক্ষার্থীদের। আর তা ছাড়া এ ক্যাম্পাসে পা ফেলে ভালো না লাগার কোনো সুযোগ নেই।

বলছিলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কাটা পাহাড় সড়ক’ এর কথা। প্রেম-বিরহ, বন্ধুত্ব, আন্দোলন-সংগ্রাম, হাসি-কান্না, একাকিত্ব সময় কিংবা প্রেমিকযুগলের হাতের উষ্ণ ছোঁয়া, কয়েক যুগ ধরে এমন বিচিত্র সব ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে সড়কটি। এরইমাঝে বহন করে চলেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। কখনও মিছিলের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে তার বুক, কখনও ভালোবাসায় শীতল হয়েছে। কখনও প্রেমিকযুগলের সঙ্গে মিশেছে কাটা পাহাড় সড়কের চোখের জল।

কাটা পাহাড় সড়ক একেক সময় সাজে একেক রূপে। সকালবেলা আকাশচুম্বী পাহাড়ের চির ধরে বেড়ে ওঠা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা হালকা রোদে রাস্তার ধারে চোখে পড়ে বিভিন্ন প্রাণীর ছুটে চলার অদ্ভুত দৃশ্য। খুব ভোরে হঠাৎ দেখা মেলে মায়া হরিণের। 

দিনের আলো ফোটতেই শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হতে থাকে সড়কটি। শিক্ষার্থীরা ট্রেন বা বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে বা সিএনজি-রিকশাযোগে ছুটে যায় ক্লাসে। শিক্ষার্থীরা যখন পায়ে হেঁটে চলা শুরু করে তখন এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিকেল হতে না হতেই আনাগোনা শুরু হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের। সন্ধ্যায় প্রেমিকযুগল হাতে হাত রেখে গল্প করে অথবা অভিমানের ঝাঁপি খুলে দেয় এই সড়কের ধারে বসেই। এই কাটা পাহাড় সড়ক যেন অসংখ্য যুগলের সম্পর্ক জোড়া লাগা ও ভেঙে যাওয়ার নিরব সাক্ষী। 

ছাত্রদের বিক্ষোভ, আন্দোলন যেমন কাটা পাহাড় সড়কে ছাড়া প্রাণ পায় না। তেমনই ক্যাম্পাসের ভালোবাসাও প্রাণ পায় না কাটা পাহাড় সড়ক ছাড়া। মনে প্রেম উদয় হওয়া প্রেমিক-প্রেমিকার প্রথম অনুভূতিও দুধারে পাহাড় ঢাকা কাটা পাহাড় সড়কের শীতল ছায়ায় হাঁটার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। আবার বিরহ-বিচ্ছেদের যন্ত্রণাটাও ভাগাভাগি করতে চায় রাতের নির্জন এই সড়কের শূন্যতার সঙ্গে। এই তো গেল প্রেমিকযুগলের কথা। বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা, গান, শ্যুটিং, জম্মদিন পালনেরও একটি আদর্শ জায়গা এই সড়ক। সন্ধ্যা থেকে রাত, এমনকি গভীর রাতেও কাটা পাহাড় সড়ক থেকে ভেসে আসে শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত কণ্ঠে গানের সুর। মন খারাপের সময়ে সোডিয়াম লাইটের নিচে আলো-আঁধারি পরিবেশে হেঁটে প্রশান্তি খুঁজে পান অনেকে। এই সড়কে যে শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী বা পথচারীর মুখরিত থাকে তা নয়, সন্ধ্যা হতেই এতে বিচরণ করতে শুরু করে বিভিন্ন বণ্যপ্রাণী। পাহাড়ের গা ঘেঁষে উড়ে যায় পাখির ঝাঁক। দ্বিধাহীনভাবে রাস্তা পেরিয়ে চলে যায় বুনো শুয়োরের দল। সকালে দেখা মিলে মায়া হরিণের ঘাস খাওয়া কিংবা ছুটে চলার বিরল দৃশ্য।

এত বিশেষত্ব থাকলেও এই রাস্তা জন্মের ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে এখানে এমন কোনো রাস্তার অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৬৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় যখন যাত্রা শুরু করে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন নির্মান সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার জন্য পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচল উপযোগী একটা রাস্তা তৈরি করা হয়। তখন শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার জন্য স্টেশন ও হল থেকে বাসের ব্যবস্থা ছিল। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর টাকা ব্যয় হতো।

শিক্ষার্থীদের সহজে যাতায়ত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সাশ্রয়ের জন্য ১৯৯৯ সালে উপাচার্য ও সাবেক ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আব্দুল মান্নান সিন্ডিকেটে পাশ করিয়ে কাটা পাহাড় সড়কটি শিক্ষার্থীদের চলাচল উপযোগী করেন। শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই বাস বন্ধ করে কাটা পাহাড় সড়ক চলাচল উপযোগী করায় গ্রেফতারি পরোয়ানা, হুমকি, আন্দোলনসহ নানা ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয় বলে জানান সাবেক ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আব্দুল মান্নান। যদিও এতে বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হয়। পরবর্তীতে প্রকৃতির অপরূপ শোভায় সুশোভিত হতে থাকে সড়কটি। পরিচিতি পায় একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে। পিচঢালা কালো রাস্তার দুই পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সৌন্দর্যই আকৃষ্ট করে হাজারো প্রকৃতি প্রেমীকে। পাহাড় কেটে সড়কটি নির্মাণ করা হয় বলে এটি কাটা পাহাড় সড়ক নামে পরিচিতি পায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম