Alexa ঘুরে আসুন ‌\`বাংলার দার্জিলিং\`

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৪ ১৪২৬,   ১৯ মুহররম ১৪৪১

Akash

ঘুরে আসুন ‌'বাংলার দার্জিলিং'

সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েল

 প্রকাশিত: ১৮:১৫ ৮ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৮:৫৬ ৮ জানুয়ারি ২০১৯

সাজেক। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সাজেক। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সাজেকে যেন সবুজের বুকে মেঘের রাজত্ব চলে। কথাটি আশ্চর্যজনক হলেও সত্য। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের উত্তর-পূর্ব কূল ঘেঁষে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি। বর্ষা মৌসুমে চিরসবুজ সাজেক সাদা মেঘে আচ্ছাদিত থাকে। শীতে নেয় ভিন্ন রূপ। এক কথায় সাজেককে মেঘের বাড়ি বললেও ভুল হবে না। অনেকে আবার সাজেককে বাংলার দার্জিলিং হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। সবমিলিয়ে সাজেক এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমির নাম।

রুইলুই পাড়া

সৌন্দর্যের এই কুণ্ডুলিতে যাবার ইচ্ছে ছিলো অনেকদিন ধরেই, কারণ এই জায়গাটিতে সর্বশেষ গিয়েছিলাম ২০১৬ সালে। তাই গত ডিসেম্বরে ব্যাগ-প্যাক নিয়ে রওনা দিই সাজেকের উদ্দেশ্যে। সাজেকে পৌঁছাতে বেশ দেরিই হয়ে গেল। রাত ১০ টায় ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে খাগড়াছড়ি পৌঁছালাম সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। এতো দেরিতে পৌঁছানোর কারণ, রাস্তার ভয়ানক জ্যাম! আমরা ছিলাম ২০ জন। তাড়াতাড়ি করে আগে থেকে ঠিক করে রাখা দুটি জীপে (চান্দের গাড়ী) সবাই চেপে বসলাম।

অনেক দেরী হয়ে গেছে! একটানে সাজেক যেতে হবে। শুরু হল দীঘিনালা হতে ৩৪কিমি দূরত্বের সাজেকযাত্রা। প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিলাম। কিন্তু চান্দের গাড়ীর পাহাড়ি পথের যাত্রা শুরু হতেই সেই ক্লান্তি কোথায় যেন উড়ে গেল। মনে হলো, সাজেকে যাওয়া আসার পথের সৌন্দর্যটুকুই পয়সা অর্ধেক উসুল করে দিয়েছে! আর চান্দের গাড়ীর ড্রাইভারদের ড্রাইভিং বলার মতো! আপনার শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের না উত্তেজনার পারদ উঠিয়ে দিবে। পুরো ‌'ফার্স্ট এন্ড ফিউরিয়াস' জনারের ড্রাইভিং! আর রাস্তায় যে সব ঢাল আছে, বাঁক আছে, খাড়া রাস্তা আছে সেগুলো উপভোগের মাত্রা আরো একটু বাড়িয়ে দিবে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক আসতে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। আমরা পৌঁছলাম ১টায়। এসেই হোটেলে ঢুকে খাবারের অর্ডার করা হয়ে গেল।

ততক্ষণে আপনাদের সাজেকে কিছু পুরোনো গল্প বলতে চাই। সাজেক এক সময়ে ছিলো দুর্গম জনপদের নাম। আধুনিক জীবনযাত্রা, রাত্রিযাপন কিংবা দিনে-দিনে যাতায়াতের কথা অকল্পনীয় ছিলো সাজেক নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে দেশীয় পর্যটকদের পছন্দের জায়গা হয়ে উঠেছে সাজেক। সেনাবাহিনীর তত্বাবধায়নে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক পর্যটনের আদলে সাজেকে সৃজন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও সৌর বিদ্যুৎ-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে করে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে সেখানকার অদিবাসীদের। সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সাজেককে জনসাধারণের সুবিধার্থে আরো বেশি দৃষ্টিনন্দন করতে কাজ করছে সেনাবাহিনী। পাশাপাশি উন্নত জীবনযাত্রার সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে সেখানে বসবাসরত পাংখোয়া, লুসাই ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষের।

