Alexa ঘুরে আসুন পর্যটন শহর বগুড়া

ঢাকা, বুধবার   ১৭ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

ঘুরে আসুন পর্যটন শহর বগুড়া

 প্রকাশিত: ২১:২৯ ২২ অক্টোবর ২০১৭  

টি. এম. মামুন, বগুড়া: পূন্ড্রবর্ধন সভ্যতার ইতিহাসে অতি প্রাচীন একটি নাম। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার উত্তরে শিবগঞ্জ উপজেলায় বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের পাশে উচু প্রাচীর ঘেরা এই স্থানটির নাম পুন্ড্রবর্ধন বা শীলাদ্বীপ। যার সৃষ্টি হয়েছিল প্রায় ৪ শত বছর আগে। পরবর্তীকালে এটিই মহাস্থান গড় নামে পরিচিত লাভ করে। জনশ্রুতি রয়েছে, পুন্ড্রবর্ধন বা মহাস্থান গড় রাজা পরশুরাম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। পর্যটকদের কাছে ‘মহাস্থান গড়’ বগুড়ার ভাবমূর্তি উজ্জল করে রেখেছে সৃষ্টিকাল থেকেই। এখন কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই মহাস্থান।

মহাস্থান গড়কে ঘিরে দেখার মত রয়েছে অনেক কিছু। উত্তর-পুর্ব কোণে করতোয়া নদীর কোল ঘেষে গোবিন্দ মুনির ভিটা, জিওৎকুন্ড, বৈরাগী ভিটা, শিলাদেবীর ঘাট, ভিমের জাঙ্গাল, গড়ের পাশে বিভিন্ন দুর্গ, গোকুলের মেড়, খোদা পাথর, মানখালির স্তুুপ, রাজা পরশুরামের বাড়ী, বেহুলার বাসর ঘর, যোগীর ভবন, ভাসু বিহার স্তুপসহ নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপনাগুলো দেখার জন্য প্রতিদিন দেশ বিদেশের পর্যটকরা এসে ভীড় জমান। মহাস্থান ছাড়াও বগুড়ার শেরপুর ও কাহালু উপজেলাতেও বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন। এ অঞ্চলের পুরাকৃতিগুলো সংরক্ষণের জন্য মহাস্থান গড়ের উত্তরে রয়েছে সুরক্ষিত একটি জাদুঘর।

বগুড়া প্রত্নতত্ত্ব কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ১৯৬৭ সালে ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সেক্রেটারী মিঃ কিউ. ইউ. সাহাব ৩ একর জায়গার উপর মহাস্থান জাদুঘরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে সম্প্রসারিত হয়ে এর পরিধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ একর।

পুরো মহাস্থান এলাকা পর্যটকদের জন্য একটি অপরিহার্য দর্শণীয় স্থান উল্লেখ করে যাদুঘরের কাষ্টডিয়ান মজিবর রহমান জানান, পুন্ড্র নগরীর(মহাস্থান গড়) আয়তন প্রায় ৫ হাজার বাই সাড়ে ৪ হাজার ফুট। এখানে পুরানো মাটির মুর্তি, বাসনপত্র, স্বর্ণবস্তু, ব্রঞ্চ এর বস্তু, কালো পাথরের মুর্তি, বেলে পাথরের মুর্তি, মাটির খোদায়কৃত ইট, বিভিন্ন শিলালিপি, মাটি, বিভিন্ন ধাতবের বোতাম, কানের ফুল, নাক ফুল, মুল্যবান পাথর, মার্বেল, স্কস্টিক, কাঁচ, ক্যালসেডোনি, ফাইয়েন্স, তামার আংটি, ল্যাটিজ লাজুলি ও ব্রেসলেটসহ বিভিন্ন ধরনের মুল্যবান জিনিস পত্র রয়েছে মহাস্থান জাদুঘরে।

এছাড়া খ্রীষ্টপুর্ব ৫ম শতকের পোড়ামাটির দন্ডয়মান মুর্তি থেকে শুরু করে ৭ম, ৮ম, ৯ম, ১০ম ও ১১শ শতকের কালো পাথরের অম্বিকা এবং লৌহ নির্মিত দ্রব্যাদি সহ বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান ধাতব পদার্থ সংরক্ষিত রয়েছে এখানে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৪-৩৬ সালে প্রত্নতত্ত্ব স্থান হিসেবে বেহুলা লক্ষীন্দরের বাসর ঘরটি খনন করা হয়। পাওয়া যায় ১৩ মিটার উঁচু ঢিবি বা মঞ্চের ধ্বংসাবশেষ। খ্রিষ্টীয় ৬-৭ শতকে প্রথম নির্মাণ যুগে এই সমতলের শীর্ষদেশে একটি বৌদ্ধ উপাসনালয় নির্মিত হয়েছিল। এরপর সেন আমলে ধ্বংসাবশেষে একটি বর্গাকৃতির শিব মন্দির নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীতে এ মন্দিরের মেঝের উচ্চতা আরো বাড়ানো হয়েছিল।



