Alexa ঘরে নেই খাবার প্রয়োজন স্ত্রীর চিকিৎসা

ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ জানুয়ারি ২০২০,   মাঘ ১১ ১৪২৬,   ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

ঘরে নেই খাবার প্রয়োজন স্ত্রীর চিকিৎসা

 প্রকাশিত: ১০:১২ ২৮ এপ্রিল ২০১৮  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মায়ের চিকিৎসার ভার ৫ ছেলে না নিলেও অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ৭৯ বছর বয়সেও খড়ের বাড়ুন (ঝাড়ু) পাড়া-মহল্লায় বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন বৃদ্ধ সলেমান মন্ডল। এরপরও স্বামীর সংসারবঞ্চিত মেয়ে ও মেয়ের ২ সন্তান চেপে বসেছে বৃদ্ধের ঘাড়ে। অমানবিক ঘটনাটি ঘটে চলেছে মেহেরপুর জেলা শহরের উপকন্ঠে দীঘিরপাড়া গ্রামের বেলেগাড়ী পাড়ায়।

মেহেরপুর সদর উপজেলার দীঘিরপাড়া গ্রামের বেলেগাড়ীপাড়ার সলেমান মন্ডল। পেশায় তিনি ছিলেন কৃষক। তার নিজের জমি ছিল না। অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষ করতেন। সংসার জীবনে তার রয়েছে স্ত্রী এবং ৫ ছেলে ও ৫ মেয়ে। তার স্ত্রী রিজিয়া খাতুন (৬৯) পঙ্গু। তার উপর চেপে বসেছে স্বামীর সংসারবঞ্চিত এক মেয়ে। মেয়ের সঙ্গে আছে তার ২ ছেলে-মেয়ে।

কৃষিকাজের মত কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করা বর্তমানে সলেমানের শরীরে সহ্য হয়না। তাই তিনি চাষবাস ছেড়ে দিয়েছেন। যে বুড়ো বয়সে বসে বসে তার ৫ ছেলের ভাত খাওয়ার কথা। আর নাতি-পুতিদের নিয়ে আনন্দ করার কথা। সেই বয়সে স্বাভাবিক জীবন-যাপন তার কপালে জোটেনি।

নিজের জন্য নয়; অসুস্থ স্ত্রী রিজিয়া খাতুনের চিকিৎসার জন্য বিগত ১০ বছর ধরে ভ্যানে করে নিজের হাতে তৈরি খড়ের বাড়ন নিয়ে শহর ও গ্রামের পাড়া-মহল্লায় বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন বৃদ্ধ সলেমান মন্ডল। প্রতিটি বাড়নে তার লাভ আসে দেড়-দুই টাকা।

চাপা ক্ষোভ আর এক বুক দুঃখ নিয়ে সলেমান মণ্ডল বললেন, কপালে সুখ তার ধরা দেয়নি। বয়সকালে ৫ ছেলে ও ৫ মেয়ে মানুষ করতে অন্যের জমি লীজ নিয়ে চাষাবাদ করেছি। তাদের বড় করেছি। মনে হয়েছিলো ছেলেরা বড় হলে শেষ বয়সে বসে থেকে আমরা বুড়া-বুড়ি দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খাবো। সে সুখ কপালে সইলনা তাদের। স্ত্রী রিজিয়া খাতুন অসুস্থ। প্রায় ১৫ বছর ধরে পুঙ্গু হয়ে পড়ে আছে। ছেলেরা মাকে চিকিৎসা করে না। খেতে দেয়না।

সলেমান মণ্ডল বলেন, ছোটবেলায় যাকে জীবন সঙ্গী করে ঘরে নিয়ে এসেছি। তাকে তো আর ফেলে দিতে পারিনা। ছেলেরা মাকে না দেখলে কি হবে? আমি তো আর তাকে ফেলে দিতে পারিনা। এরপরও এক জামাতা তার ২ সন্তানসহ আমার মেয়েকে আমার ঘাড়ে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে। সে আর ফিরে আসে না। তাদের খোঁজ-খবরও রাখে না। এ বৃদ্ধ বয়সে শরীর চলে না। তারপরও সবার মুখের দিকে চেয়ে আমি এ কাজ বেছে নিয়েছি।

সলেমান মণ্ডল আরো বলেন, প্রায় ১৫ বছর আগে গ্রামের মেম্বর বয়স্কভাতার একখানা কার্ড করে দিয়েছে। প্রতি ৬ মাস অন্তর একবার ইউনিয়ন পরিষদ অফিফসে গিয়ে ৩ হাজার টাকা করে পাই।

তিনি জানান, তার স্ত্রী পান না বয়স্কভাতা। অসুস্থ স্ত্রীর ওষুধ কেনাসহ পাঁচ জনের সংসার চালানো খুবই কষ্টের। তাই গ্রাম থেকে খড় কিনে রোদে শুকিয়ে এবং দড়ি ও কাঠি কিনে নিজের হাতে বাড়ুন বানাই। অনেক কষ্টে কেনা ভ্যান চালিয়ে এক দিন বাদে একদিন শহর-জেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের পাড়া মহল্লায় গিয়ে বিক্রি করি। প্রতিদিন ১৫০-২০০ বাড়ুন বিক্রি হয়। তাতে যে লাভ আসে তাতে কোনোভাবে খেয়ে না খেয়ে দিন চালাতে হয়।

একই গ্রামের আব্দুল কাদের জানান, তার ছেলেরা পৃথক এবং তারা কেউ বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখে না। অনেক কষ্টে তারা জীবন-যাপন করছেন।

আমঝুপি ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড সদস্য আনারুল ইসলাম বলেন, প্রায় ১৫ বছর আগে আমি সলেমান মণ্ডলকে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছি। তার স্ত্রী অসুস্থ শুনেছি। অনেক চেষ্টা করেও আমি তাকে বয়স্ক ভাতার একটি কার্ড করে দিতে পারিনি। সুযোগ হলে অসুস্থ মানুষটির জন্য আমি একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেব।

বৃদ্ধ সলেমান মন্ডল আক্ষেপ করে বললেন- তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য যদি কোনো সরকারি-বেসরকারি কিংবা দাতা সংস্থা এগিয়ে আসত তবে তিনি কৃতজ্ঞতাভরে তাদের দান গ্রহণ করবেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আজ