সাজেক রাঙ্গামাটি জেলায় অন্তর্গত হলেও সড়ক পথে যোগাযোগ করতে হয় খাগড়াছড়ি দিয়ে। খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৬৯ কিলোমিটার। আঁকাবাঁকা সর্পিল পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যেতে হয় সাজেকে। পথিমধ্যে চোখ আটকে যাবে পাহাড়ি নদী কাচালং-মাচালং ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার দৃশ্য দেখে। সাজেক টুকতেই রুইলুই পাড়া। রুইলুইতে পাংখো ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বসতি। সড়কগুলোও উন্নত কাঠামোর আদলে গড়া। রুইলুই পাড়ায় সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় পর্যটকদের জন্য বেশকিছু বিনোদনের মাধ্যম রাখা হয়েছে। এরমধ্যে হ্যারিজন গার্ডেন, ছায়াবীথি, রংধনু ব্রিজ, পাথরের বাগান উল্লে­খযোগ্য। এছাড়াও পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য একাধিক বিশ্রামাঘার ও ক্লাবঘরও রয়েছে রুইলুই পাড়ায়।

দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা সবাই বের হলাম কংলাক পাহাড় জয় করতে। অনেকে চান্দের গাড়ীতে করে পাহাড়ের কাছে গিয়ে উঠেছিলো। কিন্তু আমরা হেঁটে হেঁটেই গেলাম। এসব পথগুলো গাড়ি বা বাইকে যাওয়া মানেই আপনি অনেক কিছু মিস করবেন।  ১০ টাকা দিয়ে লাঠি ভাড়া করে কংলাক পাহাড়ে উঠা শুরু করলাম। ইচ্ছে ছিলো পাহাড়ের চূড়া হতে সূর্যাস্ত দেখবো। কিন্তু সূর্যটা মাঝপথেই ডুবে গেল!

ডুবে গেলেও আপনি চারপাশের আবহ্ দেখে ভাববেন—আহ, এই হচ্ছে সাজেক! এতো সুন্দর! যে পথ দিয়ে আপনি সাজেক এসেছেন সেটাও আপনি দেখতে পাবেন। আর চারিদিকে পাহাড়গুলো তো আছেই। শীতের প্রকোপে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। নেমে এই বার আমরা চান্দের গাড়িতে করেই হোটেলে আসলাম। কিছুক্ষন বসে আবার বের হলাম। এক হোটেলে ব্যাম্বু চিকেন অর্ডার করলাম। দেশী মুরগি ৭০০টাকা আর পোল্ট্রি মুরগি ৫০০ টাকা। ঠান্ডার ভিতরে ঝাল মশলা বেশি দিয়ে গরম গরম ব্যাম্বু চিকেন ভালোই লাগলো। ঝাল বেশি খেতে চাইলে বলে দিবেন আগে আগে। রাতে ১০টার দিকে খেয়ে চলে গেলাম হেলিপ্যাডে আকাশ আর তারা দেখতে। সাজেকের ওই আকাশের দিকে আপনি সারা রাত তাকিয়ে তাকতে পারবেন। অনেকে ফানুস ওড়াচ্ছিলো... দারুন লাগে দেখতে!

রাত ১২টায় ঘুমিয়ে পরদিন ভোর ঠিক ৫টায় ঘুম হতে উঠলাম। তখনো আলো ফোটেনি ঠিক মতো। কিন্তু তখনই বাইরের যে দৃশ্য দেখলাম তা লিখে বর্ণনা করা সম্ভব না। আধা ঘণ্টা পর যখন আলো বের হলো, তখনকার দৃশ্যের সাথে গতকাল বিকেলে দেখা সাজেকের মিল পাবেন না। এই সময়ে সাজেক আপনার সামনে তার আসল রূপ নিয়ে হাজির হবে। চারপাশে শুধু মেঘ আর মেঘ দেখবেন। চারপাশের পাহাড় গুলা মেঘের চাদরে ঢাকা থাকে। মনে হবে পাহাড়গুলার উপরে মেঘের চাদর বিছানো। সোজা হেলিপ্যাডে চলে গেলাম সূর্য উদয় দেখবো বলে।

সূর্য ওঠার পর পরই হেলিপ্যাডে আর দেরি করবেন না। নিচে ঝাড়ভোজ পার্কে ঢুকে যাবেন টিকিট কেটে। তাড়াতাড়ি গেলে ভালো করে ছবি তুলতে পারবেন। আর মেঘের অসাধারণ দৃশ্য তো আছেই। উচ্চমূল্যের কটেজগুলো সব এই দিকেই মুখ করে করা। এখানে কিছু সময় কাটিয়ে পুরা সাজেক ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন। ইচ্ছে হলে আবারও কংলাক পাহাড়ে উঠতে পারেন। কংলাকে পাংখোয়াদের আদি নিবাস। পাংখোয়ারা সবসময় সবার উপরে থাকতে বিশ্বাসী, তাই তারা সর্বোচ্চ চূড়ায় বসবাস করে। কংলাকের পরেই ভারতের মিজোরাম। কংলাক ও সাজেক থেকে দেখা যায় মিজোরাম শহর। 

ডেইলিবাংলাদেশ/এনকে