মহাস্থান এসে যাদুঘর পরিদর্শন করেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। সার্কভুক্ত দেশসহ বাংলাদেশী যেকোন সাধারন দর্শণার্থীর জন্য জাদুঘরের প্রবেশ ফি নির্ধারন করা হয়েছে জনপ্রতি ২০ টাকা, যা মাধ্যমিক পর্যায়ে ১০ টাকা। এছাড়া সার্কভূক্ত বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য জনপ্রতি ১০০ টাকা এবং সার্ক বহির্ভূত অন্যান্য বিদেশী পর্যটকদের জন্য ২০০ টাকা।

জানা যায়, ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই থেকে চলতি বছরের ১৬ জুন পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৯ দর্শনার্থী ও পর্যটক এখানে এসেছেন। এরমধ্যে সার্কভুক্ত দেশের ৭৬ জন ছাড়াও বিদেশী পর্যটক রয়েছেন ১ হাজার ৪৮ জন। পর্যটকদের সুবিধার জন্য এখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন আকারের রেস্ট হাউস, রয়েছে ভ্রমন গাইড। আবাসন সুবিধার জন্য বগুড়া শহরে গড়ে ওঠেছে আন্তর্জাতিক মানের ফোরস্টার ’হোটেল নাজ গার্ডেন’ পর্যটন মোটেল, সেফওয়ে মোটেল, হোটেল সিয়েস্তা, নর্থওয়ে মোটেল, রয়্যাল প্যালেস, রেড চিলিসহ আন্তর্জাতিক মানের আরামদায়ক বিভিন্ন পর্যায়ের আবাসিক হোটেল। যাতায়াতের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা সম্মন্ন যানবাহন।

পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য রয়েছে সুপ্রশস্থ ও সুন্দর ৪ টি প্রবেশ পথ, এশিয়ার সবচেয়ে সুন্দর ও আধুনিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ, বিমান বন্দর, রাডার ষ্টেশন, কাহালু রেডিও সেন্টার, সারিয়াকান্দী ও ধুনট উপজেলার যমুনা তীরে অবস্থিত পিকনিক স্পট, দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক শপিং মল ও সান্ধ্যকালীন চটপটি, চাপ ও কাবাবের মনোরম আসর।
এছাড়া পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য বগুড়ায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি উন্নত মানের পার্ক। এসব পার্কের মধ্যে রয়েছে-ঐতিহ্যবাহী বগুড়া এ্যাডওয়ার্ড পার্ক, খোকন পার্ক, নবাববাড়ী প্যালেস মিউজিয়াম, ওয়ান্ডার ল্যান্ড, শাহনেওয়াজ শিশু বাগান, শেরপুর সাউদিয়া সিটি পার্কসহ শহর ও উপশর এলাকায় রয়েছে ঘুড়ে বেড়ানোর মতো বেশ কিছু খোলা যায়গা। রয়েছে হোটেল আকবরিয়া, এশিয়া ও কোয়ালিটির ৬০ রকমের সুস্বাদু মিষ্টি, চিকন সেমাই ও রকমারী দই। এসবের স্বাদ নিতে হলেও যেতে হবে বগুড়ায়। বসবাসরত শহর কেন্দ্রীক নাগরিকরা চিত্ত্ব বিনোদনের প্রতিদিন বিকেলে এসব পার্কে ঘুড়ে বেড়িয়ে তাদের সময় কাটান। দুর দুরান্ত থেকে আগত ভ্রমন পিয়াসীরা বগুড়ায় এসব স্থাপনায় এসে ঘুরে যান প্রায় প্রতিদিনই। উন্নতমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অনুকুল পরিবেশ কারনে উত্তর বঙ্গের প্রানকেন্দ্র বগুড়া জেলা সবশ্রেনীর মানুষের কাছে একটি ভ্রমনপ্রিয় স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরকে/টিএমএম/এসআই