Alexa ঘুষ বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করছে 

ঢাকা, সোমবার   ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

ঘুষ বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করছে 

 প্রকাশিত: ১৩:২১ ১৮ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৩:২১ ১৯ নভেম্বর ২০১৯

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে চোখ আটকে গেল। প্রতিবেদনটি পড়ার পর মনও কেঁদে উঠল। প্রতিবেদনটি হলো বাংলাদেশে ঘুষ ঝুঁকি নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘুষবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রেস ইন্টারন্যাশনাল ‘ট্রেস ব্রাইবারি রিস্ক ম্যাট্রিক্স’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ঘুষের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অবস্থান। ২০১৮ সালের তুলনায় এ ঝুঁকি দুই পয়েন্ট বেড়ে ২০১৯ সালের ৭২-এ দাঁড়িয়েছে।

জরিপে প্রত্যেক দেশকে বিভিন্ন দিক বিচারে ১ থেকে ১০০-এর মধ্যে স্কোর দেয়া হয়েছে। যে দেশের স্কোর যতো বেশি, সে দেশে ব্যবসায় ততো বেশি ঘুষের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সঙ্গত কারণে ওই প্রতিবেদনটি পাঠের পর যেকোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষই আঁতকে উঠবেন। ‘সারা অঙ্গে ঘা, কোথায় মলম লাগাবো’- এ প্রবাদটিই যেন বাংলাদেশের জন্য এখন সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে! 

কয়েক বছর ধরেই ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপকতার মধ্যদিয়ে আমাদের দিনযাপন করতে হচ্ছে। ঘুষ-দুর্নীতি যেন ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সব খাতেই নেতিবাচক এই প্রপঞ্চটি শেকড়-বাকড় গেঁড়ে বসেছে। পারিশ্রমিক হিসেবেও সরকারি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ঘুষ চান- এমন ঘটনাও পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা গিয়েছিল। এছাড়া চলতি বছরে একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঘুষ দেয়াকে অনেকেই কর্তব্য বলে ধরে নিয়েছেন। ভাবতে অবাক লাগে, ৩০ লাখ শহিদের রক্তের প্রতিদানে অর্জিত এই জন্মভূমি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশটিকে সোনার বাংলা’ নামে আখ্যা দিয়েছেন; সোনার বাংলা গড়তে গিয়ে নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন; সেই দেশের আজ এই হাল-হকিকত! কিন্তু আজকের এ পরিস্থিতির জন্য কারা দায়ী- এমন প্রশ্নও অমূলক হতে পারে না।

ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। কোথায় ঘুষ নেই? সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বিআরটিএ, শিক্ষা বিভাগ থেকে গণপূর্ত, ক্ষুদ্র থেকে মেগা প্রকল্প, শিক্ষক থেকে চিকিৎসক সর্বত্র দুর্নীতি ঘুষ লুটপাট সংক্রমিত হয়ে পড়েছে। এদিকে, বিদ্যুৎ খাত থেকে সরকারি কর্মচারী সব ক্ষেত্রে সংরক্ষণ নীতির মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের ঘুষ দুর্নীতির বিষয়ে ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছে। এক সেক্টরে যখন ঘুষ দুর্নীতি প্রশ্রয় পাচ্ছে, তখন খুব সঙ্গতভাবেই অন্যান্য সেক্টরেও ঘুষ দুর্নীতি জেঁকে বসছে। যুক্তিটা হলো, ঘুষ দুর্নীতির জন্য ওদের বিরুদ্ধে যদি ব্যবস্থা নেয়া না হয়, তাহলে আমার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে?

অপরদিকে ঘুষ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেছে সরকার। সেখানে হাত দিয়ে দেখা যাচ্ছে, কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারপ্রধানের অব্যাহত এ ঘোষণার মাঝেই ট্রেস ব্রাইবারি রিস্ক ম্যাট্রিক্স ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করল।

বৈশ্বিক এ সূচকের এবারের প্রতিবেদনে ঘুষের ঝুঁকির ক্ষেত্রে আগের বছরের চেয়ে ২ পয়েন্ট বেড়ে বাংলাদেশ এ তালিকার ১৭৮তম অবস্থানে আছে। আরো উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ভারত ৪৮ পয়েন্ট নিয়ে ৭৮তম ও পাকিস্তান ৬২ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার ১৫৩তম অবস্থানে আছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বিনামূল্যে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এ সূচক বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ঘুষের প্রসার ঘটায় এমন কতগুলো পরিস্থিতি বুঝতে কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করে। এগুলো হলো বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগের ধরন ও বিস্তৃতি, ঘুষের প্রতি সামাজিক মনোভাব ও তা নিষিদ্ধে সরকারের ক্ষমতা, সরকারের স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশে সুশীল সমাজের সক্ষমতা।

প্রত্যেক দেশের ঘুষ ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়েছে চারটি ক্ষেত্র বিবেচনায়। এগুলো হলো- সুযোগ, প্রতিবন্ধকতা, স্বচ্ছতা ও তদারকি। আবার সুযোগ পরিমাপের জন্য রয়েছে তিনটি বিষয়- মিথস্ক্রিয়া, প্রত্যাশা ও সুবিধায়ন। ঘুষবিরোধী কার্যক্রম ও সামাজিক সচেতনতা পরিমাপ করা হয় প্রতিবন্ধকতা ক্ষেত্রটির আওতায়। স্বচ্ছতা পরিমাপ করা হয় প্রক্রিয়া ও স্বার্থের মাধ্যমে। আর তদারকির বিষয়টি মুক্ত গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের সক্রিয়তার ওপর নির্ভর করে। পৃথক এ প্রক্রিয়ায়, সামগ্রিক সুযোগের ক্ষেত্রে ৮৬; এর আওতায় থাকা বিষয়গুলোর মধ্যে মিথস্ক্রিয়ায় ৬৮, প্রত্যাশায় ৭৮ ও সুবিধায়নে বাংলাদেশের স্কোর ৭৭। আর সামগ্রিক প্রতিবন্ধকতায় ৬৩; এর মধ্যে সামজিকভাবে ঘুষবিরোধী মনোভাবে ৬৮ ও প্রয়োগে স্কোর ৬৪।

অন্যদিকে সামগ্রিক স্বচ্ছতায় ৬০; এর মধ্যে প্রক্রিয়ায় ৬১ ও স্বার্থে ৬২। সামগ্রিক তদারকির ক্ষেত্রে ৬৪, মুক্ত গণমাধ্যমে ৫৬ ও সুশীল সমাজের সক্রিয়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ৬৯। গড়ে গত বছরের তুলনায় এবার এই ঝুঁকির পয়েণ্ট বেড়েছে। 

এর আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার: নীতি এবং চর্চা শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, রাজনৈতিক প্রভাব, সদিচ্ছার অভাব ও নেতিবাচক দিকে গুরুত্বারোপ না থাকার কারণে জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার চর্চা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হলেও তাদের দুর্নীতি কমেনি। তাদের প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার বিপরীতে সঠিক জবাবদিহিতা নেই বলেই এ প্রবণতা কমছে না। সরকারের পক্ষ থেকে নানান প্রণোদনা দেয়া সত্বেও ঘুষ-দুর্নীতি হ্রাস না পাওয়া অত্যন্ত পরিতাপের বলেই প্রতীয়মান হয়। ঘুষ কেন কমছে না, এর কারণ অনুসন্ধানও জরুরি। কেননা, ঘুষ বাণিজ্যের খেসারত প্রতিনিয়তই দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। সাম্প্রতিক এ সংক্রান্ত সব তথ্যও বাংলাদেশে ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপকতাকে নির্দেশ করছে। বৈশ্বিক সূচকে যেহেতু স্কোর বাড়ছে সুতরাং পরিস্থিতি যে আরো ভয়াবহতার দিকেই যাচ্ছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। ফলে সরকার তথা দেশের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। ঘুষ প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগসহ যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, সরকারের কাছে দেশের মানুষ এটিই প্রত্যাশা করে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/এস